সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২৬ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৮ মে, ২০২৬
  • ২১ বার পড়া হয়েছে
২৫ বৈশাখ ১৪৩৩ সাল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মবার্ষিকী। তিনি ছিলেন প্রথম অ-ইউরোপীয়, যিনি ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির নতুন দিগন্তে যেমন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দ্বিতীয় কোয়ান্টাম বিপ্লবের যুগে রবীন্দ্রনাথের স্বজ্ঞামূলক জ্ঞান কতখানি প্রাসঙ্গিক, সে বিষয়ে আলোকপাত করব।

যদিও রবীন্দ্রনাথ প্রধানত শিল্পকলা, সাহিত্য ও সংগীতে তাঁর সৃষ্টির জন্য পরিচিত, বিজ্ঞানের প্রতিও তাঁর গভীর কৌতূহল ও অনুরাগ ছিল।

বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের দীক্ষা এবং পরবর্তীকালে জীববিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আগ্রহ তাঁকে মহাবিশ্ব সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলে। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি ‘গ্রহ গণ জীবের আবাসভূমি’ শিরোনামে প্রবন্ধ লেখেন, যা ১৮৭৪ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এটিই রবীন্দ্রনাথের প্রথম গদ্য রচনা। এই রচনা প্রকাশের ৬৪ বছর পর ১৯৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ ‘বিশ্ব-পরিচয়’ গ্রন্থ প্রকাশ করেন।
এই বইয়ে বিজ্ঞানী রবীন্দ্রনাথের প্রকৃত পরিচয় মেলে। বইটিতে অভিব্যক্তি, পদার্থবিদ্যা, জ্যোতির্বিদ্যা ও অণু-পরমাণুর গঠন নিয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে। রবীন্দ্রযুগের পর আধুনিক বিজ্ঞান ধাপে ধাপে অনেক এগিয়ে গেছে। তাই ‘বিশ্ব-পরিচয়’-এ বর্ণিত কিছু তথ্য কালের ব্যবধানে অপ্রচলিত ধারণা বলে মনে হতে পারে।
তবে রবীন্দ্রমননে তৎকালীন নানা বৈজ্ঞানিক ধারণা যে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ছিল, তা ‘বিশ্ব-পরিচয়’ পড়লে বোঝা যায়। 

বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত ও বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথবিজ্ঞানচর্চার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন, ‘বুদ্ধিকে মোহমুক্তি ও সতর্ক করবার জন্য প্রধান প্রয়োজন বিজ্ঞানচর্চার।…জ্ঞানের এই পরিবেশনকার্যে পাণ্ডিত্য যথাসাধ্য বর্জনীয় মনে করি।’ সে সময় বাংলায় বিজ্ঞানের বইয়ের অভাব ছিল। সেই অভাব দূর করার জন্য তাঁর ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন, ‘আমাদের মতো আনাড়ি এই অভাব অল্পমাত্র দূর করবার চেষ্টাতেও প্রবৃত্ত হলে তারাই সবচেয়ে কৌতুক বোধ করবে, যারা আমাদের মতো আনাড়ির দল।

’ কিন্তু রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, ‘শিশুর প্রতি মায়ের ঔত্সুক্য আছে, কিন্তু ডাক্তারের মতো তার বিদ্যা নেই। বিদ্যাটি সে ধার করে নিতে পারে, কিন্তু ঔত্সুক্য ধার করা চলে না। এই ঔত্সুক্য শুশ্রূষায় যে রস জোগায়, সেটা অবহেলা করবার জিনিস নয়।’ রবীন্দ্রনাথ এখানে বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। 

