তাঁর গায়কির বিচার করার স্পর্ধা রাখি না
সাবিনা ইয়াসমিন কণ্ঠশিল্পী
তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল গত শতকের আশির দশকের শুরুর দিকে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে একটা অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। আমিও সেখানে অতিথি ছিলাম। ব্যাকস্টেজে গিয়ে দেখা করলাম।
তাঁর গায়কির বিচার করার স্পর্ধা রাখি না
সাবিনা ইয়াসমিন কণ্ঠশিল্পী
তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল গত শতকের আশির দশকের শুরুর দিকে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে একটা অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। আমিও সেখানে অতিথি ছিলাম। ব্যাকস্টেজে গিয়ে দেখা করলাম।
দ্বিতীয়বার দেখা হয়েছিল মুম্বাইতে, ‘অন্যায় অবিচার’ ছবির গান রেকর্ডিংয়ে। রাহুল দেব বর্মনের স্টুডিওতে রেকর্ডিংয়ের দিন তিনিও এসেছিলেন। সেদিনও একইভাবে কাছে টেনে নিলেন। আমি যখন ‘ছেড়ো না ছেড়ো না হাত’-এর ভয়েজ দিচ্ছিলাম খেয়াল করলাম তিনি একমনে শুনছেন।
যখন শুনলাম তিনি বেঁচে নেই, খুব কষ্ট লাগল। আসলে দুদিনের দুনিয়া, মানুষের কর্মটাই থেকে যায়। তাঁর গান হাজার বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে থাকবে। আমি তাঁর গায়কির বিচার করার স্পর্ধা রাখি না। এটুকু বলতে পারি, চটুল ঘরানার গানে তাঁর ধারে-কাছে কেউ ছিল না। রোমান্টিক গানেও তিনি অসাধারণ। এক কথায় বলতে গেলে, আশা ভোঁসলেকে হারিয়ে আমরা জীবন্ত এক ইনস্টিটিউট হারিয়ে ফেললাম। এ প্রজন্ম হয়তো তাঁকে সেভাবে চেনে না। তবে আমরা যারা তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম, আমাদের কাছে তাঁর প্রভাব আমৃত্যু রয়ে যাবে।
কথা বললে মনে হতো আবৃত্তি করছেন
রোজিনা অভিনেত্রী
কত যে স্মৃতি তাঁর সঙ্গে! আমার তিনটি ছবিতে তাঁর গান আছে। ‘বন্ধু আমার’ ও ‘অন্যায় অবিচার’-এর কথা মনে আছে। দারাশিকোর আরেকটি ছবির নাম মনে করতে পারছি না যদিও ‘অন্যায় অবিচার’-এর গানটিতে লিপসিং করেছিল নূতন। আশা দিদির সঙ্গে আমার দুইবার দেখা হয়েছে। প্রথমবার মুম্বাইতে, ‘অন্যায় অবিচার’ ছবির সেটে। কুমিরের সঙ্গে যে দৃশ্য, সেটার শুটিংয়ে তিনি ছিলেন। ছবির সব গান করেছিলেন রাহুল দেব বর্মন। পরিচালক শক্তি সামন্ত দাদা রাতে একটা পার্টি দিলেন। সেখানে আমরা মন খুলে কথা বলেছিলাম। আমাকে বলেছিলেন, ‘তুমি অনেক সুন্দরী। তোমার চোখ দুটিতে খুব মায়া আছে।’ দিদি অনর্গল বাংলায় বলতেন। হাজার হাজার হিন্দি গান গাইলেও বাংলায় কথা বলার সময় বোঝার উপায় ছিল না। খুব পরিপাটি থাকতেন দিদি।
আরেকবার দেখা হয়েছিল আলমগীর ভাইয়ের বাসায়। সেবার তাঁর ঢাকায় আগমন উপলক্ষে আলমগীর ভাই পার্টি দিয়েছিলেন। শোবিজের অনেকেই ছিলেন। আমাকে দেখেই চিনেছিলেন। একবারেই বলেছিলেন, ‘রোজিনা, কেমন আছো!’ কণ্ঠশিল্পীরা মনে হয় অনেক গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। আশা দিদি এই ব্যাপারে সেরাদের সেরা। তিনি কথা বললে মনে হতো কবিতা আবৃত্তি করছেন। দিদির আরেকটা ব্যাপার খুব খেয়াল করেছিলাম, তিনি বাংলাদেশ আর ভারত কখনো ভাগ করেননি। আমাদের গানের প্রশংসা করতেন খুব। বাংলা গান গাইতে খুব ভালোবাসেন। সাদা মনের মানুষগুলোকে হারিয়ে ফেলছি আমরা। একজন আশা ভোঁসলের রিপ্লেসমেন্ট কখনো হয় না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাঁর অভাব রয়ে যাবে।
