হজের বিখ্যাত আরবি সফরনামা
আরবি ভাষায় রচিত বিখ্যাত পাঁচটি হজের সফরনামার বিবরণ দেওয়া হলো।
১. রিহলাতু ইবনে জুবায়ের : মুহাম্মদ ইবনে জুবায়ের (মৃত্যু ৬১৪ হি.) ছিলেন মুসলিম স্পেনের বিখ্যাত পর্যটক, সমাজতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদ।
২. রিহলাতু ইবনে রুশাইদ আল-ফিহরি : মরক্কোর বিখ্যাত আলেম ও পণ্ডিত ইবনে রুশাইদ আল ফিহরি (মৃত্যু ৭২১ হি.) ৬৮৪ হিজরি মোতাবেক ১২৮৫ খ্রিস্টাব্দে হজে যান। হজের এই সফরকে তিনি ইলমে দ্বিন, বিশেষত হাদিসশাস্ত্রের জ্ঞানার্জনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন। ফলে যাত্রাপথের বিভিন্ন শহরে বিরতি দেন এবং আলেম ও মুহাদ্দিসদের সান্নিধ্য গ্রহণ করেন। হজ থেকে ফিরে তিনি তাঁর হজযাত্রার বিবরণ তুলে ধরে বই লেখেন। যার পূর্ণ নাম হলো ‘মিলউল ইবাতি বিমা জামাআ বিতুলিল গাইবাতি ফিল-ওয়াজহাতিল ওয়াজিহাতি ইলাল হারামাইনি মক্কা ওয়া তাইয়িবা।’ তাঁর এই সফরনামায় বিভিন্ন শহরের শিক্ষাব্যবস্থা, আলেমদের তালিকা ও অবস্থান এবং তাঁদের সঙ্গে লেখকের সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা হয়েছে। বইয়ের ভাষা কিছুটা জটিল ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ।
৩. মুস্তাফাদুর রিহলাতি ওয়াল ইগতিরাব : কাসিম বিন ইউসুফ আস-সিবতি (মৃত্যু ৭৩০ হি.) ছিলেন উত্তর আফ্রিকা ও মুসলিম স্পেনের একজন বিখ্যাত পর্যটক ও ভূগোলবিদ। তিনি আনুমানিক ৬৯০ হিজরিতে হজ করেন এবং হজ সফরের বর্ণনা দিয়ে ‘মুস্তাফাদুর রিহলাতি ওয়াল ইগতিরাব’ নামক বই লেখেন। বইয়ে যাত্রাপথের বিভিন্ন জনপদ, শহর ও মানুষের বিবরণ পাওয়া যায়। বইয়ে ভ্রমণের কষ্ট, বিচ্ছেদ, দূরত্ব ও মক্কা-মদিনার প্রতি আবেগ-ভালোবাসা ইত্যাদি বিষয়ে লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো সহজ-সাবলীল ও আবেগপূর্ণ ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে।
৪. তুহফাতুন নাজ্জার : বিশ্ববিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বতুতার জন্ম মরক্কোয়। তিনি এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভ্রমণ করেন। তবে অনেকেই জানে না যে হজের সফর থেকেই ইবনে বতুতা বিশ্বভ্রমণের অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন। ইবনে বতুতা জীবনে একাধিকবার হজ করেছেন। তিনি ৭২৬ হিজরি মোতাবেক ১৩২৬ হিজরিতে প্রথম হজ করেন। তিনি তাঁর বিখ্যাত ভ্রমণকাহিনি ‘তুহফাতুন নাজ্জার ফি গারায়িবিল আমসার ওয়া আজায়িবিল আসফার’ বইয়ে হজযাত্রার বিবরণও দিয়েছেন। আনুমানিক ৭৫৬ হিজরিতে তাঁর এই বই লেখা হয়।
