লোকসংগীত ও বাউলগান বৈশাখের আনন্দকে গভীরতা দেয়। শুধু বাহ্যিক উৎসব নয়, এই গানগুলো মানুষের অন্তরের অনুভূতিকে জাগ্রত করে। বাউলগান মানুষকে আত্ম-অন্বেষণ, প্রেম ও মানবতার পথে আহ্বান জানায়, যা নতুন বছরের সূচনায় এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। লোকসংগীত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির রচনা নয়।
কুষ্টিয়ার লালন সাঁই (১৭৭২-১৮৯০); সুনামগঞ্জের রাধারমণ দত্ত পুরকায়স্থ (১৮৩৩-১৯১৫), হাসন রাজা (১৮৫৪-১৯২২) ও শাহ আবদুল করিম (১৯১৬-২০০৯); বাগেরহাটের অশ্বিনী গোঁসাই (১৮৭৭-১৯২৬); নড়াইলের বিজয় সরকার (১৯০৩-১৯৮৫), ফরিদপুরের জসীমউদ্দীন (১৯০৩-১৯৭৬), মাদারীপুরের আবদুল হালিম বয়াতি (১৯২৯-২০০৭), তুষ্টচরণ বাগচী (১৯৪৫-২০০৯) প্রমুখ মহাজনের গান কি লোকসংগীত? মোটেই তা নয়। এসব গানকে আমরা লালনের গান কিংবা হাসনের গানই বলব। এঁদের লেখা গানের রচয়িতা তো সুনির্দিষ্ট। তাই এই গানের পরিচয় হবে রচয়িতার নামে। কখনো মূল রচয়িতার নাম জানা না গেলে সংগ্রাহকের নাম কিংবা প্রথম গায়কের নামও উচ্চারণ করা উচিত কৃতজ্ঞতার নিদর্শন হিসেবে।
লোকসংগীতের সুর, বাণী ও ভাব বহু প্রজন্ম ধরে পরিবর্তিত হয়ে নির্দিষ্ট আকার পেতে পারে। কোনো একক শিল্পী বা কবি এর পূর্ণ কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন না। যাঁরা এই গান সংগ্রহ, সংরক্ষণ বা পরিবেশন করেন, তাঁদের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা লোকসংগীতকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেন।
বর্তমান সময়ে লোকসংগীতের স্বত্ব নিয়ে কিছু আইনি প্রশ্নও দেখা যায়। কেউ যদি লোকগানের সুর বা কথা ব্যবহার করে নতুনভাবে উপস্থাপন করেন, তবে সেই নির্দিষ্ট সংস্করণের ওপর তাঁর কিছু স্বত্ব থাকতে পারে। কিন্তু মূল গানটি থেকে যায় সবার। গানের প্রথম মালিক গীতিকার বা রচয়িতা। দ্বিতীয় মালিক সুরকার। প্রথম গায়ক হিসেবে শিল্পীর নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। কিন্তু শিল্পী কখনো মালিক নন। রবীন্দ্রনাথের গানের রচয়িতা, সুরস্রষ্টা এবং প্রথম শিল্পীর নামও রবীন্দ্রনাথ। এখন প্রজন্ম পরম্পরায় এই গানে যে কেউ গাইতে পারেন। কিন্তু তিনি মালিক হতে পারেন না, মালিক স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। আব্বাসউদদীন আহমদ কিংবা আবদুল আলীম অনেক লোকসংগীত পরিবেশন করেছেন। কিন্তু সেসব গানের প্রথম মালিক সেই জানা কিংবা অজানা রচয়িতা। তাঁদের গাওয়া গান এখন গাইতে গেলে তাঁদের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। যেহেতু তাঁরা গানগুলোকে লালন করেছেন, শ্রোতার কাছে পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছেন, তাই প্রথম শিল্পী হিসেবে তাঁদের নাম উল্লেখ করা উচিত। কিন্তু ‘আব্বাসউদ্দীনের গান’ বা ‘আবদুল আলীমের গান’ বলে তাঁদের মালিক মর্যাদায় উন্নীত করতে গিয়ে ভুল বার্তা প্রেরণ করা হচ্ছে।
