বহুমাত্রিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ
পহেলা বৈশাখ মানেই কেবল উৎসবের রঙে রাঙানো একদিন নয়। এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের পুনর্নির্মাণের এক গভীর সাংস্কৃতিক মুহূর্ত। পুরোনোকে বিদায় জানিয়ে নতুনের আহ্বান জানানোর এই প্রহরে শিল্প-সাহিত্য-সংগীত এক অনিবার্য ভূমিকা পালন করে। প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী লুবনা মরিয়ম, কণ্ঠশিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল এবং নজরুল গবেষক সম্পা দাস তাদের নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বৈশাখকে দেখেছেন নতুন আলোয়। গ্রন্থনায় মীর সামী
বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখ কেবল একটি নববর্ষ উদ্যাপন নয়; এটি এই ভূখণ্ডের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাস, বহুত্ববাদী চেতনা এবং সামাজিক সহাবস্থানের এক শক্তিশালী প্রতীক। সাম্প্রতিক সময়ে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক বা অবমাননার প্রচেষ্টা দেখা যাচ্ছে, তা আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে অস্বীকার করার এক উদ্বেগজনক প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়। অথচ বাস্তব বাংলাদেশ—বিশেষত গ্রামীণ বাংলাদেশ—এই সংকীর্ণতার সম্পূর্ণ বিপরীত এক চিত্র বহন করে। কয়েকদিন আগে মৌলভীবাজার জেলার আদমপুর গ্রাম থেকে ফিরে আসলাম। সেখানে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে মণিপুরি মেইতেই সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী লাই হারাওবা উৎসব। আশ্চর্যের বিষয়, এই উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়েছে সম্পূর্ণ মুসলিম অধ্যুষিত গ্রামগুলোর মাঝখানে। কিন্তু কোথাও কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া তো দূরের কথা—স্থানীয় মুসলিম গ্রামবাসীরা কেবল সহ্যই করেননি, বরং উৎসবের আনন্দে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। এই আন্তঃসম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের এক স্বাভাবিক বাস্তবতা।
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। টাঙ্গাইল ও ঘাটাইল অঞ্চলে ‘শাওনে ডালা ‘উৎসবে মুসলমান গ্রামবাসীরা সাপের দেবী মনসাকে কেন্দ্র করে নদীপথে শোভাযাত্রা ও আচারানুষ্ঠানে অংশ নেন। আবার বহু লোকসাংস্কৃতিক পরিবেশনা শুরু হয় এক বিস্ময়কর সম্মিলিত আহ্বানে—“আল্লাহ, রাসুল এবং হিন্দু দেবী সরস্বতীর” উদ্দেশে প্রার্থনা করে। এই প্রথাগুলি প্রমাণ করে যে বাংলার সংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি বহুত্ববাদী বিশ্বাসব্যবস্থাকে ধারণ করে এসেছে।
এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বিতর্ক আসলে আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে ভুলভাবে বোঝার ফল। মঙ্গল শোভাযাত্রা মূলত একটি নান্দনিক ও প্রতীকী প্রকাশ—মানুষের সম্মিলিত আনন্দ, আশাবাদ এবং অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির আহ্বান। ইউনেস্কোও এটিকে মানবতার অসামান্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে যে প্রচারণা চলছে, তা আমাদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে সংকুচিত করার চেষ্টা।
এই সংকীর্ণতার শিকড় অনেক দূরে—ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে। ১৮৩৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্রিটিশ প্রশাসক থমাস বাবিংটন ম্যাকলে তাঁর বিখ্যাত Minute on Indian Education-এ বলেছিলেন, ভারতের জনগণকে এমনভাবে শিক্ষা দিতে হবে যাতে তারা “রক্তে ভারতীয় কিন্তু চিন্তায় ব্রিটিশ” হয়ে ওঠে। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি শ্রেণি তৈরি করা যারা নিজেদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের সহায়ক হবে।
দুঃখজনকভাবে, আমাদের নগরকেন্দ্রিক আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার অনেক অংশ এখনো সেই ম্যাকলেয়ীয় মানসিকতার প্রভাব বহন করে। ফলে আমাদের নিজস্ব লোকঐতিহ্য, গ্রামীণ জ্ঞানব্যবস্থা এবং বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক চর্চাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। অথচ গ্রামীণ বাংলাদেশ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ভূখণ্ডের সভ্যতাগত গভীরতাকে লালন করে এসেছে।
পহেলা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রা সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যেরই আধুনিক প্রকাশ। এটি কেবল একটি শোভাযাত্রা নয়—এটি বাংলার মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমাদের সংস্কৃতি ভিন্নতা, সহাবস্থান এবং সম্মিলিত আনন্দের উপর প্রতিষ্ঠিত।
আজকের সময়ে তাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো এই উৎসবগুলিকে রক্ষা করা—কেবল ঐতিহ্য হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সামাজিক চেতনার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে। কারণ পহেলা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রা রক্ষা করা মানে আসলে বাংলাদেশের আত্মাকে রক্ষা করা।