সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০৩ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

সংযোগের সীমানায় শিল্প

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ২৫ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর উত্তরা যেন গত শুক্রবার বিকেল থেকে হয়ে উঠেছে এক অনির্দিষ্ট সংলাপের ভূগোল। গ্যালারি কায়ার নীরব প্রাঙ্গণে শুরু হওয়া ‘CROSSROAD… not a project’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি কেবল শিল্পকর্মের সমাবেশ নয়; বরং এটি সময়, অভিজ্ঞতা ও ভাবনার এক বহুমাত্রিক বিনিময় ক্ষেত্র। ১১ জন শিল্পীর ৪৬টি কাজ নিয়ে গড়ে ওঠা এই আয়োজন সমকালীন শিল্পচর্চার বৈচিত্র্য যেমন সামনে আনে, তেমনি প্রশ্ন তোলে শিল্পের অবস্থান ও ভাষা নিয়েও।
প্রদর্শনীর উদ্বোধনী মুহূর্তে বিকেল সাড়ে ৫টার আলোয় যে আবহ তৈরি হয়, তা যেন শিল্পের ভেতরকার ‘ক্রসরোড’-এর প্রতীক। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা।
পুরো প্রদর্শনীর প্রতিটি কাজই শুধু দেখার জন্য নয়, অনুভব করার জন্য। যেন তারা চুপচাপ কিছু প্রশ্ন রেখে যায়, যার উত্তর হয়তো আমাদের নিজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে।
এ রকম অনূভুতি নিয়ে গ্যালারি ঘুরে দেখা যায়, তেজশ হালদার যশের তৈরি ভাস্কর্য ‘পারফেক্ট অ্যাকশন ফর হারভেস্ট’। কাছে যেতেই বোঝা যায়, পিতল আর আয়রনের মিশেলে গড়া এই কাজটি যেন স্থির নয়, বরং চলমান। মনে হয়, চোখের সামনেই এটি বদলে যাচ্ছে। একটা জৈবিক শরীরের মতো, যা সময়ের সঙ্গে নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলছে। ওপরের দিকে যুক্ত কাঁচির আকৃতিটা হঠাৎই দৃষ্টি টানে। এটা শুধু ফসল কাটার ইঙ্গিত নয়, বরং যেন কোনো সিদ্ধান্তের মুহূর্ত–কিছু কেটে ফেলা, কিছু ছেড়ে দেওয়া। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে হয়, এই ভাস্কর্যের ভেতরেই সৃষ্টি আর ধ্বংস পাশাপাশি শ্বাস নিচ্ছে।
আবার সোহাগ পারভেজের আঁকা ‘টেকনাফ লেক’ পেইন্টিং দেখলে একেবারেই ভিন্ন অনুভূতির সৃষ্টি হয়। দূর থেকে দেখলে প্রথমেই শান্ত লাগে, কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায় এর ভেতরে এক গভীর আবেগ লুকিয়ে আছে। নীল আর সবুজের স্তরগুলো যেন ধীরে ধীরে খুলে যায়, ঠিক যেমন স্মৃতি খুলে যায় সময়ের সঙ্গে। পানির ওপর আলো পড়ে মৃদু ঝিলিক তৈরি করছে, আর দূরে একটা নৌকা। অস্পষ্ট, প্রায় মিলিয়ে যাওয়া। মনে হয়, এই দৃশ্যটা কোথাও আগে দেখেছি, হয়তো কোনো স্মৃতিতে, হয়তো কোনো স্বপ্নে। এখানে প্রকৃতি শুধু চোখে দেখা দৃশ্য নয়, বরং একটা অনুভব, যা ধরা যায় না, কিন্তু টের পাওয়া যায়।
