সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০৪ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

বাগানের মাউন্ট পোপা, লোককাহিনি ও কিঞ্চিৎ ভ্রমণ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

বাগান– বার্মার মান্দালয় অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটন এলাকা। একসময় এখানে প্যাগোডা, স্তুপা ও মন্দিরের সংখ্যা ছিল ১০ হাজারেরও বেশি। পাঠকদের কেউ কি জানেন, এত বিপুল সংখ্যক প্যাগোডা কীভাবে সেখানে নির্মিত হয়েছিল? প্রত্নতত্ত্ববিদদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। ইতিহাসবিদ ও লোককাহিনি সংগ্রাহক মাং টিন আং তাঁর বার্মিজ ফোক টেলস গ্রন্থে “বাগানে এতসংখ্যক প্যাগোডা কোথা থেকে এলো?” শীর্ষক গল্পে এই প্রশ্নের ‍জবাব খুঁজে বের করেছেন।
ভ্রমণপিপাসুদের কাছে বাগানের মাউন্ট পোপা একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় জায়গা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিটার উঁচু মাউন্ট পোপার পাদদেশে রয়েছে সবুজ বনাঞ্চল। এখানে খাড়া আগ্নেয়শিলার ওপর নির্মিত বিখ্যাত তাউং কালাত মনেস্ট্রি তথা বৌদ্ধবিহার, যেখানে পৌঁছাতে প্রায় ৭৭৭টি সিঁড়ি অতিক্রম করতে হয়। মাউন্ট পোপা শুধু একটি প্রাকৃতিক দর্শনীয় স্থানই নয়; বামারদের লোকবিশ্বাস অনুযায়ী এটি ৩৭ জন ‘ন্যাট’-দের আবাসস্থল। ন্যাটরা হলেন বামার লোকবিশ্বাসে পূজিত আধ্যাত্মিক সত্তা। একটু চমকে দেওয়ার মতন তথ্য হলো এদের মধ্যে দুজন মুসলমান ন্যাটও আছেন।
চলুন মাং টিন আং সংগৃহিত গল্পটি একপ্রস্থ পড়ে নেই।
অনেকদিন আগের কথা। বাগানের জনসাধারণ ছিল দরিদ্র। এখানে বাস করতেন একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু; যিনি রসায়নশাস্ত্রবিদও ছিলেন। চেষ্টা করছিলেন পরশপাথর আবিষ্কারের। এই গবেষণা ছিল অত্যন্ত জটিল ও ব্যয়সাপেক্ষ। তিনি পুরোনো চামড়ার কাগজে (পার্চমেন্ট) লেখা প্রাচীন একটা সূত্রমতে, ধাপে ধাপে পরশপাথর আবিষ্কারের কাজ করে যাচ্ছিলেন। রাজাও তার রাজকোষ উজাড় করে দিলেন জনগণের ভাগ্য ফেরাতে। একসময় রাজকোষাগার শূন্য হয়ে যায়; কিন্তু পরশপাথরের দেখা মেলে না। প্রজারাও আর তাকে কর দিতে অসম্মতি জানায়। তারা বলাবলি করছিল, “রাজা কি একটা ভণ্ডের পাল্লায় পড়ে সব স্বর্ণ ধ্বংস করে দিল।” এদিকে ভিক্ষু-রসায়নবিদ তাঁর গবেষণার শেষ ধাপে ছিলেন। তিনি জনগণকে বোঝালেন, “এই ধাপে একটুকরো ধাতব অম্লদ্রবণে ছেড়ে দিলেই তা পরশপাথরে রূপান্তরিত হবে।”
প্রজাদের তিনি কথা দিলেন, এই পরীক্ষণই শেষ; এরপর পরশপাথর পাওয়া যাবেই। প্রজারাও তাদের শেষ সম্বলটুকু তাঁকে দিয়ে দিলেন। এক সপ্তাহ হয়ে গেল। কিন্তু হায়! শেষ পরীক্ষণের ফলাফলও আগের মতনই বিফলে গেল! ব্যর্থমনোরথ ভিক্ষু রাজপ্রাসাদে রাজাকে বিস্তারিত জানাতে গেলেন। যেহেতু দুঃসংবাদ বাতাসের আগে ধায়, তাই বিক্ষুব্ধ প্রজারা সব জেনে রাজপ্রাসাদ ঘিরে ফেলে। তারা ‘ভণ্ড-প্রতারক’ ভিক্ষুর শাস্তি দাবি করতে লাগলেন। রাজা কিন্তু ভিক্ষুকে বিশ্বাস করতেন। তাই তাঁকে জনরোষ থেকে বাঁচাতে চিন্তায় কপালে ভাঁজ দেখা দিল।
