শনিবার সন্ধ্যা। অন্ধকারের মতো ভর করল ক্লান্তি আর অস্বস্তি। জানালেন বাড়ির গৃহপরিচারিকাকে। তড়িঘড়ি তাঁকে নেওয়া হলো মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে।
শনিবার সন্ধ্যা। অন্ধকারের মতো ভর করল ক্লান্তি আর অস্বস্তি। জানালেন বাড়ির গৃহপরিচারিকাকে। তড়িঘড়ি তাঁকে নেওয়া হলো মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে।
উপমহাদেশের সংগীতে আশা ভোঁসলে এমন এক কণ্ঠ, যাঁর সুরেলা ধ্বনি আট দশকের বেশি সময় ধরে মুগ্ধতা ছড়িয়েছে মানুষের হৃদয়ে। ২০টির বেশি ভাষায় গেয়েছেন ১২ হাজারেরও বেশি গান। সংগীতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গান গাওয়ার রেকর্ডও তাঁর দখলে।
আশা ভোঁসলের ছেলে আনন্দ ভোঁসলের দেওয়া তথ্যমতে, আজ সকাল ১১টায় মুম্বাইয়ের লোয়ার পারেলের কাসা গ্র্যান্ডে রাখা হবে শিল্পীর মরদেহ। সেখানেই শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন সবাই। এরপর আজ বিকেল ৪টায় শিবাজী পার্কে সম্পন্ন হবে আশার শেষকৃত্য।
আশার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এক্সে দেওয়া বার্তায় তিনি লিখেছেন, সেরা ও বৈচিত্র্যময় কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলেজির মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত। কয়েক দশকব্যাপী তাঁর অসাধারণ সংগীতযাত্রা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং বিশ্বজুড়ে অগণিত মানুষের হৃদয় ছুঁয়েছে। তাঁর কণ্ঠে ছিল এক চিরন্তন ঔজ্জ্বল্য। তাঁর সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলো আমি চিরকাল মনে রাখব। শিল্পীর পরিবার, অনুরাগী এবং সংগীতপ্রেমীদের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা। তিনি প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে যাবেন এবং তাঁর গান মানুষের জীবনে চিরকাল অনুরণিত হবে।’ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শোক জানিয়ে এক্সে লিখেছেন, ‘মহান সংগীত প্রতিভা আশা ভোঁসলের প্রয়াণে আমি গভীরভাবে শোকাহত। গায়িকা হিসেবে তিনি ছিলেন এমন এক অনুপ্রেরণা, যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের হৃদয়ে রাজত্ব করেছেন। তিনি বহু বাংলা গানও গেয়েছেন এবং বাংলায়ও অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। ২০১৮ সালে আমরা তাঁকে বঙ্গবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করতে পেরেছিলাম। তাঁর পরিবার, সহকর্মী এবং সারা বিশ্বের লাখ লাখ ভক্তের প্রতি আমার আন্তরিক সমবেদনা।’
এ ছাড়া বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান থেকে শুরু করে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, অক্ষয় কুমার, উদিত নারায়ণ, কাজল, করণ জোহরসহ অনেকেই শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশের রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা, চঞ্চল চৌধুরীরাও।
