কৃষক কখন কোন শস্যের দানাটি বপন কিংবা রোপণ করবে, কখন মেঘ জমবে কি বৃষ্টি হবে, অথবা জমিকে ভেজাতে হবে লাঙলের জিভ দিয়ে– এ সবই নির্ভর করত বঙ্গাব্দ মাসের গতিবিধি, মেজাজ-মর্জির ওপর। এ জন্যই বঙ্গ সালকে ফসলি-সনও বলা হতো। আর সেই সনের বারো মাসে সবার অগ্রে বৈশাখ ঝান্ডা হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন ও আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনার কারণে এখন মাস এবং ঋতুকে চেনা যাচ্ছে না। এখন চলছে অসময়ে বৃষ্টির কাল, অতিবৃষ্টির দুঃসময়। অনাবৃষ্টি তো আছেই। সার্বিক বৈশ্বিক পরিবর্তনের জন্য পৃথিবীর ঘূর্ণনগতি বৃদ্ধি, অতিরিক্ত বাষ্পীভবন, অতিমারি কালের স্বল্প কার্বন নিঃসরণ– এসবকে কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রকৃতিতে এখন সুপ্রভাব-কুপ্রভাব হাত ধরাধরি করে চলে।
যান্ত্রিক পরিবর্তনই কৃষিতে ব্যাপক পরিবর্তনের নিয়ামক। আগের মতো বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠে ধান কর্তনের জন্য বিপুলসংখ্যক শ্রমিক নিয়োজিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। সম্পন্ন কৃষক বা জোতদাররা নব্বই, এমনকি শূন্য দশক পর্যন্ত এ কামলাদের দু’বেলা খাওয়ানোর দায়িত্বও গ্রহণ করতেন। সারাদিন ধান কাটা, বাড়ির উঠানে এনে স্তূপ করা, ধান মাড়াই, খড়ের গাদা নির্মাণকে কেন্দ্র করে শ্রমিকদের এক হাট বসে যেত। তখন কামলা বা স্বজন সমবায়ের মাধ্যমে একদিনে সব জমি কর্ষণও করা হতো। তাদের কেউ কেউ মজুরি গ্রহণ করত, আত্মীয়-পড়শি শ্রমিকরা করত না। তবে পর্যাপ্ত খাবার পেত সবাই।
তখন ছিল লাঙল আর জোয়ালের যুগ। লাঙল এমনই এক জমি কর্ষণযন্ত্র ছিল যাতে জড়িয়ে থাকত নির্মাতার মায়া, ভালোবাসা আর শ্রমনিষ্ঠা। একসময় কিশোর-কিশোরীরা মজা করে বলত– লাঙলের ইস, নদীর কূল, ইস্কুল! লাঙলের ইস বানানো হতো ঝাউগাছ দিয়ে। লাঙলের মূল কাঠামোটি জোয়ালের সাথে আটকানোর জন্য ইসের খাঁজ ব্যবহার করা হতো। এ ইস অতি উষ্ণতায় শুকিয়ে গেলে মিস্ত্রি এসে অতিরিক্ত কাঠের টুকরা গুঁজে দিয়ে তা মূল কাঠামোতে পুনঃসংযোগ দিত। কিন্তু এ মূল কাঠামোটিই ছিল আসল শিল্পকর্ম, যা বানানো হতো ‘বাইস’ নামক যন্ত্রটি দিয়ে। এ বাইসের বাঁট ছিল ঢেউ খেলানো যাতে সেটি হাতের সাথে লেপ্টে বা পেঁচিয়ে থাকতে পারে। তা নইলে লাঙল বানানো সম্ভব নয়। এ জন্য বলা হতো ‘শ কোপের লাঙল, এক কোপের চেলি’ (লাকড়ি)। কিন্তু এখন এ লাঙল, জোয়াল ও দেশীয় সেচযন্ত্রগুলো দেখতে হলে যেতে হয় জাদুঘরে।
বাংলার কৃষি এখন যান্ত্রিকীকরণের প্রভাবে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছে, মেশিনের তীব্র আওয়াজই এ নিঃসঙ্গতা ভঙ্গ করে। ট্রাক্টরে জমি কর্ষণের পর ধান উত্তোলনের সময় স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই মেশিন দ্বারা একত্রে তিনটি কর্ম সম্পাদিত হয়: ধান, অপুষ্ট ধান ও খড় পৃথকীকরণ। মেশিনের ভেতরেই মণকে মণ ধান ও চুচা ধান আলাদাভাবে জমা হয়। যন্ত্রটি কাদা বা জলমগ্ন জমিতে চলতে পারে না। কেবল তখনই কিছু কিছু জমির ফসল কাটার জন্য কায়িক শ্রমের প্রয়োজন হয়। অথচ একসময় জমিতে ফসল ফলানোর প্রস্তুতি পর্বেই কত রিচুয়াল বা কৃত্য ছিল। বোরো ধান রোপণের পর