সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:০৫ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

যেখানে বরফের টোপরে চুমু খায় সোনা রোদ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২৭ বার পড়া হয়েছে
নেপালের ইয়াক খারকায় আমাদের টি-হাউস। পর্বতের বরফচূড়ায় দিনের প্রথম প্রহরের সূর্যালোকের স্পর্শে সকাল হয়েছে হিমালয়ান এই বেইস ক্যাম্পে। ১০ দিনব্যাপী আমাদের অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেকের আজ অষ্টম দিন। আমাদের পরিকল্পনা, ট্রেক করে ইয়াক খারকা থেকে থরংফেদি বেইস ক্যাম্পে যাব।

সাধারণত এই ট্রেকে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ কিলোমিটারের মতো ট্রেক করা হয়। আগের দিন তিলিচো বেইস ক্যাম্প থেকে ইয়াক খারকা পর্যন্ত আমরা প্রায় ১৭ কিলোমিটার ট্রেক করেছিলাম। তাই পরের দিনের ট্রেইলের দৈর্ঘ্য নেমে এলো মোটামুটি সাত কিলোমিটারের মতো। দূরত্ব তুলনামূলক কম।
তাই অন্য দিন সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৭টায় বেরিয়ে পড়লেও একটু বেলা করে পৌনে ৯টায় বের হই। পথের দূরত্ব কম। ভাবলাম, অন্য দিনের মতো দ্রুত না এগিয়ে আস্তে আস্তে চারপাশ দেখতে দেখতে যাব। ট্রেইলে বিদেশি ট্রেকারও অনেক।
তাদের সঙ্গে একটু গল্প জমাতে পারলে মন্দ কি! ট্রেইলের ডান পাশে অন্নপূর্ণা ফাঙ্গ পর্বত চূড়া। কয়েক কিলোমিটার চড়াই ধরে এগিয়ে পাথরের এক চাতালের ওপর হেলান দিয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। সেখানে কয়েকজন বিদেশি সাইক্লিস্ট। তাদের একজনের সঙ্গে হ্যালো বলে বািচত শুরু করলাম। নাম ডিয়েগো।
এসেছেন ব্রাজিল থেকে। ৬০ বছর বয়সী ডিয়েগো ব্রাসিলিয়ার বাসিন্দা। ডিয়েগোর বাড়ি ব্রাজিল শুনে তাঁকে ব্রাজিলের ফুটবলের কথা বললাম। নেইমার-পেলের কথাও তুললাম। তাঁর চেহারায় আনন্দের ছাপ ছিল দেখার মতো। নিজের জাতির প্রশংসা কে না শুনতে চায়! ডিয়েগো সাইকেল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পর আবার হাঁটতে থাকি। ট্রেইল তারপর একদম উতরাই ধরে নেমে গেছে চিকন এক পাহাড়ি নদীর কিনারে। সশব্দে পাথরের বোল্ডার ডিঙিয়ে চলেছে সেই উন্মত্ত স্রোতস্বিনীর স্রোত। কাঠের একটি ছোটখাটো সেতু। সেটি পেরিয়ে আবার যতটুকু উতরাই নেমেছিলাম, ততটুকু চড়াই ওঠার যুদ্ধ! প্রায় চার হাজার ৪০০ মিটার অল্টিচুটে এই খাড়া ট্রেইল। এর ওপর পিঠে প্রায় ১১ কেজি ওজনের র্যাকস্যাক ব্যাগ। থেমে থেমে বিশ্রাম নিয়ে ক্রমে উঠে আসি ওপরে। ট্রেইল এবার প্রায় সমান্তরালে পাহাড়ের এক পাশ ধরে ফিতার মতো এগিয়ে গেছে। চৈনিক চেহারার দুজন ট্রেকার দেখে হ্যালো বলে কথা শুরু করি। একজনের নাম ফনচেলা। ফনচেলার বাড়ি চীনে। বেইজিংয়ের বাসিন্দা। তবে ফনচেলার বন্ধু মোটেও ইংরেজি না জানায় তাঁর সঙ্গে বািচত জমল না। তাঁদের পেছনে রেখে এগিয়ে আমার গ্রুপমেট দুই ভ্রমণসঙ্গীকে পেলাম। বাকি পথ হেঁটে থরংফেদি বেইস ক্যাম্পে এসে পৌঁছাই। 