আশার আসল নাম আশা মঙ্গেশকর। ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের সাংলি জেলার গোয়ার এলাকায় পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের ঘরে তাঁর জন্ম। বাবা ছিলেন মারাঠি অভিনেতা ও গায়ক। আশার বড় বোন লতা মঙ্গেশকরও উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের একজন। মাত্র ৯ বছর বয়সে বাবাকে হারান। সে সময় পরিবারের হাল ধরেন বড় বোন লতা। এরপর আশাও শুরু করেন গানযাত্রা। মাত্র ১০ বছর বয়সে মারাঠি ছবি ‘মাঝা বল’ (১৯৪৩)-এ প্রথম প্লেব্যাক করেন তিনি। আর বলিউডে প্রথম গেয়েছিলেন ‘চুনারিয়া’ (১৯৪৮) ছবিতে। তারপর এক দীর্ঘ ইতিহাস। একের পর এক ভাষা ও ইন্ডাস্ট্রিতে শুধু গেয়েছেন আর শ্রোতাদের ভাসিয়েছেন আবেগে-উচ্ছ্বাসে-মুগ্ধতায়।
বয়স যখন সবে ১৬, তখনই বিয়ে করেন আশা। পরিবারের মত ছিল না। কারণ প্রেমিক গণপতরাও ছিলেন আশার চেয়ে ২০ বছরের বড়। তবু কৈশোরের তুমুল প্রেমের জোয়ারে ভেসে ১৯৪৯ সালে বিয়ে করেন তাঁকে। পারিবারিক জটিলতায় বোন লতার সঙ্গেও তখন বিবাদ লেগে থাকত আশার। আবার আশার গান করাও পছন্দ করত না স্বামীর পরিবার। এ নিয়ে বেশির ভাগ সময়ই মানসিক নির্যাতনের শিকার হতেন। বাধ্য হয়ে একবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন তিনি। তখন আশা চার মাসের অন্তঃসত্ত্বা। মেয়ে বর্ষা ও ছেলে হেমন্তকে সামলানো, সঙ্গে ক্যারিয়ারের তুমুল ব্যস্ততা। এর মধ্যে পরিবারের ঝামেলা। এত চাপ সইতে না পেরে ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন শিল্পী। পরে হাসপাতালে নিয়ে তাঁকে বাঁচানো হয়। সেই অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়ই শ্বশুরবাড়ি ছাড়েন আশা। তৃতীয় সন্তান আনন্দর জন্মের পর সন্তানদের নিয়েই নতুন জীবন সাজানো শুরু করেন। আর ১৯৬০ সালে বিবাহবিচ্ছেদ করেন গণপতরাওয়ের সঙ্গে।

বিপর্যস্ত এক অধ্যায়ের পর আশার জীবনে আলো হয়ে আসেন রাহুল দেব বর্মন (আর ডি বর্মন), কিংবদন্তি সংগীত তারকা। আর ডি বর্মনের সঙ্গে অসংখ্য শ্রোতাপ্রিয় গান করেছিলেন আশা। গান করতে গিয়েই আশার প্রেমে পড়েন রাহুল। এরপর ১৯৮০ সালে বিয়ে করেন তাঁরা। যদিও কিছুদিন পরই দুজনের মতের অমিল আর ক্যারিয়ার ইস্যুতে দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। তবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখেন। ১৯৯৪ সালে রাহুলের মৃত্যুতে আবার একা হয়ে পড়েন আশা। আবার মেয়ে বর্ষাও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। ২০১২ সালে আত্মহত্যা করেন বর্ষা। এর তিন বছর পর বড় ছেলে হেমন্তকেও হারান আশা। আর ২০২২-এ হারান প্রিয় বোন লতাকে।
এত এত বিয়োগ-বেদনার ভিড়ে আশার মনে জীবনের সঞ্চার করে গেছে গান। সুর আঁকড়ে ধরেই তিনি বেঁচে ছিলেন। ৯০ বছর বয়সেও দুবাই গিয়ে অনুষ্ঠানে গান করেছেন। চেয়েছিলেন শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত গানের সঙ্গেই থাকতে। দীর্ঘ সংগীতজীবনে ভারতের প্রায় সব পুরস্কারই পেয়েছেন আশা। আটবার পেয়েছেন ফিল্মফেয়ার পুরস্কার। এরপর ফিল্মফেয়ারের আজীবন সম্মাননাও পেয়েছেন তিনি। দুইবার পেয়েছেন ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। এ ছাড়া রেকর্ডসংখ্যক ১৮ বার পেয়েছেন মহারাষ্ট্র রাজ্য চলচ্চিত্র পুরস্কার। এর বাইরে ভারতের রাষ্ট্রীয় পদক পদ্মবিভূষণ (২০০৮), মহারাষ্ট্র ভূষণ (২০২১) এবং দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারে (২০০০) ভূষিত হয়েছিলেন তিনি। দুইবার মনোনয়ন পেয়েছিলেন সংগীতের সর্বোচ্চ পুরস্কার গ্র্যামিতে।