অনাবৃষ্টি দেখা দিলে ছেলেমেয়েরা দিত ব্যাঙের বিয়ে। ব্যাঙসমেত কুলা মাথায় নিয়ে বাড়ি বাড়ি এসে গান গাইত ‘বেঙ্গির ঝিয়ের বিয়া, আবের পাঙ্খা দিয়া, ও বেঙি মেঘ দেস্ না গিয়া’। এ ভূখণ্ডে বৃষ্টি কামনায় ছিল ভাদু, শিবের গাজন এসব উৎসব। ফরিদপুরে বৃষ্টি কামনায় প্রচলিত ছিল নৈলা গান। কিশোরীরা পথে-প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে বৃষ্টি কামনায় গাইত, “কৌটা ভরা সিঁদুর দিব, সিঁদুর মেঘার গায়/ আজকে যেন দেয়ার ডাকে মাঠ ডুবিয়া যায়।” বৃষ্টি কামনায় এসব মেয়েলি অনুষ্ঠানের গভীরে প্রাচীন কৃষিনির্ভর সমাজের ফার্টিলিটি কাল্ট বা উর্বরতাবাদে বিশ্বাসের ছাপ ছিল।
বোরো ধানকে শিলাবৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য যে শিলারিদের সাথে জোতদারদের কথা হতো তা সম্পন্ন হয়ে যেত চৈত্র মাসেই। গ্রামে গ্রামে আসত শিলারি, যারা দাবি করত মন্ত্র বলে জমির বোরো ধান শিলার আঘাত থেকে বাঁচাতে সক্ষম। তারা গুহ্যসাধনের মাধ্যমে এ কাজ করবে বলে দাবি করত। তাদের ছিল ত্রিশূল আর রকমারি সাজ-পোশাক, যাতে তর্জন-গর্জনের আধিক্য ছিল। শিলাবৃষ্টি পতনের সময় আবেগের আতিশয্যে কেউ কেউ দিগম্বর হয়ে ত্রিশূল হাতে জমিতে ছুটে যেত। তারা উপর্যুপরি মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে করত নর্তন কুর্দন। কী ছিল তাদের মন্ত্র? এরূপ প্রশ্নবিদ্ধ হলে কখনও বলত– কাছ কাছুম কাছিয়া/ ষোলো শ ডাকিনীর কান্ধে চড়িয়া/ যে আমার কাজ যুগায়/ ক্ষীর নদী-সাগরের পানি যুগায়… ইত্যাদি ইত্যাদি। তাদের ছিল হাজার কৃত্য ও আচার-অনুষ্ঠান, যে সব চর্চার মূল ক্ষেত্র ছিল বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল। মৌসুম শেষে তারা চুক্তি মোতাবেক ধান কিংবা অর্থকড়ি পেত। জমির ফসল নষ্ট হলে পেত না।
কৃষি এখন মানুষের অখণ্ড মনোযোগ হারিয়েছে। কেউ আর গতর খাটিয়ে জমি চাষ করতে চায় না, তাই বর্গা দিয়ে দেয়। তাতে প্রান্তিক চাষিরাও চাষাবাদের সুযোগ লাভ করে। যারা কিছু জমি নিজের হাতে রেখে দেয় সেসব কৃষকের সন্তানরা এখন বিভিন্ন ফার্ম, স্কুল-মাদ্রাসা ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে। সকল কৃষকই শিলারিদের বিষয়ে আগ্রহ হারিয়েছে, তাই পেশাটিও অক্কা পেয়েছে।
গ্রামের মানুষ বিশ্বাস করত বছরের পয়লা দিন ভালো খেলে সারাবছরই ভালো খাওয়া যাবে। অতি প্রাচীন এ বিশ্বাসে ভর করে এই দিনে ভালো খাওয়ার একটি প্রতিযোগিতা চলত। কিন্তু আমাদের কৈশোরের নববর্ষ শুরু হতো মা’র হাতের তিতা ভক্ষণ করে। থানকুনি পাতাসহ নানা গাছগাছড়া ও বনৌষধির পাতা ছেঁচে এর নির্যাস সহযোগে প্রস্তুত করা হতো সবুজ তিক্ত পানীয়। পাকস্থলীতে পৃথকভাবে চালান করা হতো কাঁচা হলুদ ও গুড়, চিরতা রস, উলট কম্বল ইত্যাদি। কিন্তু শহরের, এমনকি গ্রামের আধুনিক মায়ের ফুডকোর্টে এখন ফাস্টফুড ও রেস্তোরাঁ-দোকানের জাঙ্কফুড।
নববর্ষকে কেন্দ্র করে সবকিছুরই এখন বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। করপোরেট পুঁজির থাবাই এর চালিকাশক্তি। ঈদকে কেন্দ্র করে সারা চাঁদরাত জেগে বেইলি রোড এবং শহরের অন্যান্য স্থানে যেমন অজৈব মেহেদির অস্বাভাবিক বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে, তেমনি পয়লা বৈশাখে ইলিশ-পান্তা খাওয়ার জন্যও দাঁড়িয়ে থাকতে হয় দীর্ঘ লাইনে।
