সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১৪ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

ভাইরাস জ্বর যেভাবে বুঝবেন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ, ২০২৬
  • ৪৩ বার পড়া হয়েছে

ঋতু পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে আমাদের চারপাশের প্রায় প্রতিটি ঘরেই কেউ না কেউ জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। একে আমরা সাধারণত ভাইরাল জ্বর বা সিজনাল ফ্লু বলে থাকি। আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় যখন বাতাসে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার তারতম্য ঘটে, তখন বিভিন্ন ধরনের ভাইরাস অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিশেষ করে ইনফ্লুয়েঞ্জা, অ্যাডিনোভাইরাস এবং রাইনোভাইরাসের প্রকোপ এই সময়ে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। এটি কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, বরং খুব দ্রুত পুরো পরিবারকে আক্রান্ত করতে পারে। বর্তমান সময়ে এই জ্বরের প্রকোপ এতটাই বেড়েছে যে একে সামাজিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভাইরাস যেভাবে সংক্রমিত হতে পারে
ভাইরাল জ্বর হওয়ার প্রধান কারণ হলো বাতাসের মাধ্যমে ভাইরাসের সংক্রমণ। যখন একজন আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি বা কাশি দেন, তখন ক্ষুদ্র কণার মাধ্যমে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত জিনিসপত্র স্পর্শ করার মাধ্যমেও সুস্থ মানুষ সংক্রমিত হতে পারে।

ভাইরাস রোগের সাধারণ লক্ষণ
ভাইরাল জ্বরের লক্ষণগুলো একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম হতে পারে। তবে কিছু সাধারণ লক্ষণ প্রায় সবার মধ্যেই দেখা যায়। এই লক্ষণগুলো সাধারণত ভাইরাস শরীরে প্রবেশের এক থেকে তিন দিনের

মধ্যে প্রকাশ পায়।
l    হঠাৎ করে তীব্র জ্বর আসা, যা ১০০ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে।
l    সারা শরীরে বিশেষ করে মাংসপেশি এবং জয়েন্টে তীব্র ব্যথা অনুভব করা।
l    অসহ্য মাথাব্যথা এবং চোখের পেছনে ব্যথার অনুভূতি।
l    গলাব্যথা, শুকনো কাশি বা নাক দিয়ে পানি পড়া।
l    চরম ক্লান্তি এবং শরীর ম্যাজম্যাজ করা।
l    অনেক ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব, পেটে অস্বস্তি বা ডায়েরিয়ার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।

শরীরের পরিচর্যা ও জ্বর উপশমের চিকিৎসা
কোনো কোনো ভাইরাল জ্বরের নির্দিষ্ট কিছু এন্টিভাইরাল ওষুধ থাকলেও আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত ভাইরাল জ্বর তথা সিজনাল ফ্লু রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। এক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক কোনো কাজেই আসে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই জ্বর ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে সেরে যায়। তবে এই সময়ে কিছু নিয়ম মেনে চলা জরুরি; যা রোগীকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করবে।
প্রথমত, পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল খাবার গ্রহণ করতে হবে। জ্বরের কারণে শরীর থেকে প্রচুর পানি বেরিয়ে যায়, যা ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা তৈরি করতে পারে। তাই ডাবের পানি, লেবুর সরবত,  ফলের রস, সুপ এবং সাধারণ পানি বারবার পান করা উচিত।
শরীরের তাপমাত্রা খুব বেশি হলে সাধারণ তাপমাত্রার পানি দিয়ে সমগ্র শরীর বিশেষ করে বোগলের নিচে এবং কুচকি পরিবেষ্টিত জায়গা বারবার মুছতে হবে এবং জলপট্টি স্বস্তি দিলেও মূলত সারা শরীর মুছে দেওয়া জ্বর কমাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। জ্বর বা গা ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ সেবন করা যেতে পারে। তবে সতর্ক থাকতে হবে যে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনোভাবেই এসপিরিন, ডাইক্লোফেনাক সোডিয়াম, আইব্রুফেন বা এনএসএআইডি  ধরনের কোনো ওষুধ সেবন করা উচিত নয়, এসব ওষুধ উল্টো বিপদ ডেকে আনতে পারে।

