সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৪১ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

কাপ্তাই লেকের কাচকি মাছ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬
  • ২১ বার পড়া হয়েছে

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে সমাপনী বর্ষের শিক্ষা সফরে ১৯৮৪ সালে প্রথম রাঙামাটি যাই। রাঙামাটির আঁকাবাঁকা সড়ক, পাহাড় ও কাপ্তাই লেকের সেই নয়নাভিরাম দৃশ্য এখনো মনে দাগ কেটে আছে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও কৃত্রিম কাপ্তাই লেক দেশের মৎস্য খাত ও স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

কাপ্তাই লেকের মোট আয়তন ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর এবং দৈর্ঘ্য ৭৮ কিলোমিটার।

কাপ্তাই লেকের মৎস্যসম্পদের ওপর ১৯৬৫-৬৬ সালে পরিচালিত প্রথম জরিপে লেকে রুইজাতীয় মাছের পরিমাণ ছিল মোট উৎপাদনের ৮১ শতাংশ এবং ছোট মাছের পরিমাণ ছিল ৮ শতাংশ। মাছের প্রজাতি ছিল ৭২টি। সময়ের পরিক্রমায় কাপ্তাই লেক এখন অনেকটা বিবর্ণ। গভীরতা কমে লেকে চর পড়েছে, পানি হয়েছে খানিকটা দূষিত।
আগে যেখানে লেকে মোট মৎস্যসম্পদের ৮১ শতাংশ ছিল রুই-কাতলজাতীয় মাছ, এখন সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে ছোট মাছ, বিশেষ করে কাচকি, চাপিলা ও মলা। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের জরিপ অনুযায়ী লেকে কাচকি, চাপিলা ও মলার পরিমাণ ৯০ শতাংশ এবং রুই-কাতলজাতীয় মাছ মাত্র ০.৮ শতাংশ। লেক থেকে এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে শিলং, দেশি সরপুঁটি, মোহিনী বাটা, মহাশোল, মধু পাবদা, দেশি পাঙ্গাশ ও ফাইস্যা মাছ। সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে গনিয়া, খরশুলা, পোয়া, চ্যাং, বামস, ঘাউরা ও বাঘাইড়।
লেকের মোট মৎস্য উৎপাদন ১৯ হাজার ২৫৩ মেট্রিক টন (২০২৩-২৪), অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি উৎপাদন ২৮০ কেজি, যা অন্যান্য জলাশয়ের তুলনায় খুবই কম। এর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাচকিজাতীয় ছোট মাছের আধিক্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে। 

আমাদের দেশি ছোট প্রজাতির মাছের মধ্যে কাচকি অন্যতম। কাচকির চোখ মাথার উপরিভাগে, দেহ লম্বাটে, রং অনেকটা স্বচ্ছ এবং পার্শ্বীয়ভাবে চাপা। গিল রেকার ১৯-২১টি এবং পেটে কিল বোন আছে।

কাচকি মাছ লম্বায় সাধারণত দু-তিন সেন্টিমিটার এবং সর্বোচ্চ ছয় সেন্টিমিটার হয়ে থাকে। আকারে চার সেন্টিমিটার হলেই এরা পরিপক্ব হয়। স্ত্রী কাচকির ডিম ধারণ ক্ষমতা ৪২০ থেকে তিন হাজার ২৪০টি। কাচকির বৈজ্ঞানিক নাম Corica soborna (Hamilton, ১৮২২) এবং ইংরেজি নাম Ganges river sprat. Clupeidae পরিবারের এই মাছটি বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ব্রুনেই, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, মায়ানমার ও চীনে পাওয়া যায়। এই গণের আরেকটি প্রজাতি হচ্ছে C. laciniata (Fowler, ১৯৩৫), যার ইংরেজি নাম Bangkok river sprat। এই প্রজাতিটি শুধু থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় পাওয়া যায়। এই প্রজাতির গিল রেকারের সংখ্যা Corica soborna-এর চেয়ে কম। কাচকি মাছ জলাশয়ের পানির উপরিভাগে ঝাঁক বেঁধে চলাচল করে এবং ঝাঁকে পুরুষ কাচকির (৪৮ শতাংশ) চেয়ে স্ত্রী কাচকি (৫২ শতাংশ) বেশি থাকে। জলাশয়ে এরা জুওপ্লাঙ্কটন এবং অমেরুদণ্ডী অন্যান্য ক্ষুদ্রাকৃতির প্রাণী খেয়ে বেঁচে থাকে। শরৎকালে কাচকি মাছ বেশি ধরা পড়ে। পুষ্টি ও ঔষধি গুণ বিবেচনায় ছোট মাছের মধ্যে কাচকি অন্যতম। প্রতি ১০০ গ্রাম কাচকি মাছে ১২.৭ গ্রাম প্রোটিন, ৩.৬ গ্রাম ফ্যাট, ৪৭৬ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম ও ২.৮ মিলিগ্রাম আয়রন থাকে। ভিটামিন ‘এ’ ও ‘ডি’, ফসফরাস, আয়োডিন ও আরজিনিনের অন্যতম উৎস হচ্ছে কাচকি মাছ। শিশুদের হাড় গঠনে এবং রাতকানা রোগ প্রতিরোধে কাচকি মাছ অত্যন্ত কার্যকর। সব বয়সী মানুষের জন্য এই মাছ উপকারী। পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচ দিয়ে মাখিয়ে রান্না করা কাচকি মাছের চচ্চড়ি বাঙালির একটি সুস্বাদু প্রিয় খাবার। 

দেশের বিভিন্ন নদ-নদী, বিল ও লেকে কাচকি মাছ পাওয়া যায়। তবে উপকূলীয় জলাশয়েও কাচকি মাছ ধরা পড়ে। কাপ্তাই লেক, চলন বিল ও হালতি বিলে এখন কাচকি মাছ বেশি ধরা পড়ে। কাপ্তাই লেকের কাচকি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাজারজাত করা হয়। কাপ্তাই লেকে কাচকি জাল বা মশারি জাল দিয়ে কাচকি মাছ ধরা হয়। কাচকি জালের দৈর্ঘ্য ৩৭৫ থেকে দুই হাজার ৭০০ ফুট এবং প্রস্থ ৪২ থেকে ৭৫ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে, জালের ফাঁস থাকে দুই মিলিমিটার। গবেষণায় দেখা গেছে, কাচকি জালের দৈর্ঘ্য বেশি এবং ফাঁস ছোট হওয়ায় কাচকি ধরতে গিয়ে জলাশয়ের চার থেকে ৪৫ প্রজাতির অন্যান্য মাছও ধরা পড়ে যায়, যা লেকের মোট মৎস্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ জন্য কাপ্তাই লেকে কাচকি জালের ব্যবহার তিন মাস বন্ধ থাকে। কাচকির দৈহিক ওজন কম বিধায় মোট মৎস্য উৎপাদনে কাচকির অবদান সামান্য। তাই কাপ্তাই লেকের মোট উৎপাদন বাড়াতে হলে বড় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

কাপ্তাই লেকের কাচকির অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে কীর্তনখোলা নদীর কাচকির সঙ্গে কাপ্তাই লেকের কাচকির কৌলিতাত্ত্বিক ভিন্নতা আছে কি না, এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে গবেষণা পরিচালনা করা হয়। গবেষণায় কাপ্তাই লেক ও কীর্তনখোলা নদীর কাচকির মধ্যে মধ্যম (মডারেট) আকারের কৌলিতাত্ত্বিক ভিন্নতা পাওয়া গেছে।

m

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com