দুর্দৈবের রক্তচক্ষু অগ্রাহ্য করে রমনার বটমূলে মাঙ্গলিক ও আবাহনমূলক গানের অনিরুদ্ধ আসর এখনও চলমান আছে। কেবল চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে নয়, দেশব্যাপী এ দিন চলে নববর্ষের মাঙ্গলিক শোভাযাত্রা। এতে থাকে কাগজ ও কাপড়ের তৈরি নৌকা, মাছ, সাপ, পাখি, জন্তু-জানোয়ার ও রকমারি মুখোশ, অধুনা এতে যুক্ত হয়েছে পতিত স্বৈরাচারের মুখাবয়ব।
বিসিক কর্তৃক বৈশাখী মেলা প্রবর্তনের পর থেকে বাংলাদেশে মেলার সংখ্যা অতি মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামের মেলাগুলো এখনও পরিবর্তিত রূপ নিয়ে চলমান। এতে মৃৎশিল্পের বদলে স্থান করে নিয়েছে প্লাস্টিক ও রাবারের তৈরি খেলনা। কারণ হিসেবে মৃৎশিল্পীরা বলেন, তারা কষ্ট করেও উপযুক্ত মূল্য পান না, এজন্য আগ্রহে ভাটা পড়েছে। তারা আর আসল ছাঁচ ব্যবহার করে নিখুঁত খেলনা তৈরি করেন না, তাই স্বল্পমূল্যেই দ্রব্য বিক্রি করে কোনো মতে পেশাটা টিকিয়ে রেখেছেন। নিখুঁত মূর্তি ও খেলনার জন্য দাম দিতে হয় বেশি। ষাটের দশকে উচ্চবিত্তরা গ্রাম থেকে শহরে ফেরার পথে পাট, শোলা, দড়ি, নারকেলের ছোবড়া ইত্যাদি প্রকাশ্যে বহন করে নিয়ে আসতে লজ্জা পেতেন। কিন্তু ক্রমে সাবঅলটার্ন সংস্কৃতির প্রতি দুর্বলতা ও উত্তরাধুনিকতার প্রভাবে সেইসব মনোবৃত্তিতে চির ধরেছে। উচ্চবিত্তরা এখন শখ করে হলেও মেলা থেকে ক্রয় করেন পাটের শিকা, বামুন সাইজের পলো, মৎস্য শিকারের অন্যান্য সরঞ্জাম, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি। এসব দিয়ে তারা ড্রয়িংরুম সুসজ্জিত করেন। তৎসত্ত্বেও গ্রামের কারিগরদের দুঃখ সহজে ঘোচে না।
করপোরেট পুঁজির প্রভাবের কথা বলা হয়েছে, যার সর্বশেষ থাবাটি পড়েছিল অষ্টগ্রাম-মিঠামইনের অলওয়েদার রাস্তার ১৪ কিলোমিটরে। ২০২৪-এর পহেলা বৈশাখে পেইন্টিং কোম্পানির বদান্যতায় আলপনার রঙে রঙিন হয়েছিল এ রাস্তাটি। বাণিজ্যিকীকরণের চরম পরাকাষ্ঠা লক্ষ্য করা গেল যখন উদ্যোক্তারা দাবি করলেন, এটি ছিল বিশ্বের দীর্ঘতম আলপনা অঙ্কন। অষ্টগ্রাম-ইটনার প্রায় ৩০ কিলোমিটার রাস্তাটি নির্মাণের ফলে মাছের গতিপথ বন্ধ হওয়ায় পরিবেশবাদীরা ফুঁসে উঠেছিল, সেখানে এ জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনটি ছিল কাটা ঘায়ে লেবুর ছিটা।
বৈশাখের সংস্কৃতিতে এই যে এত পরিবর্তন-পরিবর্ধন, তা সমাজ বিকাশের এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আগে যেখানে বৈশাখ মানে ছিল হালখাতা, নয়া কৃষিকর্মের সূচনা– এখন নগরায়ণ ও প্রযুক্তি বিকাশের ফলে তা রূপ নিয়েছে কনসার্ট, শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। অন্যদিকে বিশ্বায়নের ফলে পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক, খাবার ও বিনোদন বৈশাখের উদযাপনেও ঢুকে পড়েছে। ফলে ঐতিহ্য কিছুটা গুরুত্ব হারিয়েছে। শিক্ষা বিস্তারের দরুন সংস্কৃতি সম্পর্কে শুরু হয়েছে নতুন ভাবনা, নতুন প্রজন্ম ঝুঁকছে আধুনিকতার দিকে। ঐতিহ্যের ব্যাপক ক্ষতি না করে এসব পরিবর্তনকে আমাদের স্বাভাবিকভাবেই মেনে নেওয়া কর্তব্য জ্ঞান করি।