‘বিশ্ব-পরিচয়’-এর রবীন্দ্রনাথের বাইরে আমরা আরেক রবীন্দ্রনাথকে পাই তাঁর গান ও কবিতায়, যেখানে আধুনিক বিজ্ঞানের নতুন নতুন তত্ত্ব বিমূর্ত ভাবনায় প্রকাশিত হয়েছে। যেমন—কবির গানের কয়েকটি লাইন এরূপ : ‘তব নাম লয়ে চন্দ্র তারা, অসীম শূন্যে ধাইছে/রবি হতে গ্রহে ঝরিছে প্রেম, গ্রহ হতে গ্রহে চাইছে।’ কবির এই কল্পনা বস্তুত আধুনিক বিজ্ঞানের বিগ ব্যাং তত্ত্ব ও সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণাকে সমর্থন করে। উল্লেখ্য, বিজ্ঞানী হাবল ‘মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল’—এই তত্ত্ব প্রমাণ করেন। মনে রাখতে হবে, এই আবিষ্কার রবীন্দ্রনাথের উল্লিখিত রচনার অনেক পরে হয়েছে। এখানে ‘তব নাম লয়ে’-এর সঙ্গে যুক্ত হলো ‘অসীম শূন্যে ধাইছে’, মানে সম্প্রসারণশীল মহাবিশ্বের ধারণা। ভারতবর্ষের অধ্যাত্ম ভাবনার সঙ্গে এক অনুপম মেলবন্ধন ঘটল আধুনিক বিজ্ঞানের। এ রকম আরো উদাহরণ দেওয়া যাবে, যেখানে রবীন্দ্রনাথের বিশ্বদৃষ্টি এবং তাঁর কল্পনার ব্যাপ্তি স্থান ও কালের সুবৃহৎ পরিসরে বিস্তৃতি লাভ করেছে।

প্রকৃতির সঙ্গে মানবচেতনার একীভূত হওয়ার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের গভীর বিশ্বাস শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন তাঁর পরিবেশবিষয়ক উপলব্ধির মধ্যে নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। বিখ্যাত বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য এবং পরবর্তীকালে মহান পদার্থবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ তাঁকে বিজ্ঞান উপলব্ধির বিভিন্ন স্তরে নিয়ে গিয়েছিল। মহাবিশ্বের প্রকৃতি সম্পর্কে আইনস্টাইন বাস্তবতার দুটি ভিন্ন ধারণা নিয়ে ভেবেছিলেন, তার একটি হলো, ‘মানবতার ওপর নির্ভরশীল একতা হিসেবে বিশ্ব’ এবং অন্যটি হলো, ‘মানবীয় উপাদান থেকে স্বাধীন এক বাস্তবতা হিসেবে বিশ্ব’। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ ভাবতেন, ‘যখন আমাদের মহাবিশ্ব শাশ্বত মানুষটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, তখন আমরা তাকে সত্য বলে জানি, তাকে সৌন্দর্য বলে অনুভব করি।’

মানুষ থেকে স্বাধীন বাস্তবতার অস্তিত্বের প্রশ্নে আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর এই মতবিরোধের মূলে ছিল প্রাচ্যের দার্শনিক ঐতিহ্য। এটি কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মৌলিক ধারণারও প্রতিধ্বনি। ১৮৬১ সালে যখন রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়, তখন কোয়ান্টাম বলবিদ্যা ছিল একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে। সেই সময়ে কৃষ্ণবস্তু বিকিরণের স্টিফেন-বোল্টজম্যান সূত্র আবিষ্কৃত হয়েছিল, যা ১৯০০ সালে ম্যাক্স প্ল্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম সংস্করণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। তবে ১৮৬৪ সালে ম্যাক্সওয়েল একটি মন্তব্য করেছিলেন যে ‘বৈজ্ঞানিক সত্যকে বিভিন্ন রূপে উপস্থাপন করা উচিত এবং তা কোনো ভৌত চিত্রের বলিষ্ঠ রূপ ও উজ্জ্বল রঙে প্রকাশিত হোক বা কোনো প্রতীকী উপস্থাপনার সূক্ষ্মতা ও ফ্যাকাসে রূপে প্রকাশিত হোক, তাকে সমানভাবে বৈজ্ঞানিক বলে গণ্য করা উচিত।’ এই প্রস্তাবটি ১৯২০-এর দশকে পদার্থবিজ্ঞানের বিকাশের পথ প্রশস্ত করেছিল। আমরা দেখতে পাই যে কোয়ান্টামজগেক বর্ণনা করার দুটি উপায় বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করছেন। একটি পদ্ধতি, যার পথপ্রদর্শক ছিলেন হাইজেনবার্গ, যা বিমূর্ত গাণিতিক প্রতীকবাদের ওপর নির্ভরশীল; অন্যটি শ্রোয়েডিংগারের তরঙ্গের ধারণা। কিন্তু উভয়ই সমানভাবে বৈধ ছিল। এই সময়েই রবীন্দ্রনাথ বেড়ে ওঠেন, তাঁর বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি বিকশিত হয় এবং তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।