থরং লা পাস শিখর। ছবি : লেখকের সৌজন্যে
থরং লা পাস যাওয়ার পথে লেখক। ছবি : লেখকের সৌজন্য

থরংফেদি বেইস ক্যাম্প আমাদের ট্রেকের সর্বশেষ বেইস স্টেশন। মধ্যরাতে আমরা বেরিয়ে পড়ব এই অভিযানের উচ্চতম বিন্দু থরং লা পাসের উদ্দেশে। হিমালয়ান ট্রেকগুলোর উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে ট্রেকের টি-হাউসের সান্ধ্যকালীন আড্ডা। অতিথিকক্ষে সাধারণত রুম হিটারের ব্যবস্থা থাকে না। তবে প্রতিটি টি-হাউসের রেস্তোরাঁয় হিটারের মাধ্যমে উষ্ণতার ব্যবস্থা করা হয়। কাচঘেরা রেস্তোরাঁয় তাই অতিথি ট্রেকাররা সন্ধ্যা হতে না হতেই আশ্রয় নেয়। কত দেশের কত চেহারার, কত রং, বর্ণ, উচ্চতা আর শারীরিক কাঠামোর মানুষ! এর ইয়ত্তা নেই! তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে সত্তরোর্ধ্ব প্রবীণ; ইউরোপ, আমেরিকা, এশিয়া—কোনো মহাদেশের মানুষের অভাব নেই। সেখানে কেউ কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আড্ডা দেয়, কেউ গিটারে টুংটাং শব্দ তোলে, কেউ বা একনিষ্ঠ মনে বসে বইয়ের পাতায় ডুবে থাকে।

থরংফেদি বেইস ক্যাম্পে বিকেল হতে না হতেই ভীষণ রকম ঠাণ্ডা নেমে এলো। অন্যান্য পরিধেয়ের সঙ্গে শেরপা জ্যাকেটও শীত সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। দ্রুত টি-হাউসের রেস্তোরাঁয় আশ্রয় নিলাম। সেই যে ঢুকলাম, বের হলাম রাত ১১টায়। রাত সাড়ে ৩টায় ওঠার জন্য ফোনে অ্যালার্ম সেট করা। মধ্যরাতের শেষ প্রহরে বের হয়ে যাব। একটি চড়ুই পাখির ঘুম দেওয়ার সুযোগ পাব। কনকনে শীতে কাঁপতে কাঁপতে ঘুম ভাঙার পর ব্যাকপ্যাক পুরোপুরি রেডি করে রেস্তোরাঁয় একেবারে চলে এলাম। এরপর খাওয়াদাওয়ার সুযোগ পাব বিকেলে মুক্তিনাথে পৌঁছে। তাই নাশতার বদলে ভাত, সবজি ও সিদ্ধ ডিম দিয়ে পেট পুরে রওনা হলাম। এই ভেজ থালির দাম পড়ল প্রায় এক হাজার ১০০ রুপি। ট্রেকে যত বেশি উচ্চতা, খাবারের দাম তত বেশি। রওনা হয়েই দেখলাম বহু টর্চের আলোতে পুরো বেইস ক্যাম্প ভেসে যাচ্ছে! এরই মধ্যে প্রায় সব ট্রেকার বের হয়ে গেছে। ট্রেকের প্রথমেই আস্ত একটি পর্বত বেয়ে উঠতে হবে, যেটির ঢাল যথেষ্ট খাড়া। কিছুদূর উঠতে না উঠতেই শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য