ভিক্ষু নিজেই একটা সমাধান দিলেন বাতলে।  নিজের চোখ দুটো তুলে নিয়ে প্রজাদের সামনে দাঁড়িয়ে ভিক্ষু বললেন, “দেখুন আমার অক্ষিকোটর গোলকশূন্য: নিশ্চয়ই এখন আমার যথেষ্ট শাস্তি হয়েছে।”
প্রজারা বিচার পেয়েছে ভেবে সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরে গেল। এতে ভিক্ষু অন্তত সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান।
বেশ কদিন নিজেকে তিনি পরীক্ষণাগারে অন্তরীণ রাখলেন। বিজ্ঞানে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ভেঙে ফেললেন সকল পরীক্ষণ যন্ত্র-যন্ত্রাংশ। তরুণ শিক্ষানবিশ সহযোগীকে পরীক্ষণে ব্যবহৃত সবকিছু শৌচাগারে ফেলে দিতে নির্দেশ দিলেন। সেও তাই করল। মূল্যহীন একটি ধাতবখণ্ড শৌচাগারের মাটির মেঝেতে পড়ার পর শৌচাগার হঠাৎ আলোয় ঝলমল করে উঠল!
সে ভিক্ষুকে জানাল, “মহাশয় দেখুন, শৌচাগারে পরি আর ভূতপ্রেত এসেছে!” ভিক্ষু বলল, “বৎস, আমি দেখতে পাই না। তুমি সবিস্তারে বর্ণনা কর।”
সব শুনে, ভিক্ষু বুঝতে পারলেন চামড়ার কাগজে ‘রাতের মাটি’র পরিবর্তে ভুলক্রমে ‘অম্ল’-এর কথা লেখা ছিল। বুঝতে পারলেন তিনি সত্যি-সত্যিই পরশপাথর আবিষ্কার করে ফেলেছেন! শৌচাগার থেকে পরশপাথরটি শিষ্য এনে গুরুর হাতে দিল।
শিষ্যকে নির্দেশ দিলেন, কসাইখানা থেকে হয় ছাগল না হয় ষাঁড়ের একজোড়া অক্ষিগোলক নিয়ে আসতে। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় শিষ্য ছাগল আর ষাঁড়ের মাত্র একটি করে চোখ খুঁজে পেল। অক্ষিকোটরে চোখ দুটো রাখতেই তাতে ঠিকঠাক বসে গেল। পরশপাথরের স্পর্শে ভিক্ষু ফিরে পেলেন তাঁর দৃষ্টি। সেই থেকে নিজেকে কৌতুক করে ‘ভিক্ষু ছাগ-বৃষ’ বলে পরিচয় দিতেন।
পরশপাথর নিয়ে অনতিবিলম্বে, ভিক্ষু চলে গেলেন রাজপ্রাসাদে। রাজাকে জানালেন, ভোরেই তিনি হিজরত করতে চান। রাজাকে অনুরোধ করলেন, প্রজাদের দস্তা আর পিতল গলিয়ে একটা ধাতব পাত্রে নিয়ে নিজ নিজ বাসার সামনে ভোরের আলো ফোটার আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকার আদেশ দিতে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই ভিক্ষু পরশপাথরটি প্রতিটি পাত্রে স্পর্শ করাচ্ছিলেন; পরক্ষণেই পাথরটি তাঁর হাতে লাফিয়ে ফেরত আসছিল। একই সঙ্গে পাত্রে রাখা দস্তা রুপায় আর তামা সোনায় পরিণত হচ্ছিল। এতেই রাতারাতি বাগানের প্রজারা ধনী হয়ে যান। সম্পদশালী প্রজারা একের পর এক ধর্মস্থাপনা তৈরি করতে লাগল। সেই থেকে বাগান প্যাগোডা, মন্দির আর স্তুপার নগরী হিসেবে পরিচয় লাভ করল। এরপর রসায়নশাস্ত্রবিদ ভিক্ষু আর তার শিষ্য পোপা পর্বতের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। পাদদেশে আসতেই ওপর থেকে লতানো গাছ নিচে নেমে তাদের সাদরে জড়িয়ে পাহাড়ের চূড়ায় তুলে নিল। পরশপাথরের প্রভাবে মাটিতে থাকা মূলগুলো ছয়টি ওষুধ গোলকের রূপ নিল। ভিক্ষু চটপট তিনটি গোলক গিলে ফেললেন, বাকি তিনটি শিষ্যকে দিলেন। কিন্তু শিষ্য তা মুখে তুলতে পারল না। তার কাছে এই গোলকগুলোকে নরমাংসের মতন, আর এর মধ্যকার রসটুকু মানুষের রক্তের মতন মনে হচ্ছিল।
ভিক্ষু জিজ্ঞাসা করলেন, “কী সমস্যা বৎস?”
