পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দুতে পবিত্র কাবা ঘরের অবস্থান। হজরত আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু করে যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল কাবা ঘর আবাদ করেছেন। বেহেশত থেকে দুনিয়ায় আগমনের পর এই কাবাসংলগ্ন এলাকা আরাফার মাঠে হজরত আদম আলাইহিস সালাম ও হজরত হাওয়া (আ.)-এর পুনরায় সাক্ষাৎ হয়।
কাবার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে একত্রিকরণ। হজরত আদম ও হজরত হাওয়া (আ.) যেমনি ভাবে কাবাকে কেন্দ্র করে সাক্ষাৎ লাভের পর আল্লাহর করুণায় সিক্ত হয়ে পরস্পরে নতুন করে পথচলা শুরু করেন, ঠিক তেমনিভাবে পৃথিবীর নানাপ্রান্ত থেকে ছুটে আসা মানুষ কাবাকে ঘিরে একত্রিত হয়ে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের পাথেয় পান। পৃথিবীর মুসলমানরা দৈনিক পাঁচবার মহান রবের কুদরতি পায়ে আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে লুটিয়ে পড়েন এই কাবাকে কেন্দ্র করে। কাবার এই আকর্ষণই বান্দাকে মাবুদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে।
কাবা পৃথিবীর প্রথম ঘর। প্রথম উপাসনালয়। কাবাকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর আবাদ শুরু হয়। মূলের দিকে ফিরে যাওয়া মানুষের সৃষ্টিগত স্বভাব। সৃষ্টিকর্তার হুকুম পালনের মাধ্যমে সন্তুষ্টি অর্জন এবং সৃষ্টির মূলের দিকে ফিরে যাওয়া, এই দুইটি বিষয়ের মাধ্যমে কাবা পৃথিবীব্যাপী মানবজাতিকে আকর্ষণ করে। যে আকর্ষণে মানবজাতি ছুটে চলে কাবা পানে। এক সময় কাফের-মুশরিকরাও কাবা তাওয়াফ করত। পরে কাবার পবিত্রতা ও সম্মান রক্ষার জন্য তাদের তাওয়াফ নিষিদ্ধ করা হয়।
আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর জন্ম হয়। যখন পৃথিবীর মানুষ আল্লাহর একত্ববাদকে ভুলে চন্দ্র, সূর্য, বিভিন্ন কিছুর মূর্তি, গ্রহ ও আগুনকে সৃষ্টিকর্তা ভেবে তাদের পূজো-অর্চণা করত। তখন পৃথিবী সয়লাব ছিল শিরিক ও ভ্রান্ত আকিদায়। অবিচার, অন্যায় ও পাপাচার ছিল মানুষের নিত্ত-নৈমিত্তিক বিষয়।
দুনিয়ার এমন দুর্যোগময় মুহূর্তে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম মানুষকে শিরকি আকিদা থেকে বের করে আল্লাহর একত্ববাদে দীক্ষিত করার কাজে নিরলস পরিশ্রম শুরু করেন। কিন্তু মানুষ তাদের পূর্ব-পুরুষদের ধর্মত্যাগ করে আল্লাহর একত্ববাদে দীক্ষিত হতে অস্বীকৃতি জানায়। তবুও হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম নানা প্রতিকূলতা সহ্য করে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত অব্যাহত রাখেন। দাওয়াতি কাজের জন্য তার গোত্রের লোকজন রাগান্বিত হয়। তার বিরোধিতা শুরু করে। ফলশ্রুতিতে তিনি আল্লাহতায়ালার হুকুমে মক্কায় স্ত্রী-সন্তানকে রেখে আসেন। এটা ছিল আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পরীক্ষা বিশেষ।
এভাবে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম আল্লাহর পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন হন। ওই সব পরীক্ষার অন্যতম হলো মুশরিক কর্র্তৃক আগুনে নিক্ষেপ, স্ত্রী-সন্তানদের নির্জনবাস, কলিজার টুকরো আপন তনয়কে কোরবানি করার নির্দেশ ইত্যাদি। এমন কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ায় আল্লাহতায়ালা তাকে মুসলিম জাতির পিতা হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি পুত্র হজরত ইসমাইল আলাইহিস সালামকে সঙ্গে নিয়ে কাবা ঘরের পুনঃনির্মাণ করেন।
কাবা প্রসঙ্গে কোরআনে কারিমের অনেক জায়গায় আলোচনা করা হয়েছে। কোরআনে কারিমের এক আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যখন আমি কাবা ঘরকে মানুষের জন্য সম্মেলনস্থল ও শান্তির আলয় করলাম, তোমরা ইবরাহিমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাজের জায়গা বানাও এবং আমি ইবরাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করলাম, তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, অবস্থানকারী ও রুকু সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখ। যখন ইবরাহিম বললেন, হে পরওয়ারদেগার! এ স্থানকে তুমি শান্তিময় করো এবং এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও কিয়ামতে বিশ্বাস করে, তাদের ফলের দ্বারা রিজিক দান করো। আল্লাহতায়ালা বললেন, যারা অবিশ্বাস করে, আমি তাদেরও কিছ ুদিন ফায়দা ভোগ করার সুযোগ দেব। অতঃপর তাদের বলপ্রয়োগে দোজখের আজাবে ঠেলে দেবে; সেটা নিকৃষ্ট বাসস্থান।’ (সুরা বাকারা, আয়াত১২৫-১২৬)
বর্ণিত আয়াতের ভাষ্যমতে, আল্লাহতায়ালা কাবাকে মানুষের জন্য নিরাপদ সম্মেলনস্থল বানিয়েছেন। বিভিন্ন তাফসির গ্রন্থে উল্লেখ আছে, যদি কেউ কাউকে হত্যা করার পর সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করত তাহলে সেখান থেকে বের না হওয়া পর্যন্ত কাবার সম্মানার্থে তার ওপর আক্রমণ করা নিষেধ ছিল।
উল্লিখিত আয়াতে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম মক্কা নগরীকে শান্তিময় এবং এর অধিবাসীদের বিভিন্ন ফলফলাদি দ্বারা রিজিক প্রদানের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। আল্লাহতায়ালা তার সেই দোয়া কবুল করেন এবং মক্কা ও মক্কার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে বিভিন্ন ফলফলাদির সমাহার ঘটান। যা কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে।
আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী মানুষ পৃথিবীর দূরবর্তী অঞ্চল থেকে এক স্থানে মিলিত হয়ে সংঘবদ্ধভাবে এক আল্লাহর ইবাদত করে এখান থেকে ইসলামের বার্তা নিয়ে নিজ নিজ দেশে ফিরে যান। মূলত এই উদ্দেশেই কাবাঘর নির্মাণ করা হয়। বিশ্ব মুসলিমের এ সম্মেলনের নামই হলো হজ। এখান থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ঐক্য। এই কাবাকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীর সব সামর্থ্যবান মুসলমান মহান রবের ডাকে সাড়া দিতে ছুটে চলেন মক্কার পানে। লাব্বাইক… আল্লাহুম্মা লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলেন দুনিয়ার আকাশ-বাতাস।