হূিপণ্ডে হাঁসফাঁস শুরু হয়ে গেল। তবে এর মধ্যে হোস্ট জনি ভাই একটি পোর্টার ঘোড়ার ব্যবস্থা করে ফেললেন। তাই দলের সবার পিঠের ব্যাগ ঘোড়ার পিঠে দিয়ে হাঁপ ছেড়ে কিছুটা স্বস্তিতে ঢাল ওঠা শুরু করলাম। প্রায় আড়াই ঘণ্টা ট্রেক করে সেই পর্বতের ওপরে উঠে আসি। তখন আকাশের দিকে বিস্তৃত চিত্ত নিয়ে তাকিয়ে থাকি। পুরো আকাশে বসেছে অজস্র তারকারাজির মিলনমেলা। আবছা অন্ধকারে স্নো-ক্যাপ মাউন্টেইন ও স্টার ট্রেইলের সেই রূপ ছিল দারুণ মুগ্ধতায় ভরা। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখতাম ট্রেম্পারেচার মাইনাস ৭ ডিগ্রি। আবার হাঁটতে থাকি। এর মধ্যে ভোর হয়। পুবাকাশে ধবধবে সাদা বরফের চূড়া সোনা রঙে রাঙিয়ে সূর্য ওঠে। প্রবল শ্বাস নেওয়ার হাঁসফাঁসে হাঁটার গতি একেবারে মন্থর হয়ে আসে। ১০ কদম, ১০টি শ্বাস—এই ছন্দ ধরে হাঁটতে থাকি। আস্তে আস্তে রোদও চড়া হয়। সেই রোদ চারপাশ আলোকিত করলেও তাতে ঠাণ্ডার দাপট থেকে বুকের কাঁপন যায় না। ক্রমেই উঠতে উঠতে সামনে একটি ঢাল ওঠার পর পাথরের একটি চাতাল পেয়ে তার গায়ে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ি। আরেকটি পাথরে ভ্রমণসঙ্গী অসীমদা। আশপাশে আরো কয়েকজন বিশ্রাম নিচ্ছে। ফোনের স্ক্রিনে অল্টিচুট মিটার চেক করে দেখলাম, থরং লা পাসে পৌঁছতে তখনো ৭০ মিটার অল্টিচুট গেইন করতে হবে। সেটি দেখে বলে উঠলাম—দিস সেভেন্টি মিটারস ফিলস লাইক সেভেন্টি কিলোমিটারস, ক্যাননট গোয়িং টু ফিনিশ! শুনে খানিক দূরে বিশ্রাম নেওয়া পঞ্চাশোর্ধ্ব এস্তোনিয়ান অলিভিয়ের হো হো করে হেসে উঠলেন। তারপর বাকি পথ পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছলাম অতি আরাধ্য, পরম প্রত্যাশিত সেই থরং লা পাসে। আর আকাশ রাজ্যের সেই ভুবনে নীরবে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকি বরফের টোপর পরে থাকা পর্বতচূড়াদের শিখরে সকালের সোনা রোদের ঝলমলানি। অনুভবের গহিন তলে অঙ্কিত, পুলকিত, বিমুগ্ধ সেসব মুহূর্ত রাঙিয়ে উঠল যেন! পাঁচ হাজার ৪১৬ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত থরং লা পাস। কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়া অতিক্রম করা যায় এমন পার্বত্য গিরিপথের মধ্যে এটি বিশ্বের দ্বিতীয়। সামিট পয়েন্টে পৌঁছাই সকাল সাড়ে ৯টার দিকে। লম্বা একটা সময় সেখানে থাকলাম, ছবির ফ্রেমে মুহূর্তগুলো বন্দি করে রাখলাম। চূড়া থেকে প্রায় এক হাজার ৮০০ মিটার অল্টিচুট নেমে গেলে তারপর পরবর্তী গন্তব্যস্থল মুক্তিনাথ, যা তীর্থস্থান হিসেবে সুপরিচিত। মুক্তিনাথে পৌঁছানো হবে আমাদের অন্নপূর্ণা সার্কিট ট্রেকের মূলত সমাপ্তি। ঘড়ির কাঁটায় সকাল প্রায় সোয়া ১০টা, দূরে পর্বতের চূড়া ঝলমল করছে, থরং লার সামিট স্তম্ভে রঙিন কাপড়ের ফিতা বাতাসে উড়ছে, আর পুরো আকাশে অনাবিল নীলিম নীল! নীলিম সেই দিগন্তরেখায় শেষবার দৃষ্টি ফেলে তারপর পর্বতের অন্য পাশের ঢাল ধরে নেমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াই।

 

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com