
বৈশাখ সার্বজনীন উৎসব। এ দিনে ঘরে-বাইরে দই, চিড়া, পিঠা-পায়েস, মুড়ি-বাতাসা, পান্তা-ইলিশ, শুঁটকি ভর্তা ইত্যাদি সব বাঙালির খাবারে যুক্ত হয়। যুগ যুগ ধরে বাংলার কৃষক সমাজ সকালে পান্তা ভাত খেয়েই মাঠের কঠিন পরিশ্রমের কাজ করছেন। এতে তাদের কোনো অসুবিধা হয়নি, ডিহাইড্রেশনও হয়নি। পান্তা ভাত তৈরিতে কোনো জ্বালানি খরচ বা ঝামেলা হয় না। এ জন্য এটি গ্রামে এত জনপ্রিয়। রাতের ভাত ১০-১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলেই তৈরি হবে পান্তা ভাত। একে গাজানো ভাতও বলা হয়। এ ভাত যত প্রচার পাচ্ছে, তত একে নিয়ে গবেষণাও হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণায় জানা যায়, গাজানোর জন্য এটি অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। শরীর ঠান্ডা করে। শরীরে পানির অভাব দূর হয়। বৈশাখের তপ্ত দিনে একমুঠো পান্তা ভাত দেহকে সজীব ও সতেজ রাখে। এতে স্বাভাবিক ভাতের চেয়ে ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম বেশি থাকে। এমনকি জিঙ্কের পরিমাণও বেড়ে যায়। এ জন্য পান্তা ভাতে কখনো অরুচি হয় না। ভাত পানিতে বেশ কয়েক ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলে এতে বিভিন্ন মাইক্রো নিউট্রিয়েন্টসমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। আবার প্রোবায়োটিক হিসাবেও এর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। গ্রামবাংলার মানুষ না জেনে বুঝেই এ খাবারটি দিয়ে তাদের দিন শুরু করে। অজান্তেই তারা পুষ্টি পেয়ে যাচ্ছে। আসলে বেশ কয়েক বছর আগেও ভাত ছাড়া গ্রামে খাওয়ার মতো কিছুই ছিল না। গ্রাম্য ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য শহরের সংস্কৃতির সঙ্গে পান্তা ভাত মিশে গেছে। এ ভাত শর্করাসমৃদ্ধ জলীয় খাবার। এতে ল্যাক্টোব্যাসিলাস নামক একটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া দেখা যায়। যেটা ফাইটেট তৈরিতে সাহায্য করে। ফাইটেট ভেঙে-এর পুষ্টিগুণ অনেক বেড়ে যায় বলে এটি হজমে সহায়ক হয় ও পেট ফাঁপা কমায়।
পান্তা ভাতের সঙ্গে ইলিশ মাছ খাওয়ার প্রচলনের সঙ্গে শুঁটকি ভর্তা বা ভুনা খেতে দেখা যায়। আসলে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা খাওয়ার চল গ্রামে কখনোই ছিল না। তাদের খাবারই ছিল পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ এবং যে কোনো কিছুর ভর্তা। যারা শুঁটকি খেতে অপছন্দ করেন তারা যে কোনো মাছের ভর্তা দিয়ে পান্তা ভাত খেতে পারেন।
বিভিন্ন ধরনের মাছ দিয়ে শুঁটকি করা হয়। যেমন-লইট্টা, রূপচাঁদা, ছুরি, চিংড়ি, পুঁটি, গজার, কাঁচকি, টেংরা ইত্যাদি। তাজা মাছের তুলনায় শুঁটকি মাছে প্রোটিন ও খনিজ লবণের পরিমাণ বেশি থাকে। এজন্য রক্তস্বল্পতা ও যাদের ক্যালসিয়াম প্রয়োজন, তাদের জন্য শুঁটকি মাছ বেশ উপকারী। পান্তা ভাত যা দিয়েই খাওয়া হোক না কেন, সবই বেশ পুষ্টিকর।
সতর্কতা : দূষিত পানি ও অপরিচ্ছন্ন পাত্রে ভাত ভিজিয়ে রাখলে তাতে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটতে পারে। এতে নানা ধরনের পেটের অসুখ, বমি, মাথাব্যথা হতে পারে। গরম অবস্থায় ভাতে পানি না দিয়ে, ভাত ঠান্ডা করে পানি দিতে হবে। এছাড়া ভাতের পানিতে যদি ফেনা দেখা যায় তাহলে সে ভাত ভালো ভাবে ধুয়ে খেতে হবে। তা না হলে সে ভাত খেলে পেট ফেঁপে যেতে পারে। এদিকে শুঁটকি মাছ খেতে গেলেও বেশ সতর্কতা প্রয়োজন। শুঁটকি মাছ হালকা গরম পানি দিয়ে বারবার ধুয়ে তবে রান্না করে খেতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, শুধু পহেলা বৈশাখ কেন সারা বছরই মাঝে মাঝে পান্তা ভাত খান। দেহে পুষ্টি ও পানি সঞ্চয় করুন।t
লেখক : চিফ নিউট্রিশন অফিসার ও বিভাগীয় প্রধান (অব.), বারডেম। সভাপতি, ডায়াবেটিস নিউট্রিশনিস্ট সোসাইটি অব বাংলাদেশ, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, শ্যামলী ও অ্যাডভান্স হাসপাতাল, ঢাকা।