হাঁটতে হাঁটতে চোখ পড়ে সুশান্ত কুমার অধিকারীর ‘জয় ইন নেচার’ সিরিজের দ্বিতীয় পেইন্টিংয়ের ওপর। এই কাজটার সামনে দাঁড়ালে যেন একটু থমকে যেতে হয়। ঘন রং, স্তর আর টেক্সচারের ভেতরে একটা মানবাকৃতি খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু সেটা স্পষ্ট নয়। বরং ভেঙে ভেঙে গেছে, ছড়িয়ে গেছে। মনে হয়, মানুষটা আর আলাদা কিছু নয়, প্রকৃতির সঙ্গেই মিশে গেছে। রেখাগুলো অনিয়মিত, যেন কোনো ভেতরের অস্থিরতা প্রকাশ করছে। কিন্তু সেই অস্থিরতার মধ্যেও একটা শান্তি আছে। নিজেকে খুঁজে পাওয়ার শান্তি। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে প্রশ্ন জাগে। আমরা কি সত্যিই আলাদা কোনো সত্তা, নাকি প্রকৃতিরই একটা চলমান অংশ হিসেবে রয়েছি।
এ রকমভাবে প্রদর্শনীতে স্থান পাওয়া সকল শিল্পকর্মই প্রশ্ন তৈরি করে দর্শকের মধ্যে। এই প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণকারী শিল্পীরা হলেন– আবদুস সাত্তার তৌফিক, অসীম হালদার সাগর, আজহারুল ইসলাম চঞ্চল, আজমীর হোসেন, মনজুর রশিদ, নবরাজ রায়, শাহানূর মামুন, সহিদ কাজী, সোহাগ পারভেজ, সুশান্ত কুমার অধিকারী ও তেজশ হালদার জোশ।
প্রত্যেকে নিজস্ব ভাষা ও শৈলীতে উপস্থিত হয়েছেন। তাদের কাজের ভেতর দিয়ে যে বৈচিত্র্য প্রকাশ পায়, তা কোনো একক ধারার মধ্যে আবদ্ধ নয়। বরং এটি বহুস্বরের এক সম্মিলন, যেখানে প্রত্যেক শিল্পী নিজস্ব অবস্থান থেকে ‘ক্রসরোড’-কে ব্যাখ্যা করেছেন।
এই প্রজন্মের শিল্পীরা, যারা মূলত ১৯৭০ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন, তারা এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছেন। একদিকে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার, অন্যদিকে নতুন পরীক্ষার আকাঙ্ক্ষা। এই দুইয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে তারা নির্মাণ করছেন সমকালীন শিল্পের নতুন ভাষা। কেউ ফ্রিল্যান্স শিল্পচর্চায় নিয়োজিত, কেউ আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত থেকে নতুন প্রজন্মকে প্রভাবিত করছেন। ফলে এই প্রদর্শনীটি শুধু শিল্পকর্মের নয়, বরং একটি প্রজন্মের চিন্তার প্রতিফলন।
‘CROSSROAD… not a project’ শিরোনামটিই এই আয়োজনের মূল দর্শনকে স্পষ্ট করে। এটি কোনো নির্দিষ্ট থিম বা কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ নয়। বরং এটি একটি জায়গা– যেখানে ভিন্ন অভিজ্ঞতা, মতাদর্শ ও নান্দনিক ভাষা এক হয়েছে। এই প্রদর্শনী তাই কোনো প্রকল্প নয়। এটি এক চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে শিল্পীরা নিজেদের অবস্থান খুঁজে নিচ্ছেন।
‘ক্রসরোড’ কেবল একটি প্রদর্শনী নয়। সমকালীন শিল্পকলার নানা মাধ্যম ও ভাবনার সঙ্গে দর্শকদের সংযোগ ঘটানোই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য। এটি এক ধরনের মানসিক ভ্রমণ। এখানে দর্শক কেবল শিল্পকর্ম দেখেন না, বরং নিজেকেও নতুনভাবে আবিষ্কার করেন। এই সংযোগের সীমানায় দাঁড়িয়ে শিল্প যেন মনে করিয়ে দেয়, প্রতিটি পথই আসলে একটি নতুন সম্ভাবনার দিকে নিয়ে যায়।
আগামী ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল সাড়ে ১১টা থেকে রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত এই প্রদর্শনী সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com