মহাবিশ্বে আমাদের দেখা-অদেখা যা কিছু আছে, সব কিছুই মহান আল্লাহর প্রবল শক্তির নিদর্শন। এগুলো তাঁর হুকুমে যেমন আমাদের জীবন রক্ষায় বিভিন্নভাবে ভূমিকা রাখে, তেমনি তাঁর নির্দেশে মুহূর্তে আগ্রাসি হয়ে উঠতে পারে।তাই মাঝেমধ্যে প্রকৃতির আগ্রাসি আচরণ মানুষকে তাদের প্রকৃত অবস্থান চিনিয়ে দেয়। সম্প্রতি নেপালে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, ঘরবাড়ি ভেসে গেছে; এর আগে ভেনিজুয়েলার ভূমিকম্পেও বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। বিশ্বের নানা প্রান্তে এমন দুর্যোগে মানুষের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, ক্ষমতা কিংবা সম্পদ থাকা সত্ত্বেও মহান আল্লাহর নিদর্শনের সামনে তাদের সীমাবদ্ধতা ও অসহায়ত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এসব ঘটনা বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, মহান আল্লাহর প্রবল শক্তির সামনে সৃষ্টিজগতের কোনো কিছুরই কোনো অবস্থান নেই।মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির নিদর্শন থেকে আমাদের উপকৃত হওয়ার বহু সুযোগ খুলে দিলেও এগুলো মূলত তাঁর ইশারায় পরিচালিত হয়। তাঁর হুকুম ছাড়া এগুলো যেমন কোনো উপকারে আসে না, তেমনি কোনো বিপদও তৈরি করতে পারে না। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই আপতিত হয় না; যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, আল্লাহ তার অন্তরকে সৎপথে পরিচালিত করেন। আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে সর্বজ্ঞ।
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, প্রকৃতির প্রতিটি পদক্ষেপ, এমনকি ভূমিকম্প, বন্যা, ঝড় সব কিছুই আল্লাহর ইচ্ছা ও পরিকল্পনার অধীন। তিনি কখনো কখনো তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা করার জন্য, সতর্ক করার জন্য আবার ক্ষেত্রবিশেষে আজাব দেওয়ার জন্যও প্রকৃতিকে ভিন্নরূপে হাজির করেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সতর্কবার্তা হিসেবে চিহ্নিত করে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদের আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’(সুরা : রুম, আয়াত : ৪১)
আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আজাব হিসেবেও এসেছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এর বহু নজির রয়েছে। শক্তিশালী আদ জাতি নিজেদের শক্তি ও সম্পদ নিয়ে অহংকার করত, কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে প্রচণ্ড ঝোড়ো হাওয়া তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়। (সুরা : হাক্কাহ, আয়াত : ৬-৮)
সামুদ জাতিও তাদের কারুকার্যময় পাথর-খোদাই প্রাসাদ নিয়ে গর্বিত ছিল, কিন্তু আল্লাহর নিদর্শন উটনীকে হত্যার অপরাধে এক বিকট শাস্তিতে তারা ধ্বংস হয়ে যায়। (সুরা : শামস, আয়াত : ১৩-১৫)
এসব ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়, মহান আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া কোনো শক্তি, ধনসম্পদ কোনো কাজেই আসে না। এবং আল্লাহর একটি ইশারায় রাতারাতি সম্পদের পাহাড়ও ভস্ম হয়ে যেতে পারে।
আমাদের প্রিয় নবী (সা.) এমন অনেক কাজ সম্পর্কে আমাদের আগেই সতর্ক করে গেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যখন গনিমতের (যুদ্ধলব্ধ) মাল ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হবে, আমানতের মাল লুটের মালের মতো হবে, জাকাতকে জরিমানা মনে করা হবে, ধর্মবিবর্জিত শিক্ষার প্রচলন হবে, পুরুষ স্ত্রীর অনুগত হয়ে যাবে কিন্তু নিজ মায়ের অবাধ্য হবে, বন্ধুবান্ধবকে কাছে টেনে নেবে, কিন্তু পিতাকে দূরে ঠেলে দেবে, মসজিদে কলরব ও হট্টগোল করবে, পাপাচারীরা গোত্রের নেতা হবে, নিকৃষ্ট লোক সমাজের কর্ণধার হবে, কোনো মানুষের অনিষ্ট হতে বাঁচার জন্য তাকে সম্মান দেখানো হবে, গায়িকা-নর্তকি ও বাদ্যযন্ত্রের বিস্তার ঘটবে, মদপান করা হবে, এই উম্মতের শেষ যুগের লোকেরা তাদের পূর্ববর্তী মনীষীদের অভিসম্পাত করবে, তখন তোমরা অগ্নিবায়ু, ভূমিধস, ভূমিকম্প, চেহারা বিকৃতি ও পাথর বর্ষণরূপ শাস্তির এবং আরো আলামতের অপেক্ষা করবে, যা একের পর এক নিপতিত হতে থাকবে, যেমন পুরনো পুঁতির মালা ছিঁড়ে গেলে একের পর এক তার পুঁতি ঝরে পড়তে থাকে।
(তিরমিজি, হাদিস : ২২১১
সুতরাং কোথাও প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে মানুষের করণীয় হলো, মহান আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা, নিজেদের কৃতকর্মের জন্য তওবা করা এবং মহান আল্লাহর দয়া ও রহমত কামনা করা। মানুষ যত শক্তিশালী, যত সম্পদশালীই হোক না কেন, আল্লাহর ইচ্ছার সামনে তা মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশনা মেনে চলাই মুমিনের একমাত্র নিরাপদ পথ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে দুনিয়া ও আখিরাতের সব বিপদ থেকে হেফাজতে রাখুন। আমিন।