শিষ্য জানাল, “এত নরমাংস আর রক্ত!”
“না তা কখনোই হবার নয়।” জবাব দিয়ে ভিক্ষু বললেন, “আচ্ছা আমি কি তোমাকে কখনও অসত্য বলেছি?” শিষ্য গোলকগুলো খেতে না পেরে বমন করে ফেলল। মনঃকষ্ট নিয়ে ভিক্ষু জানাল, “আমি নিশ্চিত আমার রসায়নশাস্ত্রের সাফল্য প্রচারের ভাগ্য তোমার আর নেই। আমাদের বিচ্ছেদ এখন আসন্ন।”
অশ্রুজলে শিষ্য তার মনিবকে বিদায় জানাল। বিদায় উপহার হিসেবে গুরু শিষ্যকে একটা সোনার মোহর দিলেন। লতানো গাছগুলো শিষ্যকে জড়িয়ে পোপা পর্বতের পাদদেশে নামিয়ে দিল। গুরুসঙ্গ বঞ্চিত শিষ্যের নিজেকে অসহায় লাগছিল। তাই বিহারে না ফিরে চলে এলো বিধবা মায়ের কাছে।
সাত সকালে মাকে বলল, “মা আমার জন্য নাশতা আনো।” মা বলল, “তুমি তো জানো পুত্র আমি গরিব, চাল কেনার একটা পয়সাও আমার হাতে নেই।”
শিষ্যের সোনার মোহরের কথা মনে পড়ল। পকেট হাতড়িয়ে তা মাকে দিয়ে দিল। মা দরজার দিকে পা বাড়াতেই শিষ্যের মনে হলো সে বোধহয় মোহরটি মাকে দেয়নি। কিন্তু মা মোহরটি হাতের মুঠোয় নিয়ে পুত্রকে দেখাল, “এই যে মোহর!”
একই ঘটনা দশবার ঘটল। দশিট মোহর বেরিয়ে এলো। তখনও আরেকটি সোনার মোহর শিষ্যের পকেটে রয়ে গেছে! শিষ্য বুঝতে পারল, ভিক্ষু তাকে একটি অলৌকিক উপহার দিয়ে গেছেন।

বাগানের উপাসনা স্থাপত্যগুলো আকৃতি বিসদৃশ। গাইড জানিয়েছিলেন এগুলোর আকৃতির পেছনে রয়েছে মানুষের অর্থনৈতিক সংগতি। বিষয়টি পরবর্তী সময়ে বার্মার নানা উপাসনালয়ে লক্ষ্য করেছি। জনসাধারণ বুদ্ধমূর্তি দিয়ে যাচ্ছে নানা আকার-প্রকারের, যার যেমন সামর্থ্য। বেশ কয়েকবার ভূমিকম্পে বাগানের অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়। বর্তমানে এখানে দুই হাজারের কম-বেশি স্থাপত্য নিদর্শন টিকে আছে।
এভাবেই বার্মার লোককাহিনি বাগানের হাজারো প্যাগোডার এক কল্পনাময় ব্যাখ্যা দেয়। ইতিহাস হয়তো ভিন্ন কথা বলবে, কিন্তু মানুষের কল্পনা প্রায়ই ইতিহাসের শূন্যস্থান পূরণ করে নেয় লোকগাথার মাধ্যমে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com