লোকসংগীতের স্বত্ব নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয় যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্যগত, সামষ্টিক সৃষ্টিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দাবি করতে চায়। এই জটিলতা দূর করতে কিছু কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, লোকসংগীতকে ‘সম্মিলিত সামাজিক সম্পদ’ স্বীকৃতি দিতে হবে। অর্থাৎ এটি একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়, সমাজের সম্মিলিত সম্পদ। এই স্বীকৃতি আইনি কাঠামোর মধ্যেও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, একটি জাতীয় আর্কাইভ বা ডেটা বেইস তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগান সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নথিভুক্ত থাকবে। এতে গানগুলোর উৎস, পরিবেশনা ও বিবর্তনের তথ্য সংরক্ষিত হবে এবং মালিকানা নিয়ে বিভ্রান্তি কমবে। তৃতীয়ত, যাঁরা লোকসংগীত সংগ্রহ, গবেষণা বা পরিবেশন করেন, তাঁদের অবদান যথাযথভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। এই স্বীকৃতি যেন মালিকানা দাবি হিসেবে পরিণত না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, কপিরাইট আইনে লোকসংগীতের জন্য বিশেষ বিধান থাকা প্রয়োজন। কেউ যদি লোকগানকে নতুনভাবে সুরারোপ বা পরিবেশন করেন, তবে সেই নির্দিষ্ট সংস্করণের ওপর তাঁর স্বত্ব থাকতে পারে, কিন্তু মূল গানটি থাকবে সবার জন্য উন্মুক্ত।
বৈশাখী মেলার মঞ্চে আমরা এক লোককবির গান যখন অন্য লোককবির নামে প্রচারিত হতে দেখি। সেই ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি ‘গুরু উপায় বলো না/জনম-দুঃখী কপালপোড়া গুরু আমি একজনা’। গাইতেন মামার বাড়ির গ্রামে একজন অন্ধ শিল্পী। গান গেয়ে তিনি বাড়ি বাড়ি ঘুরতেন। সবাই ভালোবেসে চাল-ডাল দিতেন। কেউ ঘরের দাওয়াও বসিয়ে গান শুনে পেটভরে খাইয়ে দিতেন। বড় হয়েও গানটি শুনেছি। বিশেষত সিনেমার গানে এটি বেশ জনপ্রিয় হয় মলয় কুমার গাঙ্গুলীর কণ্ঠে। কামাল আহমেদের ‘পুত্রবধূ’ (১৯৮১) সিনেমায় গানটি ব্যবহৃত হয়েছে মলয়কুমার গাঙ্গুলীর কণ্ঠে। ইউটিউবে কেউ গানটি আপলোড করে গীতিকারের নাম লিখেছেন মাসুদ করিম। ওই চলচ্চিত্রে হয়তো মাসুদ করিম গান লিখতে পারেন। ১৯৭৫-৭৬ সালে এই গান আমি স্বকর্ণে শুনেছি। তখন নিশ্চয়ই এই চলচ্চিত্রের নামই প্রস্তাবিত হয়নি। তাই মাসুদ করিম এই গানের গীতিকার নন। খালিদ হাসান মিলু এই গানের গীতিকারের নাম লিখেছেন জসীমউদ্দীন। গবেষক সুমন কুমার দাশ তাঁর ‘লোকায়ত জীবন ও লোকসাহিত্য’ গ্রন্থে একে দীন শরৎ (১৯০৩-১৯৬৩) এর গান বলে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি খ্যাতিমান শিল্পী আশিক একে রাধারমণের গান হিসেবে বিভিন্ন চ্যানেলে ও মঞ্চে পরিবেশন করছেন। এমনকি তিনি রাধারমণের ভণিতায় আভোগও যুক্ত করেছেন। এটি মোটেও সমর্থযোগ্য নয়। রাধারমণকে ছোট করার অপপ্রয়াস। বাউলগানের বিশিষ্ট শিল্পী আলম দেওয়ান বলেছেন, এটি অখিলবন্ধু ঠাকুরের লেখা। সজলকান্তি সরকারের ‘দীন শরৎ ও তাঁর গান মানবমঙ্গল’ গ্রন্থে এই গান নেই। তিনি জানিয়েছেন যে এটি দীন শরৎ-এর গান নয়। আমার ধারণা, এটি প্রভাত বাউলেরও (১৯১৮-১৯৭১) হতে পারে। অনেক গবেষক দীন শরেক ‘অন্ধ গায়ক’ বলা হলেও তিনি অন্ধ ছিলেন না। তিনি চক্ষুষ্মাণ ছিলেন বলে জানা গেছে সজলকান্তি সরকারের গবেষণায় দীন শরৎ-এর প্রয়াণের ১২ বছর আগে ১৯৫১ সালের ২৩ জানুয়ারি আকাশবাণী কলকাতায় ‘পল্লিমায়া’ অনুষ্ঠানে এই গান গেয়েছেন মনোমোহন রায়। আবার দেখা যাচ্ছে এই গান সংগ্রহ করেছেন কবি জসীমউদ্দীন ১৯৫৪ সালে। ফরিদপুরের হরিরামপুর গ্রামে গায়ক মোতালেব মোল্লা, বয়স ২০। শুনেছেন শেখ ইব্রাহিমের কাছ থেকে। জসীমউদ্দীন ও দীন শরৎ সমবয়সী। এই গান দীন শরৎ-এর হলে জসীমউদ্দীনের জানার কথা। তাহলে ১৯৭৫ সালে আমি শুনেছি, ১৯৫১ সালে এটি বেতারে গাওয়া হয়েছে আর জসীমউদ্দীন এটি সংগ্রহ করেছেন তাঁর বাড়ির পাশ থেকে। এখন এটি বিভিন্ন মহাজনের নামে প্রচারিত হচ্ছে। এটিই প্রকৃত লোকসংগীতের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে আছে। বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন সময়ের ভিন্ন পাঠ এর লোকগ্রাহ্যতা প্রমাণ করে। সংগ্রাহক হিসেবে জসীমউদ্দীনই এর মুদ্রিত রূপ দেন।
লোকসংগীত মুখে মুখে প্রচলিত হওয়ায় অনেক সময় প্রকৃত রচয়িতার নাম হারিয়ে যায় বা ভুলভাবে অন্যের নামে প্রচারিত হয়। এই প্রবণতা রোধ করা খুবই জরুরি কাজ। তার জন্য জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষকে বুঝতে হবে যে লোকসংগীত আমাদের সম্মিলিত ঐতিহ্য, এটি কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সঠিক নীতি, সংরক্ষণ ও সচেতনতার মাধ্যমে এই বিতর্ক সহজেই নিরসন করা সম্ভব।
বৈশাখের মেলায় বাউলগান শুধু বিনোদনের উপাদান নয়, এটি মানুষের মনন, সংস্কৃতি ও জীবনবোধে গভীর প্রভাব ফেলে। গ্রামবাংলার উন্মুক্ত পরিবেশে যখন বাউলরা একতারা হাতে গান শুরু করেন, তখন সেই সুর মানুষের হৃদয়ে সরাসরি পৌঁছে যায়। বাউলগান মানুষের আত্মিক জাগরণে ভূমিকা রাখে। বাউল দর্শনের মূলকথা হলো মানুষ ও মানবতার সন্ধান। তাদের গানে দেহতত্ত্ব, প্রেম ও আধ্যাত্মিকতার কথা থাকে, যা শ্রোতাকে নিজের ভেতরের সত্য খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করে। বোশেখের মেলা এটি সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে। মেলায় নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ একত্র হয়ে বাউলগান শোনে। এতে ভেদাভেদ কমে, সৃষ্টি হয় এক ধরনের সাম্য ও মিলনের অনুভূতি। বৈশাখী মেলার মতো বৃহৎ আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম এই গানগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয় এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। বৈশাখের মেলায় বাউলগান মানুষের আত্মা, সমাজ ও সংস্কৃতিকে একসূত্রে গেঁথে এক অনন্য প্রভাব সৃষ্টি করে, যা বাঙালির ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ।