কিভাবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসা সম্ভব হলো—বাবার এই কৌতূহলোদ্দীপক জিজ্ঞাসায় মেয়েটি জানায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘নৈবেদ্য’ বইখানি পড়ে সে ‘সান্ত্বনা ও আশ্রয়’ পেয়েছে। নৈবেদ্য কী এমন বই, যা বৈধব্যের সদ্য শোককেও উপশম করতে পারে—এই বিস্ময়ে তিনি বইটি তাঁকে পড়ে শোনাতে বলেন। মেয়েটি সময় নিয়ে নৈবেদ্যর কবিতাগুলো একটার পর একটা বাবাকে শোনাতে থাকল। অন্ধ লোকটি কবিকে প্রণাম করে বললেন—সেইদিন থেকে সেই বই আমাদের পরিবারের গীতা হয়েছে। গীতিকবিতার বই নৈবেদ্য, যেখানে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের প্রখর জীবনবোধের ১০০টি কবিতার সমাহার, যার বেশির ভাগই পূজা পর্বের অন্তর্ভুক্ত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু বিশ্বকবি নন, তিনি বিশ্বপথিকও। ১৮৯৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য বিলেত গমনের মধ্য দিয়ে তাঁর ভ্রমণযাত্রা শুরু। ১৯৩২ সাল পর্যন্ত তিনি এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের ৩০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন। তাঁর ভ্রমণকাহিনিগুলো শুধু স্থান বর্ণনা নয়, বরং সাহিত্যিক বিশ্লেষণ, সমাজ-সংস্কৃতি ও সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ। ‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র’, ‘জাপান-যাত্রী’, ‘রাশিয়ার চিঠি’, ‘জাভা-যাত্রীর পত্র’, ‘পথের সঞ্চয়’ ও ‘পরিব্রাজক’ তাঁর ভ্রমণকাহিনিভিত্তিক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। রবীন্দ্রনাথ বেশ কয়েকবার জাপান ভ্রমণ করেছেন। ১৯১৬ সালের মে মাসে কলকাতার খিদিরপুর ডক থেকে তোসামারু জাহাজে তাঁর প্রথম জাপানযাত্রা। তোসামারু জাহাজ ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ চীন সাগর পাড়ি দিয়ে রেঙ্গুন, পিনাং, সিঙ্গাপুর ও হংকং হয়ে মে মাসের ২৯ তারিখ জাপানের কোবে নগরীতে পৌঁছে। তোসামারু মালবোঝাই জাহাজ হলেও যাত্রীবহনের ব্যবস্থা ছিল। এই যাত্রায় কবির সফরসঙ্গী ছিলেন ধর্মযাজক ও কবির বন্ধু চার্লস ফ্রিয়ার অ্যান্ড্রুজ, ধর্মযাজক ও শিক্ষক উইলিয়াম উইনস্ট্যানলি পিয়ারসন ও তরুণ শিল্পী মুকুলচন্দ্র দে।
যেকোনো পরিবেশ-পরিস্থিতিতে মানবচিত্তে নিরন্তর আশা-জাগানিয়া রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রুদ্ধগৃহ’ প্রবন্ধে বলেছেন—‘এই জীবন-মৃত্যুর প্রবাহ দেখিলে, তরঙ্গভঙ্গের উপর ছায়া-আলোর খেলা দেখিলে, আমাদের কোনো ভয় থাকে না; কিন্তু বধ্য-মৃত্যু রুদ্ধ-ছায়া দেখিলে আমাদের ভয় হয়।’ এই বধ্য-মৃত্যু আর রুদ্র-ছায়ায় নিপতিত হয়েও যে রবীন্দ্রনাথ ভয় পান না, তেমন একটি ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করি তাঁর জাপান-যাত্রী রচনার একটি ঘটনায়। চীন সাগর অতিক্রম করার সময় ২১ মে কাপ্তেন বলে রেখেছেন— ‘আজ সন্ধ্যাবেলায় ঝড় হবে, ব্যারোমিটার নাবছে।’ রবীন্দ্রনাথ বিষয়টি পাত্তা না দিলেও জাহাজের যাত্রীরা সতর্ক হয়ে উঠবেন, এটাই স্বাভাবিক। আকাশের অসীমতা ও নির্জন সাগরবক্ষের এই ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে মুগ্ধ কবির রয়েছে এক তির্যক ও নিপুণ বর্ণনা, যার খানিকটা এখানে তুলে ধরা হলো—‘রাত্রে স্বপ্ন দেখলুম, আমি যেন মৃত্যু সম্বন্ধে কোনো একটি বেদমন্ত্র আবৃত্তি করে সেইটে কাকে বুঝিয়ে বলছি। আশ্চর্য তার রচনা, যেন একটা বিপুল আর্তস্বরের মতো, অথচ তার মধ্যে মরণের একটা বিরাট বৈরাগ্য আছে। এই মন্ত্রের মাঝখানে জেগে উঠে দেখি, আকাশ এবং জল তখন উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। সমুদ্র চামুণ্ডার মতো ফেনার জিব মেলে প্রচণ্ড অট্টহাস্যে নৃত্য করছে।’ ‘জাপান-যাত্রী’র অন্য এক জায়গায় কবি বলেছেন—‘ঘরে আর বসে থাকতে পারলুম না। ভিজে শাল মুড়ি দিয়ে আবার বাইরে এসে বসলুম। এত তুফানেও যে আমাদের ডেকের উপর আছড়ে আছড়ে ফেলছে না তার কারণ, জাহাজ আকণ্ঠ বোঝাই। ভিতরে যার পদার্থ নেই তার মতো দোলায়িত অবস্থা আমাদের জাহাজের নয়। মৃত্যুর কথা অনেকবার মনে হল। চারিদিকেই তো মৃত্যু, দিগন্ত থেকে দিগন্ত পর্যন্ত মৃত্যু; আমার প্রাণ এর মধ্যে এতটুকু। এই অতি ছোটোটার উপরেই কি সমস্ত আস্থা রাখব, আর এই এত বড়োটাকে কিছু বিশ্বাস করব না?—বড়োর উপরে ভরসা রাখাই ভালো।’
প্রকৃতিপ্রেমী কবি প্রকৃতির রুদ্ররোষ দর্শনে যেন হয়ে উঠলেন অধিক উতলা, তিনি আর ঘরে থাকেন কেমন করে। ঝড়ঝাপটার মধ্যে বসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে জাহাজের ডেকের এক কোনায় দাঁড়িয়ে কবি আধ্যাত্মিক উপলব্ধির আবহে ঝড়-জল আর বাতাসের মাতমে একাকার হয়ে নিজের স্মৃতি থেকে গাইতে থাকলেন নিজেরই রচিত একটার পর একটা গান। কবি জাহাজের ডেকে। এক পর্যায়ে উৎকণ্ঠিত অ্যান্ড্রুজ, পিয়ারসন ও মুকুল দে কবিকে খুঁজতে চলে এলেন ডেকে কবির কাছে। কবির ভাষায়—‘সন্ধ্যার সময় ঝড় থেমে গেল। উপরে গিয়ে দেখি, জাহাজটা সমুদ্রের কাছে এতক্ষণ ধরে যে চড়চাপড় খেয়েছে তার অনেক চিহ্ন আছে। কাপ্তেনের ঘরের একটা প্রাচীর ভেঙে গিয়ে তার আসবাবপত্র সমস্ত ভিজে গেছে।’ জাহাজে রটে গেল, এক ভারতীয় ঋষিপুরুষ ঝড়ের মধ্যে কী সব মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন—ঝড় থেমে গেছে, জাহাজও বেঁচে গেছে। জাহাজের কাপ্তেন এসে কবিকে জানালেন খোলাটুপি অভিবাদন। অন্য বিদেশিরা বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতায় তাকিয়ে থাকলেন কবির প্রতি। তাঁর গাওয়া শেষ গানটি ছিল—‘তোমার ভুবনজোড়া আসনখানি, আমার হৃদয়-মাঝে বিছাও আনি’, যা ছিল তোসামারু জাহাজে বসে তাঁর সেই মুহূর্তের রচনা। পরে এই গানটিতে কবির ইচ্ছায় অনেকটা বেহাগ রাগে সুরারোপ করেন পৌত্র দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর।
জাপান-যাত্রী রচনার ১১তম পরিচ্ছেদে বিপরীত পরিবেশে নিজের গান গাওয়া নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমনটা জানান—‘কাল বিছানা আমার ভারবহন করেনি, আমিই বিছানাটাকে বহন করে ডেকের এধার থেকে ওধারে আশ্রয় খুঁজে খুঁজে ফিরেছি। রাত যখন সাড়ে দুপুর হবে, তখন এই বাদলের সঙ্গে মিথ্যা বিরোধ করবার চেষ্টা না করে তাকে প্রসন্ন মনে মেনে নেবার জন্যে প্রস্তুত হলুম। এক-ধারে দাঁড়িয়ে ওই বাদলার সঙ্গে তাল মিলিয়েই গান ধরলুম—শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে। এমনি করে ফিরে ফিরে অনেকগুলো গান গাইলুম, বানিয়ে বানিয়ে একটা নতুন গানও তৈরি করলুম, কিন্তু বাদলের সঙ্গে কবির লড়াইয়ে এই মর্ত-বাসীকেই হার মানতে হল। আমি অতো দম পাব কোথায়, আর আমার কবিত্বের বাতিক যতই প্রবল হোক-না, বায়ুবলে আকাশের সঙ্গে পেরে উঠব কেন।’
আকাশের অসীম শূন্যতা আর জনমানবহীন সাগরের বুকে তোসামারুর মতো একটি ছোট জাহাজ যখন প্রচণ্ড সাইক্লোনে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছে আর যাত্রীরা বাঁচার আসায় প্রাণপণ আর্তনাদ করছে, তখন জাহাজের ডেকে বসে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া জগতের আর কোনো পুরুষ একটার পর একটা গান করতে পারেন—এ যেন কল্পনার অতীত, অচিন্তনীয়ও বটে। তিনি আমাদের সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো নিরন্তর আছড়ে পড়া নিত্যদিনের আনন্দ, দুঃখরাতের গান।