জ্বরে পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাস
অসুস্থ অবস্থায় মুখে অরুচি হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু সুস্থ হওয়ার জন্য পুষ্টিকর খাবারের কোনো বিকল্প নেই। এই সময়ে সহজ পাচ্য খাবার যেমন যে কোনো ভালো চালের জাউ ভাত বা গুলপ্তি, ডাল, সবজি বা চিকেন স্যুপ এবং নরম খিচুড়ি খাওয়া উচিত। জ্বরের রোগীকে সহজপাচ্য হলেও সারাদিন বারলি জাউভাতের ওপর রাখা যাবে না। প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন মাছ, মুরগি অথবা ডিম খাবারের তালিকায় রাখতে হবে।
ভিটামিন সি-সমৃদ্ধ ফল যেমন লেবু ও আনারস রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। আদা চা বা তুলসি ও বাসক পাতার রস কাশির প্রকোপ কমাতে এবং গলার অস্বস্তিভাব দূর করতে সাহায্য করে। নাক বন্ধ থাকলে বারবার ০.৯% সোডিয়াম ক্লোরাইড দ্রবণ নাকে ব্যবহার করতে হবে। অতিরিক্ত ঠান্ডা সর্দি থাকলে এন্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ ক্লোরফেনাইরামিন হাইড্রোক্লোরাইড, ফেক্সোফেনাডিন এবং ফেমোটিডিন গ্রুপের ওষুধ একই সঙ্গে দিনে এক বা দুবার সেবন করা যেতে পারে। শ্বাসকষ্ট ভাব থাকলে ৩% সোডিয়াম ক্লোরাইড সহকারে নেবুলাইজ করলে শ্বাসকষ্টজনিত কাশি থেকে বেশ খানিকটা রেহাই পাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত গুরুপাক খাবার এবং বিশেষত খোলাবাজারের খাবার এই সময়ে পুরোপুরি এড়িয়ে চলা উচিত।
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে–
l    তিন দিনের বেশি সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা থাকা এবং জ্বর প্রতিরোধক প্যারাসিটামল ব্যবহারের পরও কোনোভাবেই জ্বর না কমা।
l    তীব্র শ্বাসকষ্ট হওয়া বা বুকের ভেতরে শব্দ হওয়া।
l    অনবরত বমি হওয়া বা প্রচণ্ড পেটে ব্যথা।
l    রোগী খুব বেশি দুর্বল হয়ে পড়া বা অসংলগ্ন কথা বলা।
l    শরীরে খিচুনি দেখা দেওয়া
l    প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়া।

প্রতিরোধেই মুক্তি
ভাইরাস প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। গুটিকতক ভাইরাস ছাড়া অধিকাংশ ভাইরাসের ওষুধ বা প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। ভাইরাস মূলত সংক্রমিত আকারে বা রোগীর সংস্পর্শে যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের শরীরে প্রবেশ করে থাকে। এজন্য ভাইরাল জ্বর থেকে রক্ষা পেতে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা সবচেয়ে জরুরি। দূরত্ব বজায় রাখা, ঘরে ফিরে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধোয়া, জনাকীর্ণ স্থানে মাস্ক ব্যবহার করা এবং হাঁচি-কাশির সময় রুমাল বা টিস্যু ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ঘরের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের উপযোগী রাখা উচিত। পরিবারের কেউ আক্রান্ত হলে তাকে আলাদা রাখা এবং তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র অন্যদের ব্যবহার না করতে দেওয়া সংক্রমণ বিস্তার রোধে বড় ভূমিকা রাখে। ভাইরাল জ্বরের কারণ বিভিন্ন ধরনের জানা অজানা ভাইরাস হলেও প্রধানত আবহাওয়া পরিবর্তনজনিত ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস সিজনাল ফ্লুকে রোগ সংক্রমণের প্রধান কারণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়ে থাকে। এজন্য প্রতি বছর ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাক্সিন বিশেষ করে বয়স্কদের নেওয়া উচিত। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসজনিত ভ্যাক্সিন, ভাইরাসজনিত জটিলতা এবং ভাইরাস সংক্রমণের হাত থেকে বয়স্কদের অনেক ক্ষেত্রে রক্ষা করে থাকে।
ভাইরাল জ্বর নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তাই বলে অবহেলা করা যাবে না। সঠিক বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানিসহ তরল পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ এবং রোগ সচেতনতা অবলম্বন করলে খুব দ্রুতই ভাইরাসজনিত রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

[অধ্যাপক  ও বিভাগীয় প্রধান, শিশু হৃদরোগ বিভাগ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা ]

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com