সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২৪ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

সন্তান নিয়ে একা ববিতার সংগ্রাম, যে কথাগুলো আগে বলেননি ববিতা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
  • ৩৯ বার পড়া হয়েছে

ব্যবসায়ী ইফতেখারুল আলমকে ১৯৮২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরে বিয়ে করেন অভিনয়শিল্পী ফরিদা আক্তার ববিতা। বিয়ের প্রায় সাড়ের ছয় বছর পর, ১৯৮৯ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সন্তান অনিক ইসলামের জন্ম। অনিকের জন্মের তিন বছর পর ১৯৯৩ সালের ১০ জানুয়ারি মারা যান ববিতার স্বামী। এর পর থেকে তাঁর জীবনে অনেকে আসতে চেয়েছিলেন। পরিবার আর আত্মীয়স্বজনও চাপ দিচ্ছিলেন বিয়ের জন্য। কিন্তু অনড় ববিতা সন্তানের কথা ভেবে দ্বিতীয়বার সংসারজীবন শুরু করেননি। প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপে আজ মা দিবসে মা ববিতা বললেন তাঁর সংগ্রামী জীবনের গল্প।

ফরিদা আক্তার ববিতা
ফরিদা আক্তার ববিতাছবি: ফেসবুক থেকে

সিনেমা ঘিরে স্বপ্ন ছিল ববিতার। স্বামী ইফতেখারুল আলমও তাঁকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। বলেছিলেন, বাড়ির কোনো কিছু নিয়ে ভাবতে হবে না তাঁকে, যেন শুধুই সিনেমা নিয়ে ভাবেন। তিনিও সেভাবেই জীবন পার করছিলেন। স্বামী আর পেশাগত জীবন দুটিই সুন্দরভাবে মানিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু কে জানত, এত অল্প সময়ের সংসারজীবন হবে তাঁর। ববিতার মতে, ‘মাত্র ১১ বছরের দাম্পত্য জীবন। হঠাৎ অনিকের বাবার মৃত্যুতে চারদিকে ঘোর অন্ধকার নেমে আসে। কী করব, কীভাবে জীবন চলবে, যেন দিশাহারা আমি। তবে মনোবল হারানোর মানুষ তো আমি নই। মনটাকে শক্ত করি। আমার সন্তান আছে, তাঁকে নিয়েই আমাকে এগিয়ে যেতে হবে। তাঁকে গড়ে তুলতে হবে। আবার আমার ক্যারিয়ার। দুটোকে সমন্বয় করেই এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করি।’

স্বামী ইফতেখারুল আলমের সঙ্গে ববিতা, পাাশে সন্তান অনিক। কোলাজ
স্বামী ইফতেখারুল আলমের সঙ্গে ববিতা, পাাশে সন্তান অনিক। কোলাজ

অনিকের বাবা ইফতেখারুল আলম নানা ধরনের রোগে ভুগছিলেন। কিডনি, লিভার, হার্টের নানান রোগ ছিল তাঁর। তবে এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে চলে যাবেন, তা ভাবতে পারেননি ববিতা। মারা যাওয়ার পরের সময়টুকু তাই অকুলপাথারে পড়লেও সামলে নেন।

ববিতা বললেন, ‘পরিবারের কেউ আমাকে সারা দিন দেখাশোনা করত না। মাঝেমধ্যে করবে। কারণ, তাদের সবারও তো আলাদা সংসার, পেশাগত জীবন।। তাই সব আমাকে একাই করতে হতো। শুটিং, আয়রোজগার, সংসার চালানো, অনিককে দেখভাল—সব একাই করতে হতো।’