রবীন্দ্রনাথ প্ল্যাংক, বর্ন, ডি ব্রগলি, হাইজেনবার্গ, শ্রোয়েডিংগার ও ডিরাকের মতো পদার্থবিজ্ঞানীদের দ্বারা বিকশিত প্রথম কোয়ান্টাম বিপ্লব প্রত্যক্ষ করেছেন। দ্বিতীয় কোয়ান্টাম বিপ্লব শুরু হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে, যখন বিজ্ঞানীরা তরঙ্গ-কণা দ্বৈততার ঊর্ধ্বে কিছু ধারণার সন্ধান পান। ১৯৬৪ সালে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী জন বেল গাণিতিক যুক্তির মাধ্যমে ‘বেলের অসমতা’ প্রস্তাব করেন। এটি এমন একটি কাঠামো, যা প্রমাণ করে যে স্থানীয় গুপ্ত চলক বা পরিবর্তনশীল রাশির (local hidden variable) ওপর ভিত্তি করে কোনো ভৌত তত্ত্ব কোয়ান্টাম বলবিদ্যার ভবিষ্যদ্বাণীগুলোকে পুনরুৎপাদন করতে পারে না। এর ফলে দ্বিতীয় কোয়ান্টাম বিপ্লবের বিভিন্ন দিক; যেমন—কোয়ান্টাম বস্তু, কোয়ান্টাম তথ্য ও কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফির বিকাশ ঘটে।

২০২২ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী অ্যালাইন অ্যাসপেক্ট একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘আমরা কি বিপুলসংখ্যক কোয়ান্টাম বিটকে জটবদ্ধ (entangled) করতে সক্ষম হব?’ কোয়ান্টাম জটবদ্ধতা (Quantum entanglement) আবিষ্কৃত হওয়ার এবং দ্বিতীয় কোয়ান্টাম বিপ্লব শুরু হওয়ার অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর স্বজ্ঞামূলক জ্ঞান ও কাব্যিক চিন্তা-ভাবনা ব্যবহার করে জটবদ্ধ জগতের কল্পনা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেছেন যে ‘আমরা এই বিশ্বাসে বিশ্বাসী যে সত্য এক এবং অবিভক্ত জ্ঞান দুটি ধারায় প্রবাহিত হয় : পূর্ব দিক থেকে এবং পশ্চিম দিক থেকে। তাদের ঐক্যের মধ্যেই সেই সত্যের একত্ব উপলব্ধি করা যায়, যা সমগ্র বিশ্বকে পরিব্যাপ্ত করে ও ধারণ করে আছে।’ ১৯২৫ সালে অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা একটি চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ আধুনিক প্রযুক্তিকে স্বাগত জানালেও মন্তব্য করেন যে “বাষ্পীয় যুগে আমরা আরো ‘চতুর’ জিনিস দেখি, কিন্তু ‘নিখুঁত’ জিনিস দেখি না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও আমরা অনেক চতুর জিনিস দেখি, যা খুব দ্রুত সমস্যার সমাধান করে, কিন্তু মানুষের তৈরি অ্যালগরিদমের কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন ভুলও দেখতে পাই।” সম্ভবত এই কারণেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শিক্ষা’ (১৯০৬) প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘তরুণদের বিজ্ঞান শেখানোর জন্য প্রথমে তাদের চোখ খুলে দেওয়া এবং পর্যবেক্ষণক্ষমতাকে সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন।’

পরিশেষে আইনস্টাইনের সঙ্গে কথোপকথনে রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞানকে ‘সত্যের নৈর্ব্যক্তিক মানবিক জগৎ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আমাদের এও স্মরণ করিয়ে দেন যে এই জগতে মানুষই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়, বরং প্রাকৃতিক নিয়মের মতো আরো অন্যান্য বিষয়ও রয়েছে। এটিই মানুষকে সত্যের একত্ব উপলব্ধি করতে পরিচালিত করে।

আমি মনে করি, রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মানুষ থেকে আলাদা কিছু নয়, বরং মহাবিশ্বের সম্প্রীতি সত্য ও সুন্দরের ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, দ্বিতীয় কোয়ান্টাম বিপ্লব ও জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের নতুন নতুন আবিষ্কারের যুগে আমরা রবীন্দ্রনাথকে আরো বেশি প্রাসঙ্গিক মনে করি।

লেখক : বিজ্ঞান, দর্শন ও শিক্ষা বিষয়ক লেখক ও সংযুক্ত অধ্যাপক, যুক্তরাজ্য

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com