অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন পূর্ববঙ্গের প্রবীণতম কবি শাহাদাৎ হোসেন। প্রধান অতিথি ছিলেন সাহিত্যিক মোহম্মদ বরকতুল্লাহ্। বেগম ফেরদৌসীর [ফেরদৌসী রহমান] সুললিত কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া অনুষ্ঠানে ‘নববর্ষের দাবী’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন দৌলতউন্নেসা বেগম। কবি তালিম হোসেন, শামসুর রাহমান, তরীকুল আলম ও জাহানারা আরজু স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। গল্প পাঠ করেন কথাশিল্পী মাহবুবুল আলম ও আলি আহামেদ। আরো ছিল আব্বাসউদ্দীন আহমদ, বেদার উদ্দিন আহমদ, আব্দুল আলীম, গোলাম মোস্তফা, শামসুদ্দোহার সংগীত, বেগম ফেরদৌসীর খেয়াল এবং ওস্তাদ খসরুর দুটি স্বরগীতি পরিবেশন। এ ছাড়া অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন, কবি জসীমউদ্দীন, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, কবি সৈয়দ আবদুল মান্নান, প্রাবন্ধিক আকবর আলী, কথাশিল্পী নুরুন্নাহার বেগম, তরুণ চিত্রশিল্পী আমিনুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম, সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরী প্রমুখ সাহিত্যিক ও শিল্পী অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। আব্বাসউদ্দীন আহমদ সবাইকে নাশতা ও চা-পানে আপ্যায়িত করেন। নববর্ষ অনুষ্ঠানে অভ্যাগতদের আপ্যায়নের এই চিত্র আরো পাওয়া যায়। দেশভাগের পর পর এই ভূখণ্ডে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে এ ধরনের উদ্যোগ ছিল খুবই তাৎপর্যময়।

ছবি : শেখ হাসান
শুধু দৈনিক পত্রিকাই নয়, বাংলা ছোটগল্পেও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান এবং অনুষ্ঠানের আয়োজকদের পক্ষ থেকে অভ্যাগতদের আপ্যায়ন করার চমৎকার বর্ণনা পাওয়া যায়। সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বাসা’ শীর্ষক ছোটগল্পে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা এ রকম : “পয়লা বৈশাখের উৎসব সভা এবং সেই সঙ্গে ‘বিচিত্রানুষ্ঠান’ বলে একটা কথা সব জায়গায় বড্ড চলেচে—সেই ‘বিচিত্রানুষ্ঠান’।
যথারীতি সবই ছিল। সভাপতি নির্বাচন, উদ্বোধনী সঙ্গীত, মাঝে মাঝে বেকল হওয়া মাইক, রবীন্দ্র সঙ্গীত (ভুল সুরে), বক্তৃতা, তারপরে ‘বিচিত্রানুষ্ঠান’।
সর্বশেষ সভাপতির ভাষণ দিতে যখন উঠলাম, তখন রাত দশটা। লোক জড়ো হয়েছে বহু, কয়েক হাজার হবে। বিচিত্রানুষ্ঠানের পরে কেউ দাঁড়াতো না সভাপতির অভিভাষণ টভিভাষণ শুনবার জন্যে—কিন্তু সভার উদ্যোক্তারা ভারি চালাক, তাঁরা সর্বশেষে রেখেছিলেন একটি অতি লোভনীয় ব্যাপার এবং সেটা বড় বড় অক্ষরে কর্মসূচীতে ছাপিয়ে দিয়েছিলেন, সেটি হোল ‘জলযোগ’। অর্থাৎ দালদায় ভাষা বুঁদে আর দরবেশ মিঠাই, ব্যস! শালপাতার ঠোঙায় ইতিমধ্যেই স্বেচ্ছাসেবক দল সকলের পেছনের সারির ছেলেমেয়ের মধ্যে বিলুতে শুরু করে দিয়েছে।
দু’একজন চেচিয়ে বলতে লাগলেন—বড্ড গোলমাল হচ্ছে! দেওয়া বন্ধ করো এখন—দেওয়া বন্ধ করো—
আর দেওয়া বন্ধ করো! ঐজন্যেই আসা। আর ঐ ‘বিচিত্রানুষ্ঠান’ এর জন্যে। কে এসেচে সভাপতির বাজে ভ্যাজভ্যাস শুনতে?