ফরিদা আক্তার ববিতা
ফরিদা আক্তার ববিতাছবি : প্রথম আলো

অনিকের জন্মের আগে ‘লেডি স্মাগলার’ নামে একটি ছবির শুটিংয়ে ফিলিপাইনে যান ববিতা। নিজের প্রযোজনাপ্রতিষ্ঠানের এই ছবির বেশির ভাগ শুটিং হয় ফিলিপাইনে। অ্যানি সি স্কোভা নামের এক তরুণী ফিলিপাইনে ছবিটির শুটিংয়ের প্রোডাকশনে কাজ করতেন। সেই মেয়েটিকে পছন্দ হয় ববিতার। তাঁকে দেশে আনার পরিকল্পনা করেন, যাতে বাসার কাজে সহযোগিতা পাওয়া যায়। একটা পর্যায়ে প্রস্তাবও দেন। ফিলিপাইনের সেই তরুণী অনিকের জন্মের পর তাঁর দেখভালও করেছেন।

ছেলে অনিকের সঙ্গে চিত্রনায়িকা মা ববিতা
ছেলে অনিকের সঙ্গে চিত্রনায়িকা মা ববিতাছবি : ববিতার সৌজন্যে

ববিতা বললেন, ‘ফিলিপাইনে “লেডি স্মাগলার” ছবির শুটিংয়ের সময়ে অ্যানিকে বলেছিলাম, তুমি কি বাংলাদেশে যেতে চাও? তখন কিন্তু অনিকের জন্ম হয়নি। সে বলে কি, আমার তো পাসপোর্ট নেই। তখন বলেছিলাম, আমি পাসপোর্ট করিয়ে নেব। আমি ভাবলাম, আমি একজন শিল্পী মানুষ, শুটিংয়ের কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। এমন একজন মানুষ দরকার, যে খুব বিশ্বাসী। তখন বাংলাদেশি, কাজ যারা করত, তাদের ওপর খুব একটা আস্থা রাখা যেত না। নানা ধরনের দুর্ঘটনা ঘটত। আবার তারা ঠিকমতো কাজ করত না। অ্যানিকে আনলাম, মেয়েটা এত বিশ্বাসী ছিল, আমার বাসার সবকিছু সামাল দিত। ঘরসংসার, বাজারসদাই, সব করত। আমার শুটিংয়ের কাজেও সহযোগিতা করত। শুরুতে টানা পাঁচ-ছয় বছর ছিল। এরপর একবার গিয়ে আবার এল। ফিরে এসে আবার পাঁচ-ছয় বছর ছিল। তারপর একদিন মেয়েটা বলল, বাবা-মায়ের বয়স হয়েছে, আমাকে একেবারে চলে যেতে হবে। মেয়েটা চলে গেল। এরপর আবার অন্য মিশন শুরু।’

ছোটবেলায় অনিক
ছোটবেলায় অনিকছবি : ববিতার সৌজন্যে

ববিতার ছেলে অনিকের স্কুলজীবন শুরু বনানীর প্লে–পেন স্কুলে। ববিতা বললেন, ‘আমার ড্রাইভার অনিককে স্কুলে দিয়ে আসত। মেয়েটা নিয়ে আসত। ওই মেয়েটা আমি যখন ছবি বানাতাম প্রোডাকশনের কাজও করত। সব কাজ জানত। খুবই স্মার্ট ছিল। বাংলাদেশে তখন বাসাবাড়িতে বিদেশি কাজের লোক রাখা যেত না। আমি তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে একটা চিঠি লিখেছিলাম। লিখেছিলাম, আমি একজন শিল্পী মানুষ, দেশ-বিদেশ নানা জায়গায় শুটিংয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। আমার সন্তানের বাবা বেঁচে নাই। আমার সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে গৃহপরিচারিকা রাখার অনুমতি দিলে ভালো হয়। অনুমতি পাই।’

ফরিদা আক্তার ববিতা
ফরিদা আক্তার ববিতাছবি প্রথম আলো

প্লে–পেন স্কুলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ার পর অনিকের স্কুলজীবন শুরু স্কলাস্টিকায়। এখান থেকেই ও লেভেল আর এ লেভেল শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন কানাডার ওয়াটার লু ইউনিভার্সিটিতে। কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। এখন চাকরি করছেন।

ববিতা সেই সময়ের কথা মনে করে বললেন, ‘অনিক যখন বনানীর স্কুলে যাওয়া শুরু করে, তখন শুরুর দিকে আমি ওর ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতাম। পরীক্ষায় সময় এটা বেশি করতে হতো। ববিতা নায়িকা, ওসব বিষয়ে আমার মধ্যে কাজ করত না।’

ইফতেখারুল আলমের সঙ্গে ববিতা
ইফতেখারুল আলমের সঙ্গে ববিতাছবি : শিল্পীর সৌজন্যে

ফিলিপাইনের গৃহপরিচারিকা অ্যানি চলে যাওয়ার পর ববিতার আবার চিন্তায় পড়ে যান। শুটিং করতে হলে তো বাসাবাড়ির কাজের সহযোগিতার জন্য গৃহপরিচারিকা লাগবে। এবার অনেকটা বাধ্য হয়ে দেশ থেকে নিলেন। তবে বাইরে গেলে মনটা পড়ে থাকত বাসায়। অনিক কী করছে, খাচ্ছে তো ঠিকমতো। ঘুম হচ্ছে কি? পড়াশোনা করছে কি?

এদিকে ববিতার স্বামীর মারা যাওয়ার একটা সময় পর তাঁর ওপর বিয়ের চাপ আসতে থাকে। পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন সবারই একটা চাপ ছিল। অন্যদিকে স্বামী যেহেতু নেই, প্রেমের প্রস্তাবও বাদ যায়নি। অনেকেই তাঁকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছেন, বিয়ে করে সংসারী হতে চেয়েছেন। কিন্তু ববিতা ছেলে অনিকের কথা ভেবে বিয়ের কথা ভাবেননি।

‘বন্দিনী’ সিনেমার একটি লুকে ববিতা।
‘বন্দিনী’ সিনেমার একটি লুকে ববিতা।ছবি: সিনেমা থেকে নেওয়া

ববিতা বললেন, ‘আত্মীয়স্বজন আর অভিভাবকেরা বলত, তুমি এত অল্প বয়সে স্বামীহারা হলে, আবার বিয়ে করা উচিত। কারণ, আমি সব মিলিয়ে সংসার করেছি দশ-এগারো বছর। তারপর তো অনিকের বাবা মারাই গেল। আমি বললাম, বিয়ে আমি আর করব না। আমার সন্তান, আমার অভিনয়জীবন—এ নিয়েই আগামী জীবন কাটিয়ে দিতে চাই। সন্তানের দেখভাল, শুটিং—একা জীবনে যতটুকু পারি করেছি। তবে ওই সময়টায় সিঙ্গেল মাদার হওয়ার কারণে অনেক স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছে। আউটডোর শুটিং পারতপক্ষে করতে পারতাম না। নিতাম না। ভাবতাম, আমি যদি ঢাকায় না থাকি, তাহলে বাসায় যদি কোনো সমস্যা হয়, কীভাবে সামাল দেব।

আরও পড়ুন

শিল্পীদের রাজনৈতিক বলয়ে টেনে আনা বন্ধ হোক: ববিতা

শিল্পীদের রাজনৈতিক বলয়ে টেনে আনা বন্ধ হোক: ববিতা

দেশের বাইরের একটি চলচ্চিত্র উৎসবে আমজাদ হোসেনের সঙ্গে ববিতা
দেশের বাইরের একটি চলচ্চিত্র উৎসবে আমজাদ হোসেনের সঙ্গে ববিতাছবি : ববিতার সৌজন্যে

