
পারিবারিকভাবে সাংস্কৃতিক আবহে বেড়ে উঠেছেন। ১৯৯৮ সাল। মাত্র ছয় বছর বয়সে বাংলাদেশ বেতারের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘কচিকাঁচার আসর’-এ উপস্থাপনা করেছিলেন তিনি। তখন হয়তো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি এ ছেলেটিই একদিন বাটালির টানে প্রাণ দেবেন নিথর কাঠের টুকরায়। বর্তমানে তিনি দেশের একজন পরিচিত ‘লুথিয়ার’(তাঁরযুক্ত বাদ্যযন্ত্র তৈরি, মেরামতকারী)। দেশি কাঠ দিয়ে বিশ্বমানের ইলেকট্রিক গিটার তৈরির অদম্য কারিগর তিনি।
গিটারটি আর জোড়া লাগেনি
সিয়াম প্রথম গিটার দেখেন ১৯৯৯ সালে, ফুফুর বাসায়। তখনো স্কুলে যাওয়া শুরু হয়নি, সেই থেকে ছয় তারের এই যন্ত্রের সুর দোলা দেয় কিশোর সিয়ামের মনে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবার কাছে বায়না ধরেন—‘আমাকে একটি গিটার কিনে দাও।’ বাবা সেই আবদার পূরণ করেছিলেন। ২০০৮ সাল। অষ্টম শ্রেণির ছাত্র সিয়াম। সেবার গণিত পরীক্ষার ফল ভালো হলো না। রাগ হলো বাবার। সারা দিন গিটার নিয়ে মেতে থাকায় পড়ালেখা চাঙ্গে উঠেছে—ভেবে গিটারটি আছড়ে ফেলেন তাঁর বাবা রাজু আহমেদ। চোখের জল ফেলতে ফেলতে মেঝেতে বসে ভাঙা টুকরাগুলো জোড়া লাগানোর চেষ্টা করেছিলেন সিয়াম। স্কুলবেলায় আর গিটার কেনা হলো না। ২০০৯ সালে ভর্তি হলেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমিতে। সেখানেই আনুষ্ঠানিকভাবে গিটার শেখা শুরু। পরে ‘অ্যান্ড উই’ নামে একটি ব্যান্ডও গড়েছিলেন। এইচএসসির পর সুযোগ পেয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তি হলেন সাধের চারুকলায়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাঁধাধরা নিয়ম ভালো লাগেনি। পরিবারেও অর্থনৈতিক টানাপড়েন চলছিল। ফলে প্রথম বছরেই পড়াশোনার ইতি ঘটে।

নিজের স্টুডিওতে গিটার বানাতে ব্যস্ত সিয়াম। ছবি : মোহাম্মদ আসাদ
ওসাইরিস থেকে ব্লুজম্যান
ক্যাম্পাস ছাড়ার পর গিটার মেরামতের কাজ শুরু করেন। নিজের ঘরের নাম দিয়েছিলেন ‘ব্লুজডেন’। ২০০৯ সালে একটি অ্যাকুস্টিক গিটার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেন। নিজের মতো করে নাট, ব্রিজ ও রং বদল করেন। বছর তিনেক পর এক কাঠমিস্ত্রির সহায়তায় প্রথমবারের মতো ইংরেজি এসজি আকৃতির গিটার বানানোর চেষ্টা করেন। বুঝলেন, বডি বানানো সহজ হলেও নেক ও ফ্রেটবোর্ডের কাজ বেশ সূক্ষ্ম ও জটিল। এ নিয়ে নিজের জানাশোনারও ঘাটতি আছে। সেই ঘাটতি পূরণে বছর চারেক ধরে অনলাইনে গিটার তৈরির ওপর পড়াশোনা করেন। ২০১৫ সালে সেখান থেকেই যাত্রা শুরু করে ‘বিডি গিটার কেয়ার’। এরপর একে একে ডালপালা মেলে তার উদ্যোগ। ২০১৬ সালে তিনি বাংলাদেশে নিয়ে আসেন ল্যাটিন পারকাশন যন্ত্র ‘কাহন’। ‘বিডি কাহন’ নামে তার তৈরি এই বাদ্যযন্ত্রটি দ্রুতই মিউজিশিয়ানদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়।