দু’একবার হাততালি পড়লো। কিন্তু পিছনের ছেলেমেয়ের সারি ‘জলযোগ’ এর ঠোঙার জন্যে অধীর হয়ে উঠেছে। সংক্ষেপে সেরে বসে পড়লাম।
সভাপতিকে ধন্যবাদ দেওয়াও শেষ হয়ে গেল।
একজন ভদ্রলোক এসে বল্লেন—চলুন, একটু জলযোগ হেঁ হেঁ—এই পথে—আজ্ঞে—না। আয়োজন বেশ ভালোই। নিন্দে করবার কিছু নেই। খুব ভাল আয়োজন।’ বুঝাই যায় নববর্ষ অনুষ্ঠানের আপ্যায়ন যুক্ত ছিল বেশ আগে থেকেই।”
এবার মূল আলোচনায় আসা যাক। পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠানে পান্তা-ইলিশ যোগ হলো কিভাবে।
আবহমান কাল থেকে ভাত বাঙালির প্রধান খাদ্য। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটি আমাদের সমাজে বহুল প্রচলিত। চতুর্দশ-পঞ্চদশ শতকে সংকলিত এক অবহট্ট ছড়ায় বাঙালির এক অপূর্ব অনাবিল আহারের উল্লেখ পাওয়া যায় :
‘ওগ্গরা ভত্তা রম্ভঅ পত্তা
গাইক ঘিত্তা দুগ্ধ সজুক্তা
মোইলি মচ্ছা নালিত গচ্ছা
দিজ্জই কান্তা খা পুণবন্তা’
মর্মার্থ হলো, কলার পাতে গরম ভাপ ওঠা সফেন ভাত, গাওয়া ঘি, সঙ্গে দুধ, মৌরলা মাছের ব্যঞ্জন, নালিতা অর্থাৎ পাটশাক যে স্ত্রী নিত্য পরিবেশন করেন, তাঁর স্বামী পুণ্যবান।
এখানে ভাত-মাছের সঙ্গে অন্যান্য খাদ্যসামগ্রীর পরিচয় আমরা পাই। বাঙালির প্রধান খাদ্য এই ভাত কেমন হতে হবে, দ্বাদশ শতকের কবি শ্রীহর্ষ সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রেখেছেন। তাঁর ভাষায় : “পরিবেশিত ভাত থেকে ভাপ উঠছে ওপরে। প্রতিটি ভাত অভগ্ন, একটি থেকে অপরটি বিচ্ছিন্ন অর্থাৎ ঝরঝরে। সেই ভাত সুসিদ্ধ, সুস্বাদু ও শুভ্রবর্ণ, সরু এবং সৌরভময়।”
গরম ভাতের মতোই পান্তা ভাত বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ। পান্তা ভাতের সঙ্গে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সব বাঙালি কমবেশি পরিচিত। বাংলা অভিধানে ‘পান্তা’ শব্দের অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে ‘পানিতে ভেজানো বাসি ভাত’। গ্রামবাংলায় অবশ্য পান্তার সঙ্গে ‘বাসি’ ও ‘পানি’ যুগপত্ভাবে উচ্চারিত হয়—‘বাসি পান্তা’, ‘পানি পান্তা’।
পান্তা ভাতের তরল অংশ অর্থাৎ পানিকে বলে ‘আমানি’। একে ‘কাঞ্জী’, ‘কাঁজি’ও বলা হয়। আলাদা করে আমানি খাওয়ারও চল আছে। গরম ভাপ ওঠা সফেন ভাতের মতোই পান্তা, আমানি বা কাঞ্জী খাওয়ার প্রসঙ্গও সাহিত্যে এসেছে নানাভাবে। ‘চণ্ডীমঙ্গল’-এ ব্যাধপত্নী গর্ভবতী নিদয়ার গরম ভাত ফেলে পান্তা আর আমানি খেতে ভালো লাগছে—
‘পাঁচ মাসে নিদয়ার না রুচে ওদন।
ছয় মাসে কাঞ্জী করঞ্জায় মন।’
আবার ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যের নায়ক কালকেতুর খাওয়ার যে বিবরণ কবি দিয়েছেন, সেখানেও আমানি অর্থাৎ পান্তার নাম রয়েছে—
‘মুচড়িয়া গোঁফ দুটো বান্ধে নিয়া ঘাড়ে।
এক শ্বাসে তিন হাণ্ডি আমানী উজাড়ে\’