ফেসবুক যখন শোকবই
খুব মিস করব
আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছি। পৃথিবী হারাল এক বিরল রত্ন, যা অপরিবর্তনীয়, অতুলনীয়। আমি তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছুই শিখেছি। শৈশবে দিদির গান শুনতাম এবং তাঁর অসাধারণ কণ্ঠের সূক্ষ্ম, নিখুঁত অলংকারগুলো অনুকরণ করার চেষ্টা করতাম। রিয়েলিটি শো ‘সুরক্ষেত্র’-এর বিচারকের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। আমরা এত হাসতাম, মজা করতাম, গল্প করতাম যে কয়েকটি পর্বের পর প্রযোজক আমাদের আলাদা বসানোর ব্যবস্থা করেন, যেন আমরা সহজে কথা বলতে না পারি। আশা দিদি জোর দিয়ে বলেছিলেন, আমি যেন তাঁর পাশের চেয়ারেই বসি। আর অবশ্যই, তাঁকে ‘না’ বলা যায় না। তিনি বিরিয়ানি আর চিংড়ি রান্না করে আমার জন্য নিয়ে আসতেন। আমরা ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিলাম, একে অপরকে গভীরভাবে ভালোবাসতাম ও সম্মান করতাম। আমি সব সময় বলতাম, তিনি যেন আমাকে নাম ধরে ডাকেন, ‘রুনাজি’ বা ‘আপ’ না বলেন। তিনি বলতেন, ‘আমি আপনাকে একজন মানুষ এবং একজন মহান শিল্পী হিসেবে সম্মান করি, তাই আমি আপনাকে এভাবেই ডাকব।’ দিদি, আমাদের দীর্ঘ ফোনালাপ, অন্তহীন আড্ডা আর আপনার সেই কণ্ঠ—‘রুনাজি, আপনি কেমন আছেন?’ আমি খুব মিস করব। আপনি চিরশান্তিতে বিশ্রাম নিন।
রুনা লায়লা কণ্ঠশিল্পী

পৃথিবী হারিয়েছে তাঁর প্রিয় কণ্ঠস্বর
শোকাভিভূত হৃদয়ে, কৃতজ্ঞতা ও বিদায় জানাচ্ছি অতুলনীয় আশা ভোঁসলেজিকে। যখন সংগীতার কর্ণধার সেলিম খান সাহেব আমাদের দুজনকে ‘দুটি মনে এক প্রাণ’ অ্যালবামের জন্য একত্র করেছিলেন, ২০০০ সালের শুরুর দিকে, তখন আমি শুধু একজন কিংবদন্তির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলাম না, আমি যেন সংগীতের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। স্টুডিওতে তাঁর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত আজও আমার স্মৃতিতে অম্লান। তাঁর বিনম্রতা ছিল তাঁর প্রতিভার মতোই অসীম। তিনি শুধু গান করতেন না, প্রতিটি সুরে, প্রতিটি কথায়, প্রতিটি নিঃশব্দ মুহূর্তে যেন প্রাণ ঢেলে দিতেন। আট দশকজুড়ে সাড়ে বারো হাজারের বেশি গানে তিনি কণ্ঠ দিয়েছেন। তবু স্টুডিওতে প্রতিটি গান গাইতেন যেন এটিই তাঁর প্রথম এবং শেষ গান। এটাই একজন সত্যিকারের কিংবদন্তির পরিচয়। পৃথিবী আজ তাঁর সবচেয়ে বহুমুখী, সবচেয়ে প্রিয় কণ্ঠস্বরটি হারিয়েছে। কিন্তু তাঁর গানগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনুরণিত হতে থাকবে। এমন প্রজন্মেও, যারা এখনো জন্ম নেয়নি। চিরসুরের মাঝে বিশ্রাম নিন, আশা দিদি।
বেবী নাজনীন, কণ্ঠশিল্পী
অন্য ভুবনের আশা