পরে ‘ওসাইরিস’ নামে আরেকটি উদ্যোগ শুরু করেন। প্রাচীন মিসরীয় পুরাণে ওসাইরিস হলেন পুনর্জন্মের দেবতা। সিয়াম চেয়েছিলেন বাংলাদেশে বিদেশি গিটারের আধিপত্য ভাঙতে। সেই ভাবনা থেকে গিটারের মডেলগুলোর নামও রেখেছিলেন প্রাচীন রাজা-রানিদের নামে—নেফারতিতি কিংবা আনুবিস। তবে একসময় বুঝলেন, সাধারণ মানুষের পক্ষে নামগুলো উচ্চারণ করা কঠিন।
২০১৮ সালে যাত্রা শুরুর পর বছর দুয়েকের মাথায় ২৬টি গিটারের অর্ডার পান তিনি। তাঁর কাজের সহায়তায় বিভিন্ন সময়ে লোক নিয়োগ দিলেও স্পর্শকাতর ও মূল কারিগরি কাজগুলো সিয়াম সব সময় নিজেই সম্পন্ন করেন। ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ব্যক্তিগত কারণে গিটার তৈরির কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছিল তাঁকে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন উদ্যমে আবার শুরু করেন। এ পর্যন্ত ছয়টি গিটারের কাজ পেয়েছেন। এর মধ্যে আছে সেভেন স্ট্রিং মডেল, হেডলেস গিটার এবং মাল্টিস্কেল এইট স্ট্রিং গিটারের মতো জটিল সব কাজ। সিয়াম বলেন, ‘২০২৬ সাল থেকে আমরা বড় একটি পরিবর্তন এনেছি। ব্র্যান্ডের নতুন নাম দিয়েছি ব্লুজম্যান গিটারস। আমরা চাই সংগীতের মূলধারার সঙ্গে আমাদের তৈরি গিটারগুলোর নামও যেন মানুষের হৃদয়ে সহজে জায়গা করে নেয়।’
একটি সাশ্রয়ী গিটার ব্র্যান্ড তৈরির লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন সিয়াম। বলেন, ‘গিটার বানাতে গিয়ে বুঝেছি, দেশে ভালো মানের উপকরণের অভাব রয়েছে।’ বাংলাদেশে বিদেশি গিটারের একচেটিয়া আধিপত্যের বাজারে হাতুড়ি-বাটাল হাতে নেওয়াটা ছিল বড় ঝুঁকি। সিয়ামকে এই সাহস জুগিয়েছে তাঁর শৈশবের গান আর স্কাউটিংয়ের শিক্ষা। অঞ্জন দত্ত, কবীর সুমন আর অর্ণবদের গান তাঁকে শিখিয়েছে, ছকবাঁধা জীবনের বাইরেও এক বিশাল জগৎ আছে। সিয়ামের ভাষায়, ‘সব সময়ই বক্সের বাইরে চিন্তা করতে চেয়েছি। স্কাউটিং করার সময় ব্যাডেন পাওয়েলের সেই কথাটি মনে গেঁথে গিয়েছিল—‘নাথিং ইজ ইম্পসিবল’। আর এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথে ছায়া হয়ে ছিলেন আমার বাবা। তাঁর হার না মানা মানসিকতা আর সাহসেই এই অবস্থানে আসতে পেরেছি।’
কাঠ নিয়ে গবেষণা
সিয়াম দীর্ঘ ১০ বছর ধরে গবেষণা করছেন বাংলাদেশের কাঠ নিয়ে। তাঁর মতে, ‘আমাদের দেশের আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা গাছগুলো ইলেকট্রিক গিটারের জন্য অত্যন্ত টেকসই।’ তিনি একটি বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন। সাধারণত গিটারের নেক বা ঘাড়ের জন্য বিদেশি রক মেপল কাঠ ব্যবহার করা হয়। ২০১৮ সালে মেপলের বিকল্প হিসেবে দেশি শিরীষ কাঠ দিয়ে একটি গিটার তৈরি করেন সিয়াম। পরীক্ষার জন্য সেটিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মোটা তার লাগিয়ে বছরখানেক ফেলে রাখেন। যেকোনো সাধারণ গিটারের নেক এমন অবস্থায় বেঁকে যাওয়ার কথা, কিন্তু শিরীষ কাঠের সেই গিটার আজও নিখুঁত।আজকের যুগে যখন বেশির ভাগ কাজ রোবট বা সিএনসি মেশিন দিয়ে হয়, সিয়াম সেখানে আঁকড়ে ধরেছেন ট্র্যাডিশনাল পদ্ধতি। একটি নিথর কাঠের টুকরা থেকে পূর্ণাঙ্গ বাদ্যযন্ত্র হয়ে উঠতে পাড়ি দিতে হয় অন্তত ৬০টিরও বেশি সূক্ষ্ম ধাপ। সিজনিং করা কাঠ নির্বাচন থেকে শুরু করে রাফ কাটিং, বডির ক্যাভিটি তৈরি এবং নেক জয়েনিং—প্রতিটি পর্যায়ে সিয়ামকে থাকতে হয় অতন্দ্র প্রহরীর মতো। ২০১২ সাল থেকে ইন্টারনেটের সাহায্য নিয়ে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে করতে আজ তিনি এই নির্ভুল কারিগরিতে পৌঁছেছেন। এমনকি প্রয়োজনীয় অনেক সরঞ্জাম তিনি নিজেই ইম্প্রাভাইজড করে নিয়েছেন।
তিনিই প্রথম!
বেশ কয়েকবার গিটার তৈরি করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ২০১৯ সালে সফল হন সিয়াম। তৈরি করেন নিজের প্রথম পেশাদার ইলেকট্রিক গিটার। এরপর তিনি পুরোপুরি গিটার তৈরিতে মন দেন। অল্পদিনেই দেশের ব্যান্ডসংগীত অঙ্গনে পরিচিত হয়ে ওঠেন। তাজমহল রোডের ওয়ার্কশপ এবং নবীনগরের কারখানায় তৈরি করেন গিটারগুলো।
যাঁরা গিটার বানান, মেরামত করেন, তাঁদের বলা হয় লুথিয়ার। নিজেকে দেশের একমাত্র লুথিয়ার হিসেবে দাবি করেন সিয়াম। তাঁর ভাষ্যে, শুধু মেরামত নয়, কাঠ নির্বাচন, নকশা থেকে শুরু করে গিটারিস্টের স্টাইল অনুযায়ী সাউন্ডও তৈরি করেন লুথিয়ার। তিনি বলেন, ‘২০১৯ সালে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে লুথিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করি।’
মেড ইন বাংলাদেশ
ব্লুজম্যান গিটারের অন্যতম জনপ্রিয় সিরিজ ‘রোডিও’। রোডিও এক্স, প্রো ও স্টুডিও—এই তিন ক্যাটাগরির গিটারের দাম ২৪ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে। সিয়ামের দাবি, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ৭০ হাজার টাকা দামের একটি গিটার যে মান নিশ্চিত করে, তাঁর তৈরি রোডিও গিটার সেই একই গুণগত মান দেয়। এ ছাড়া কাস্টমাইজেশনের ওপর ভিত্তি করে গিটারের দাম এক লাখ টাকা বা তার বেশিও হতে পারে।
গতানুগতিক শোরুম নয়, ভবিষ্যতে একটি ‘এক্সপেরিয়েন্স জোন’ তৈরি করতে চান সিয়াম, যেখানে কেনার আগে শিল্পীরা গিটার হাতে নিয়ে তাঁর অনুভূতি বুঝতে পারবেন। মেধা আর সঠিক সাধনা থাকলে ‘ইমপোর্টেড’ ট্যাগ ছাড়াই বিশ্ব জয় করা সম্ভব, সিয়ামের এই উদ্যোগ তরাই প্রমাণ। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে এক বড় অনুপ্রেরণার নামও এখন সিয়াম।