তবে একালের শৌখিন বাঙালির মতো তারা ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়ার জন্য হঠাৎ একদিন হন্যে হয়ে উঠত কি না তার কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি। দরিদ্র পরিবারে পান্তা খাওয়া হতো কাঁচা লঙ্কা ও পেঁয়াজ দিয়ে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ‘মৈমনসিংহগীতিকা’য়—
‘ঘরে আছিল পানি ভাত বাইরা দিল মায়।
কাচা লঙ্কা দিয়া বিনোদ কিছু কিছু খায়\’
কাজী নজরুল ইসলামের লেখায় পাই, মা তাঁর সন্তানকে দুধের পরিবর্তে আমানি অর্থাৎ পান্তা ভাতের পানি দিচ্ছেন—‘দুধের বদল ঝিনুক দিয়ে আমানি দেয় মায়ে’।
নববর্ষ উপলক্ষে একসময় এ দেশে আমানি খাওয়ার চল ছিল।
১৯৭০ সালের ২ মে ঢাকা থেকে প্রকাশিত তৎকালীন দ্য ডেইলি পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেতা খান আতাউর রহমানের এক দীর্ঘ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাতে লেখক এই ভূখণ্ডে নববর্ষে আমানি খাওয়া সম্পর্কে প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, এই প্রদেশের অতি ধার্মিক পরিবারেও তিনি এ অনুষ্ঠানটি পহেলা বৈশাখে প্রতিপালিত হতে দেখেছেন।
এ প্রসঙ্গে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক ১৩৭৭ বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ ‘বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ’ শীর্ষক এক নিবন্ধে লিখেছেন, “বৈশাখ মাসে প্রাতে এক থাল ‘পান্তা’ খেয়ে মাঠে লাঙল দিতে বা’র হ’তে আমিও বাংলার কয়েক জেলার চাষীকে দেখেছি।”
খান আতাউর রহমান প্রদত্ত বর্ণনার ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক কৃত অনুবাদ নিম্নরূপ—
“চৈত্রি-মাসের শেষ দিনের (অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তির শেষ দিন গত রাত্রে) সন্ধ্যায় গৃহিণীরা এক হাঁড়ি পানিতে স্বল্প পরিমাণ অপক্ব (আম) চাউল ছে’ড়ে দিয়ে সারাটি রাত ভিজতে দেন এবং তার মধ্যে একটা কচি আমের ডাল বসিয়ে রাখেন। ‘পয়লা বৈশাখের’ ভোর বেলায় সূর্যোদয়ের পূর্বে ঘুম থেকে উঠে তাঁরা (গৃহিণীরা) ভিজা চাল গৃহের সকলকে খেতে দেন। ঘরের সবাই মিলে অথবা একে একে তা খেতে থাকে; আর হাঁড়িতে ডোবা আমের শাখা দিয়ে গৃহিণীরা সকলের গায়ে পানি ছিটাতে থাকেন। তাঁদের ধারণা, এতে ক’রে গৃহে নতুন বছরের শান্তি নেমে আসে।”
এনামুল হক পূর্বোক্ত নিবন্ধে লিখেছেন, “এখনও [১৩৭৭] চট্টগ্রাম জেলার গ্রাম-দেশে বৈশাখ মাসের সকাল বেলায় এক মুঠো চাল ও এক ‘কত্তি’ (নল বিশিষ্ট মাটির পানপাত্র) ঠাণ্ডা পানি খেয়ে অনেক চাষী মাঠে লাঙল দিতে যায়। তারা বলে, এতে শরীর ঠাণ্ডা থাকে। মনে হয় এও ‘আমানি’র আর এক সংস্করণ।”
এনামুল হক ছিলেন ভাষাবিজ্ঞানের বিশিষ্ট পণ্ডিত। ‘আমানি’ শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে তিনি লিখেছেন— “আমানি শব্দটি ‘আমপানীয়’ অথবা ‘অম্লপানীয়’—এই দুই প্রাচীন ভারতীয় আর্য ভাষার শব্দ থেকে উৎপত্তি লাভ করে থাকবে। শব্দ দুইটির বিবর্তনের ধারা এইরূপ :
আমপানীয়>আমআনিআ>আমআনি>আমানি; অর্থাৎ, অসিদ্ধ (আম) চাউল জাত জল।
