
কুর্ট গ্যোডেল ও আলবার্ট আইনস্টাইন
সেই সময়কার গণিতবিশ্বে এক বিশাল তোলপাড় চলছিল। বিখ্যাত গণিতবিদ ডেভিড হিলবার্ট স্বপ্ন দেখতেন এমন একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গাণিতিক ব্যবস্থার, যেখানে জগতের প্রতিটি সত্যকে লজিক দিয়ে অকাট্যভাবে প্রমাণ করা যাবে। গণিত যে নিখুঁত, সেই বিশ্বাসে তখন কারো কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু ১৯৩১ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সী গ্যোডেল যেন সেই দুর্ভেদ্য দুর্গে এক গাণিতিক বোমা ফাটালেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মেঘ যখন ইউরোপের আকাশে ঘনিয়ে এলো এবং নািসদের তাণ্ডব শুরু হলো, গ্যোডেল তখন অস্ট্রিয়া ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান। প্রিন্সটনের ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজে শুরু হয় তাঁর জীবনের দ্বিতীয় এবং অন্যতম শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। সেখানে আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব শুধু সন্ধ্যাকালীন আড্ডায় সীমাবদ্ধ ছিল না। আইনস্টাইন যখন মহাবিশ্বের সমীকরণ নিয়ে কাজ করছিলেন, গ্যোডেল তখন খাতা-কলম নিয়ে বসে তাঁর বন্ধুর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব ব্যবহার করেই প্রমাণ করে দিলেন তাত্ত্বিকভাবে মহাবিশ্বে এমন এক গাণিতিক পথ বা কাঠামো সম্ভব, যা দিয়ে অতীতে ফিরে যাওয়া যায়। অর্থাৎ টাইম ট্রাভেলের যে রোমাঞ্চকর ধারণা আজ আমাদের বিজ্ঞান কল্পকাহিনিতে উদ্বুদ্ধ করে, তার বিশুদ্ধ গাণিতিক সম্ভাবনার কথা তিনিই প্রথম জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন। তবে এই অতিমানবিক প্রখর মেধার আড়ালে মানুষটি ছিলেন ভীষণ নিভৃতচারী এবং মানসিকভাবে কিছুটা বিষাদগ্রস্ত। জীবনের শেষ দিকে তিনি এক অদ্ভুত প্যারানোয়ায় আক্রান্ত হন। তাঁর সব সময় মনে হতো, চারপাশের মানুষ তাঁকে খাবারে বিষ মিশিয়ে মারতে চায়। এই অহেতুক ভীতি তাঁর প্রতিদিনের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছিল। তিনি নিজের স্ত্রী অ্যাডেল ছাড়া অন্য কারো হাতের তৈরি খাবার এমনকি পানিও স্পর্শ করতেন না। দুর্ভাগ্যবশত, যখন তাঁর স্ত্রী অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন, গ্যোডেলও ভয়ে খাবার খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দিলেন। তিল তিল করে শুকিয়ে যাওয়া এই শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ ১৯৭৮ সালের ১৪ জানুয়ারি প্রিন্সটনের এক হাসপাতালে অনাহারজনিত শারীরিক জটিলতায় নিঃশব্দে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর ওজন ছিল মাত্র ৩০ কেজির মতো। গণিতের যে অসীম সীমানা তিনি জয় করেছিলেন, নিজের মনের গহিনের ভয়কে হয়তো সেভাবে জয় করা হয়ে ওঠেনি তাঁর।