গ্রামের আকাশে শীতের রাতগুলো নেমে এলে চারপাশ যেন তুলোর চাদরে ঢাকা পড়ে যেত। ঘন কুয়াশায় গাছের পাতাও স্পষ্ট দেখা যেত না। এ দূরের রাস্তা হারিয়ে যেত সাদা অন্ধকারে। বাতাসে এক ধরনের কাঁপুনি, ঠান্ডা হাওয়া কানে কানে যেন বলে- ঘুমাও তুমি ঘুমাও…কিন্তু ছোট্ট রাফি ঘুমাত না। তার পড়ার টেবিলের ওপর জ্বলে থাকত একটি মোমবাতি; কাঁপতে থাকা এক আলোর রেখা, যা অন্ধকারকে ভয় পেত না।
শীতের রাতে যখন গ্রামের সবাই কম্বলের ভেতর ঢুকে পড়ত, তখন রাফি বলত, আজও জ্বলবে তো, শীতল আলো? আর মোমবাতির শিখাটা একটু দুলে উঠত, যেন সে বোঝাতে চাইত, আমি আছি… যতক্ষণ তোমার স্বপ্ন আছে।
সেই আলোতেই রাফি অক্ষর চিনেছে, শব্দ পড়েছে, স্বপ্ন সাজিয়েছে। কাগজে পড়েছে বাংলা, অঙ্ক, ইংরেজি, আরবি। একদিন গভীর রাত, কুয়াশা এত ঘন যে জানালাও দেখা যায় না। হঠাৎ দূরে ভেসে এলো, আল্লাহু আকবর…আল্লাহু আকবর…ফজরের আজান।
চারদিকে যেন বরফের মতো ঠান্ডা। হাত-পা জমে যাওয়ার উপক্রম। মা বললেন, আজ খুব ঠান্ডা বাবা, থাক না হয়, নামাজ পরে পড়বে। কিন্তু রাফি বলল, না মা, আমি যাব। মোমবাতির আলো আমাকে পথ দেখাবে। সে মোমবাতি হাতে নিয়ে উঠান পেরিয়ে এগোল। কুয়াশার ভেতর তার নিজেকেও দেখা যাচ্ছিল না, তবু সেই ছোট আলো সামনে একটা পথ বানিয়ে দিচ্ছিল।
মসজিদের কাঁচা রাস্তা, ভেজা ঘাস, শিশিরের টুপটাপ শব্দ…মোমবাতির আলো হাতে নিয়ে সে যেন অন্ধকারের বুকে এক টুকরো ভরসা নিয়ে যাচ্ছিল। মসজিদে পৌঁছে সে দেখল, আরও দুয়েকজন শিশু দাঁড়িয়ে, তাদের হাতেও ছোট ছোট আলো। সবার চোখে ঘুম, কিন্তু মনে জাগ্রত এক অদ্ভুত শান্তি। নামাজ শেষে রাফি ভালোবেসে মোমবাতিকে বলল, তুমি না থাকলে পথ খুঁজে পেতাম না।
শিখাটা আবার দুলে উঠল। ঠিক তখনই টেবিলের ওপর আগের মতো আলো দিয়ে তৈরি হলো। সে হেসে বলল, তুমি শুধু পথ খুঁজো না রাফি…তুমি নিজেই পথ হয়ে ওঠো।
তারপর এলো রমজান মাস। সারা গ্রাম এখনও ঘুমিয়ে, চারপাশে নিস্তব্ধতা, ঠান্ডা বাতাস আর কুয়াশার চাদর। রাত সাড়ে ৩টা। দূরে কুকুরের হালকা ডাকে চমকে উঠল রাফি। মা ধীরে বললেন, বাবা, ওঠো, সেহরির সময় হয়েছে। ঘরে তখন কোনো আলো নেই, শুধু সেই মোমবাতি। ঝিক ঝিক…আলোকিত আগুন…আর পাশে বসে গেল শীতল আলো। মোমবাতির আলোয় দেখা গেল, ভাতের গরম ভাপ, ডিম ভাজা, আর এক গ্লাস পানি…রাফির মনে হলো, এই ছোট আলো শুধু ঘর নয়, পুরো রমজানকে জ্বালিয়ে রাখছে। খাওয়া শেষে সে বলল, আজ আমি রোজা রাখব।
মা অবাক হয়ে বললেন, তুই তো শিশু বাবা। রাফি হেসে বলল, কিন্তু আমার পাশে আছে শীতল আলো…আমি পারব।
সেই দিন সারা দিন সে রোজা রাখল। ক্ষুধা লাগলে তাকাত মোমবাতির দিকে, আর মনে হতো সে একা না। মাগরিবের আজানের আগে সুপ্রভাত এসে বলল, আজ তুমি শুধু রোজা রেখেছ…তুমি নিজের ভেতর একটা আলো জ্বালিয়েছ।
সন্ধ্যায় সেই আলোর কাছে বসেই রাফি দোয়া করল, হে আল্লাহ, আমার জীবনটাও যেন একটি মোমবাতির মতো হয়, অন্ধকারে অন্যের জন্য আলো দিয়ে যায়। বছর গড়িয়ে গেল, বিদ্যুৎ এলো, বড় বাতি এলো, আধুনিক আলো এলো…কিন্তু রাফির টেবিলে আজও একটি মোমবাতি থাকে।
শীতের রাতে যখন কুয়াশা নামে, সে সেটি আবার জ্বালায়। ফজরের আজানে তাকিয়ে থাকে। রমজানে সেহরিতে পাশে রাখে। আর মনে মনে বলে, তুমি আমার শৈশব, তুমি আমার ইমান, তুমি আমার স্মৃতি।
সেই মোমবাতি একদিন নিভে গেল…কিন্তু তার আলো রয়ে গেল রাফির হৃদয়ে। আর টেবিলের ওপর লেখা ফুটে উঠল শেষবার, মোমবাতি নিভে যেতে পারে; কিন্তু তার আলো যাকে স্পর্শ করে, সে কখনো অন্ধকারে থাকে না।