এফডিসিতে থাকলে তো গাড়ি টান দিয়ে বাসায় যেতে পারব। কিন্তু কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মানিকগঞ্জ, সিলেট, গাজীপুরে যদি শুটিংয়ে থাকি, তাহলে তো ছেলের খোঁজখবর নিতে পারব না। এরপরও কতবার যে এমন হয়েছে, আমি শুটিংয়ে যাওয়ার সময় অনিক খুব কাঁদছিল। বলছিল, “আম্মা তুমি যেয়ো না, আম্মা তুমি যেয়ো না।” কিন্তু ছবিগুলো তো আমার সাইন করা। যেতেই হবে। শুটিং না করলে সংসারজীবনই–বা চলবে কী করে। এসব নিয়ে আমার পুরো জীবনটা কেটেছে।’

সিঙ্গেল মাদার হিসেবে যে জীবন কাটিয়ে এসেছেন, তা নিয়ে ববিতা বললেন, ‘আমার জীবনটা অনেক কঠিন ছিল, আবার শান্তিরও। অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে, কষ্ট স্বীকার করা লাগছে। কিন্তু সবকিছুর পর যখন সন্তানের মুখটা দেখতাম, শান্তিতে মনটা ভরে যেত।’

ছেলে অনিকের সঙ্গে ববিতা। শিল্পীর সৌজন্যে
ছেলে অনিকের সঙ্গে ববিতা। শিল্পীর সৌজন্যে

ছেলে অনিক যখন ও লেভেলের শিক্ষার্থী তখন তিনি মায়ের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলেন। সেই সময়ের কথা মনে করে ববিতা বললেন, ‘অনিক যখন বড় হয়েছে, বুঝতে শিখেছে, তখন আমাকে বলত, “আম্মা তুমি একা। তোমার অনেক কষ্ট হয়। তুমি একটা আব্বু নিয়ে আসো।” আমি সন্তানকে বুঝিয়েছিলাম, “না বাবা, এটা হয় না। তুমি থাকলে আমার কিছুই লাগবে না। তোমাকে নিয়েই তো আমি ভালো আছি।”’

ফরিদা আক্তার ববিতা
ফরিদা আক্তার ববিতাছবি: প্রথম আলো

কথা প্রসঙ্গে ববিতা আরও বললেন, ‘সবাই যে এত বলত বিয়ে করো, বিয়ে করো, তখন এটাও ভাবতাম, আমি যদি একটা মানুষকে বিয়ে করি, সেই সংসারে হয়তো সন্তান হবে। আর সন্তান যদি হয়, কেমন হবে, কী হবে? অনিককে মেনে নেবে কি নেবে না। অনিক আবার তাদের সাথে অ্যাডজাস্ট করতে পারবে কি পারবে না, কত কি যে আমার মাথার মধ্যে চলত। কত মানুষ আমাকে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। চাইলে বিয়ে করতেই পারতাম, কিন্তু করিনি। আমাদের সঙ্গে আরও কয়েকজন বিয়ে করেছে, সেটা একান্তই তাঁদের বিষয়। অনেক কিছু ভেবে আর দ্বিতীয়বার বিয়ের কথা ভাবিনি।’

দেশে আর দেশের বাইরে—সবার কাছে ববিতা তাঁদের প্রিয় একজন অভিনেত্রী, কিন্তু একমাত্র ছেলে অনিকের কাছে শুধুই ‘সংগ্রামী মা’। তাই তো সংগ্রামী মায়ের স্বপ্নপূরণে ছেলে অনিক পড়াশোনা ছাড়া আর কিছুই ভাবতেন না।

ববিতা দীর্ঘ অভিনয়জীবনে ২৭৫টি ছবিতে অভিনয় করেছেন। দেশের বিখ্যাত সব নির্মাতার পাশাপাশি কাজ করেছেন দেশের বাইরের বিখ্যাত নির্মাতার ছবিতেও। সত্যজিৎ রায়ের ‘অশনি সংকেত’ ছবির জন্য ববিতা দেশে ও দেশের বাইরে প্রশংসা কুড়ান।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com