৫. রিহলাতুল আইয়াশি : আবু সালিম আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মদ আইয়াশি (মৃত্যু ১০৯০ হি.) ছিলেন উত্তর আফ্রিকার একজন বিখ্যাত পর্যটক ও ফকিহ। তিনি ১০৭২ হিজরি মোতাবেক ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে হজ করেন। হজ থেকে ফিরে তিনি একটি সমৃদ্ধ সফরনামা লেখেন। এতে তৎকালীন হজব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর বিবরণ পাওয়া যায়। এতে তিনি হজের পথগুলো, মঞ্জিল, দূরত্ব, হজ কাফেলার ধরন-বৈশিষ্ট্য, মক্কা-মদিনার সমকালীন পরিবেশের নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন। এই বইকে উত্তর আফ্রিকা থেকে হজে গমনের পথগুলোর ঐতিহাসিক দলিল মনে করা হয়।
আরো কয়েকটি সফরনামা
সুপ্রাচীনকাল থেকে মিসর হজযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০ হিজরি থেকে আজ পর্যন্ত মিসর থেকে নিয়মিত হজ কাফেলা বের হচ্ছে। আফ্রিকা মহাদেশ, আন্দালুস ও মিসরের হাজিরা মিসরের ফুসতাস শহরে সমবেত হতো। সেখান থেকে মক্কা-মদিনার পথে অগ্রসর হতো। তাই বলা যায়, মিসরীয়রা হজযাত্রার প্রাচীন পথের উত্তরাধিকারী। মিসরীয় লেখক ও সাহিত্যিকরা তাঁদের এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা তুলে ধরেছেন। মিসরীয় লেখকদের রচিত কয়েকটি বিখ্যাত হজের সফরনামা হলো—
৬. ফি মানজিলিল ওহি : বিখ্যাত আরবি কবি ও সাহিত্যিক ড. মুহাম্মদ হুসাইন হাইকল ১৩৫৪ হিজরিতে হজ করেন। নিজের হজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে লেখেন ‘ফি মানজিলিল ওহি’।
৭. আরদুল মুজিঝাতি : সুপ্রসিদ্ধ লেখক, সাহিত্যিক, সম্পাদক ও গবেষক আয়েশা আবদুর রহমান, যিনি বিনতুশ শাতিয়ি নামে পরিচিত; তিনি ১৩৯২ হিজরিতে হজ করেন। হজের সফরের বিবরণ দিয়ে লেখেন ‘আরদুল মুজিঝাতি ওয়া লিকাইত-তারিখি’।
৮. আল-রিহলাতুল হিজাজিয়্যা : মিসরীয় পর্যটক ও ঐতিহাসিক মুহাম্মদ লাবিব বাত্তানি ১৯৩২ হিজরিতে খেদিভ দ্বিতীয় আব্বাস হিলমির সফরসঙ্গী হিসেবে হজ করেন। হজ থেকে ফিরে রচনা করেন তাঁর অনবদ্য গদ্য ‘আল-রিহলাতুল হিজাজিয়্যা’। এটাকে লেখকের শ্রেষ্ঠ রচনা মনে করা হয়।
৯. মিরাতুল হারামাইন : মিসরের পদস্থ কর্মকর্তা ইবরাহিম রাফআত পাশা ১৩১৮ হিজরিতে হজ করার পর লেখেন ‘মিরাতুল হারামাইন’ নামক বিখ্যাত বইটি।
১০. রিহলাতুল হিজাজ : আরব বিশ্বের সুপরিচিত লেখক, সাহিত্যিক, গবেষক ও চিন্তাবিদ মুহাম্মদ রশিদ রেজার বিখ্যাত একটি বই ‘রিহলাতুল হিজাজ’। তিনি ১৩৩৪ হিজরিতে হজ করার পর এই বই লেখেন।
আল্লাহ সব লেখকের হৃদয়ের আবেগ ও ভালোবাসাকে কবুল করেন এবং আমাদের তা থেকে উপকৃত হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।
তথ্যঋণ : একাধিক আরবি ও ইংরেজি ওয়েবসাইট