বাসন্তিক সন্ধ্যার নিবিড় আবহে স্মরণ করা হলো প্রজ্ঞা, সাধনা ও মানবিকতার অনন্য প্রতীক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সংগীতজ্ঞ সন্জীদা খাতুনকে। শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ধানমন্ডির ছায়ানট মিলনায়তনে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। তাঁর প্রয়াণ-পরবর্তী দ্বিতীয় জন্মবার্ষিকীকে ঘিরে এই আয়োজন হয়ে উঠেছিল স্মৃতি, চেতনা ও সংস্কৃতির এক সম্মিলিত উচ্চারণ।
অনুষ্ঠানের সূচনা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার বনে বনে’ গানের সঙ্গে সম্মেলক নৃত্যগীত পরিবেশনের মাধ্যমে। প্রকৃতি ও সুরের মেলবন্ধনে শুরুতেই তৈরি হয় এক অনুরণিত আবহ; যা পুরো আয়োজনকে বয়ে নিয়ে যায় গভীর তাৎপর্যের দিকে।
এরপর কথন উপস্থাপন করেন ছায়ানটের সভাপতি ডা. সারওয়ার আলী। তিনি স্মরণ করেন সন্জীদা খাতুনের দীর্ঘ সাধনার জীবনকে। একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে নিরলস কাজ করে যাওয়া এক কর্মবীরের জীবন। তাঁর ভাষায়, এই মানুষটি সারাজীবন সংগীতকে আশ্রয় করে একটি উদার, মানবিক সমাজ নির্মাণের প্রয়াস চালিয়েছেন।
কথনে উঠে আসে এক শতাব্দী আগের প্রেক্ষাপটও। ১৯২৬ সালে প্রতিষ্ঠিত শিখা গোষ্ঠীর প্রগতিশীল চেতনা– ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’ এই বোধ থেকেই গড়ে উঠেছিল সন্জীদা খাতুনের মানসজগৎ। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ কাজী মোতাহার হোসেনের কন্যা; সেই উত্তরাধিকারকে ধারণ করেই আজীবন লালন করেছেন মুক্তবুদ্ধির চর্চা।
উপমহাদেশে ধর্মীয় পরিচয় ও জাতিসত্তার দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে সারওয়ার আলী বলেন, সন্জীদা খাতুন ও তাঁর সহযাত্রীরা সংগীতকে হাতিয়ার করে এই বিভাজন দূর করার প্রয়াস নিয়েছিলেন। লালন শাহ থেকে কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ থেকে শাহ আবদুল করিম–সবাই যে উদার, মানবিক সমাজের কথা বলেছেন, সেই ধারাকেই এগিয়ে নিয়েছেন তিনি।
শিক্ষা ও গবেষণায়ও সন্জীদা খাতুনের ছিল গভীর মনোনিবেশ। রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন একজন স্বীকৃত গবেষক। তিনি গড়ে তুলেছিলেন ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তন; যা আজ উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ সংগীত শিক্ষাকেন্দ্র।
সংস্কৃতিকে প্রান্তে প্রান্তে পৌঁছে দিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ। একই সঙ্গে পহেলা বৈশাখ-এ রমনা বটমূলে ছায়ানটের আয়োজনকে সন্জীদা খাতুন রূপ দেন এক অসাম্প্রদায়িক জাতীয় উৎসবে। ২০০১ সালের বোমা হামলার পর শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে প্রতিষ্ঠা করেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নালন্দা।
কথনের পর পরিবেশিত হয় সম্মেলক গান। এরপর একক সংগীত পরিবেশন করেন ইফফাত আরা দেওয়ান। পরবর্তী পর্বে রবীন্দ্রনাথের ‘সুন্দর’ নাট্যগীত পরিবেশিত হয়। সবশেষে জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে এই আয়োজন।