সুরেলা কণ্ঠ, কণ্ঠ দিয়েই খ্যাতি। জগজ্জুড়ে কণ্ঠশিল্পী হিসেবেই পরিচিত আশা ভোঁসলে। সেই শৈশব থেকে জীবনের সায়াহ্ন, মূলত গানই করেছেন তিনি। তবে এর বাইরেও রয়েছে আশার বিচরণ। রান্নার প্রতি বিশেষ ভালোলাগা ছিল তাঁর। নিজে রাঁধতে ভালোবাসতেন, মানুষকে খাওয়াতেও পছন্দ করতেন। সেই ভালোলাগার শুরু একদম ছোটবেলায়। বাবা দীনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন মঞ্চ অভিনেতা ও গায়ক। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে গিয়ে নাটক করত তাঁর বাবার থিয়েটার দল। সঙ্গে যেতেন আশাও। সেখানে সবাই মিলে একসঙ্গে খাবার খেত, ওই দৃশ্য ভীষণ আনন্দ নিয়ে দেখতেন আশা। রান্না ঘরে যেতেন, রান্নার কলাকৌশল দেখতেন। সেই রান্নাপ্রীতি থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে চালু করেন রেস্তোরাঁ ব্যবসা। ‘আশা’স’ নামে ২০০২ সালে একটি রেস্তোরাঁ চালু করেন দুবাইতে। পরে এর বিভিন্ন শাখা খুলেছেন ম্যানচেস্টার, বার্মিংহাম ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শহরে। এই অভিজাত রেস্তোরাঁ চেইনের জন্য ২০১৯ সালে ব্রিটিশ কারি অ্যাওয়ার্ডে আজীবন সম্মাননাও পেয়েছিলেন আশা।
গানের আশা যে অভিনয়ও করেছেন, তা জানেন কজন? ৯ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর সংকটে পড়ে আশার পরিবার। বড় বোন লতা মঙ্গেশকর পেশাদার গান শুরু করেন, আর আশা নাম লেখান অভিনয় ও গানে। প্রথম দিকে মারাঠি ছবিতে শিশুশিল্পী চরিত্রে অভিনয় করতেন, পাশাপাশি করতেন গান। গানেই বেশি সাফল্য পান। তাই অভিনয়টা আর নিয়মিত করেননি। তবে ৭৯ বছর বয়সে সবাইকে চমকে দিয়ে অভিনয়ে ফেরেন আশা। মারাঠি ছবি ‘মাই’ [২০১৩]-তে অভিনয় করেন মায়ের চরিত্রে। প্রধান চরিত্রে এটিই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র ছবি, ফলে ভারতে সবচেয়ে বেশি বয়সে অভিষেকের রেকর্ড দখলে নেন তিনি। ছবিটিতে তাঁর অভিনয় ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছিল। তবে পরে আর কোনো ছবিতে অভিনয়ে দেখা যায়নি শিল্পীকে।
সেরা বাংলা গান
ওপার বাংলার ১০
গান ছবি/অ্যালবাম
আমি অন্ধকারের যাত্রী—এপার ওপার
সন্ধ্যাবেলায় তুমি আমি বসে—আজ দুজনে [অ্যালবাম]
চোখে চোখে কথা বলো—আজ দুজনে [অ্যালবাম]
গুন গুন গুন কুঞ্জে আমার—রাজকুমারী
চিরদিনই তুমি যে আমার—অমর সঙ্গী
খুব চেনা চেনা মুখখানি—পুজোর গান [অ্যালবাম]
কথা দিলাম—সুরের আকাশে
আধো আলো ছায়াতে—কলঙ্কিনি কঙ্কাবতী
আর কত রাত একা—চোখের আলোয়
ছোট্ট একটা ভালোবাসা—জ্যোতি
সেরা বাংলা গান
এপার বাংলার ৫
গান ছবি/অ্যালবাম
কাল সারারাত ছিল স্বপ্নেরও রাত—প্রেমের প্রতিদান
ভালোবাসি ভালোবাসি—বন্ধু আমার
হাজার জনের মাঝে—মেয়েরাও মানুষ
বলো না বলো না—তোমার আমার প্রেম
নাগর আমার কাঁচা পিরিত—অন্যায় অবিচার
সেরা ২০ হিন্দি গান
গান ছবি
চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিল কো—ইয়াদোঁ কি বারাত
আভি না যাও ছোড় কর—হাম দোনো
কেহদুঁ তুমহে—দিওয়ার
ইন আঁখো কি মাস্তি—উমরাও জান
ও মেরে সোনা রে সোনা—তিসরি মঞ্জিল
আইয়ে মেহেরবান—হাওড়া ব্রিজ
পিয়া তু আব তো আজা—ক্যারাভান
দম মারো দম—হরে রাম হরে কৃষ্ণ
পরদে মে রেহনে দো—শিকার
ঝুমকা গিরা রে—মেরা সায়া
রাত বাকি বাত বাকি—নমক হালাল
ইয়ে রাতে ইয়ে মওসম—দিল্লি ঠগ
কাহি আগ লাগে লাগ যায়ে—তাল
রঙিলা রে—রঙিলা
বাচকে রেহনা রে—কম্পানি
রাধা ক্যায়সে না জলে—লগান
শারারা শারারা—মেরে ইয়ার কি শাদি হ্যায়
পেয়ার মে দিল পে মার দে—মহান
জারা সা ঝুম লু মে—দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে
চেহরা কেয়া দেখতে হো—সালামি
ও হাসিনা জুলফোওয়ালে—তিসরি মঞ্জিল