আম্লপানীয়>অম্লআনিঅ>আমআনি>আমানি; অর্থাৎ
সিদ্ধ চাউলজাত টক পানীয়; পান্তাভাতের পানি; কাঁজি।
এখানে আমাদের নববর্ষের আমানির অর্থে প্রথম শব্দটি (আমপানীয়) প্রযোজ্য। এটা আদিমতম রীতির পরিচায়ক। দ্বিতীয় শব্দটি সভ্যতার পরবর্তী স্তরের। এই স্তরে মানুষ পাক করতে ও তাকে সঞ্চয় ক’রে রেখে বাসী করে খেতে শিখেছে। সভ্যতার এই স্তরে আমাদের দেশের মানুষ আমানি বা কাঁজি খেয়েও নববর্ষের উৎসবে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারে।”
এ থেকে সহজেই অনুধাবন করা যায়, বাংলা নববর্ষের সঙ্গে বাঙালি কৃষকের পান্তা খাওয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিন আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। কিন্তু তা ছিল একান্ত ঘরোয়া আয়োজন।
বাংলা নববর্ষ অনুষ্ঠানে অর্থের বিনিময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পান্তা খাওয়ার, আরো নির্দিষ্ট করে বললে পান্তা-ইলিশ খাওয়ার প্রচলন খুব বেশিদিন আগের নয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ৩ বৈশাখ ১৩৯১/১৬ এপ্রিল ১৯৮৪ সোমবার ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক দেশ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ‘বটমূলে নববর্ষের অনুষ্ঠান ও পান্তা’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশিত হয়। সংবাদভাষ্যটি নিম্নরূপ : “কেউ বলছেন ‘পান্তা সংস্কৃতি’, কেউ বলছেন ‘উপহাস’। যে যা-ই বলুক, এবারের পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে পান্তা ভাতের স্টল নগরবাসীর কাছে নতুন চমক।
একদিকে সংগীতের মূর্ছনা, জনকোলাহল; অন্যদিকে মাটির শানকিতে পান্তা ভাত, আলু ভর্তা আর ইলিশ ভাজা খাওয়ার ধুম। ৫ টাকার বিনিময়ে শখ করে পহেলা বৈশাখে যারা এক শানকি পান্তা কিনে খেয়েছেন—তাদের মধ্যে এই সরকারের একজন সাবেক মন্ত্রীও রয়েছেন।
পান্তার স্টলে লেখা ছিল—‘আমরা বাংলাদেশী’। ছড়ায় ছন্দে লেখা ছিল : পান্তা ভাত ইলিশ ভাজা/লংকা লবণ পেঁয়াজ মজা/পাঁচ টাকা দিলে/এক শানকি মিলে।’
উদ্যোক্তাদের আয়োজন বৃথা যায়নি। তারা প্রায় ৪০০ টাকার মতো পান্তা ভাত বিক্রি করেছেন। এরমধ্যে অনেকেই পয়সা না দিয়ে কেটে পড়েছেন। সাবেক তথ্যমন্ত্রী এবং পরে দপ্তরবিহীন ‘শুধু মন্ত্রী’ এবং বর্তমানে মস্কোয় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সৈয়দ নাজমুদ্দিন হাসেম সস্ত্রীক স্টলে এসে পান্তা ভাত খেয়ে গেছেন।”
পান্তা-ইলিশের সংবাদ দৈনিক বাংলার বাণীতেও মুদ্রিত হয়। “…রমনার সংগীত জমায়েতকে ঘিরে বেশ কিছু বিক্রয় স্টল তাদের পসরা জমিয়েছিল। তবে নববর্ষের শুভেচ্ছা কার্ডের চেয়ে এক টুকরো ভাজা ইলিশসহ পান্তা ভাত প্রচুর বিকিয়েছে।”
দৈনিক ইত্তেফাকের তথ্য অনুযায়ী ১৯৮৫ সালে পান্তা ইলিশের চাহিদা এবং মূল্য দুটিই বৃদ্ধি পায়, “রমনার বটমূলে সৌখিন পান্তা ও ইলিশ মাছ ভাজার দোকানে ছিল সবচাইতে বেশি ভিড়। মাছের তারতম্যে প্রতিপ্লেট ৭ হইতে ১০ টাকা খরচ করিয়া অনেককেই ‘বহুদিন পর ঢেকুর’ তুলিতে দেখা যায়।”
তবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে পান্তা-ইলিশ বিক্রির উদ্যোক্তা এবং শুরুর সময়কাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। দৈনিক দেশ ও সাপ্তাহিক বিপ্লব পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন সাংবাদিক, লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা যায়। এ প্রসঙ্গে সে সময় পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালের (বর্তমানে কানাডাপ্রবাসী) সঙ্গে কথা বলে এবং এ সম্পর্কিত তাঁর একটি লেখা থেকে জানা যায়, শুরুটা ১৯৮৩ সালে। দৈনিক দেশ ও সাপ্তাহিক বিপ্লবের কার্যালয় ছিল ৫ সেগুনবাগিচায়। সাপ্তাহিক বিপ্লবের কবি সিকদার আমিনুল হক, কবি ফারুক মাহমুদ (সহকারী সম্পাদক) দৈনিক দেশের সাহিত্য সম্পাদক হেলাল হাফিজ, সাংবাদিক মাহবুব হাসান, শহিদুল হক খান, মুন্সী আবদুল মান্নান, রোজী ফেরদৌস প্রমুখ সম্পৃক্ত ছিলেন এই পত্রিকা দুটির সঙ্গে। সে কারণেই সেখানে বসত লেখক আড্ডা। এই আড্ডার নিয়মিত সদস্য ছিলেন কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল। তিনি জানান, “১৯৮৩ সাল। চৈত্রের শেষ। চারিদিকে বৈশাখের আয়োজন চলছে। আমরা আড্ডা দিতে পান্তা-ইলিশের কথা তুলি। বোরহান ভাই রমনা বটমূলে পান্তা-ইলিশ চালুর প্রস্তাব দিলেন, আমি সমর্থন দিলাম। ফারুক মাহমুদ পুরো আয়োজনের ব্যবস্থা করলেন। সম্ভবত ৫ টাকা করে চাঁদা ধরলেন। বাজার করা আর রান্না-বান্নার দায়িত্ব দিলেন বিপ্লব পত্রিকার পিয়নকে। রাতে ভাত রেঁধে পান্তা তৈরি করে, কাঁচা মরিচ-শুকনো মরিচ, পেঁয়াজ, ইলিশ ভাঁজা নিয়ে পর দিন ‘এসো হে বৈশাখে’র আগেই ভোরে আমরা হাজির হলাম বটমূলের রমনা রেস্টুরেন্টের সামনে। মুহূর্তের মধ্যে শেষ হলো পান্তা-ইলিশ। এভাবে যাত্রা শুরু হলো পান্তা ইলিশের।”
১৯৮৪ সালে দৈনিক দেশ পত্রিকার সংবাদে যেমনটি লেখা হয়েছিল : “কেউ বলছেন ‘পান্তা সংস্কৃতি’, কেউ বলছেন ‘উপহাস’—শুরু থেকেই পান্তা-ইলিশের পক্ষে-বিপক্ষে সোচ্চার হলেন ঢাকার কবি-সাহিত্যিক-বৃদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মীরা।”
খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সে সময় ‘কীটনাশকের কীর্তি’ শিরোনামে এক গল্পে বিদ্রুপ করে লেখেন—
“…কী করে বছরের একদিন লালপাড় হলুদ শাড়ি পরে লাল টয়োটা হাঁকিয়ে পান্তাভাত খাওয়ার রঙ ফলাতে যায় রমনা পার্কে…’ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ আর গ্রাম্যতার দোহাই দিয়ে ঠেকানো গেল না।”
কয়েক বছরের মধ্যেই তা রমনা উদ্যানের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ল পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে আয়োজিত নানা অনুষ্ঠানে, অভিজাত বেস্তোরাঁর খাদ্যতালিকায়, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের খাবারের টেবিলে। তারপর সারা দেশে।