সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:১৭ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

পাহাড়, রেলপথ আর মুগ্ধতা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ২৮ বার পড়া হয়েছে

আমরা যারা গল্প, কবিতা আর উপন্যাস পড়ে বড় হয়েছি, আমাদের কল্পনায় কোথাও না কোথাও একটি পাহাড়ি রেলস্টেশনের ছবি আঁকা থাকে। হিমেল বাতাস, ঝকঝক শব্দে চলা ট্রেন আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ–এই দৃশ্য যেন বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তবেই দেখতে চাই। শ্রীলঙ্কার এল্লা-ক্যান্ডি রেলপথ ঠিক তেমনই এক স্বপ্নের যাত্রা, যাকে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর ট্রেনযাত্রার একটি বলা হয়।
এই যাত্রার শুরুটা করেছিলাম এল্লার বিখ্যাত নাইন আর্চ ব্রিজ থেকে। শ্রীলঙ্কার বাদুল্লা জেলার এল্লা ও ডামুডরা শহরকে যুক্ত করা এ সেতুটি তার অপূর্ব দৃশ্যপটের জন্যই বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে নির্মিত এই সেতুটির কাজ শেষ হয় ১৯২১ সালে। ব্রিজটি দাঁড়িয়ে আছে ৯টি পাথরের খিলানের ওপর। দৈর্ঘ্যে প্রায় ৯০ মিটার এবং উচ্চতায় ৮০ ফুট এ সেতুতে ব্যবহার করা হয়নি কোনো রড বা লোহা। সম্পূর্ণ ইট, পাথর ও সিমেন্টের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এটি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় লোহার সংকট দেখা দিলে, বিকল্প পরিকল্পনা হিসেবেই এমন নির্মাণ করা হয় বলে জানা যায়। এ জন্যই এটি ‘দ্য ব্রিজ ইন দ্য স্কাই’ নামেও পরিচিত। আজও পাহাড় আর চা বাগানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই ব্রিজ ব্রিটিশ প্রকৌশলবিদ্যা ও স্থানীয় কারিগরদের দক্ষতার অনন্য নিদর্শন।
২০২২ সালের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার পর শ্রীলঙ্কা পর্যটন খাতকে নতুন করে গুরুত্ব দিয়েছে, যার প্রভাব স্পষ্ট। দেশটি খুবই পর্যটকবান্ধব। সিংহলি ভাষাভাষী মানুষজন ইংরেজিতেও স্বচ্ছন্দ। তাই যোগাযোগে খুব একটা সমস্যা হয় না।

সপ্তাহব্যাপী শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের শেষে সমুদ্র ছেড়ে পাহাড়ি শহর এল্লায় গেলাম। সাধারণত মানুষ ক্লকওয়াইজ রুটে সিগিরিয়া-ক্যান্ডি হয়ে ভ্রমণ শুরু করে। ফলে সেই পথে ট্রেনের টিকিট পাওয়া একটু কঠিন হয়। আমি নিয়েছিলাম অ্যান্টি-ক্লকওয়াইজ রুট–কলম্বো থেকে গল, মিরিশ্যা হয়ে পাহাড়ে ওঠা। তবে মিরিশ্যা থেকে এল্লার সরাসরি বাস নেই। আগে যেতে হয় মাতারা বাসস্টেশনে, সেখান থেকে এসি, নন-এসি কিংবা লোকাল বাস পাওয়া যায়। বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য লোকাল বাস মোটেও খারাপ নয়। জানালার পাশে বসে সমুদ্র ছেড়ে ধীরে ধীরে পাহাড়ে ওঠার দৃশ্য অসাধারণ। বাস থেকে নেমে টুকটুকেই পৌঁছে যাওয়া যায় হোটেলে। পাহাড়ে এসে বোঝা যায়, শ্রীলঙ্কায় ভ্রমণে হালকা শীতের কাপড় রাখা কতটা দরকারি।
এল্লায় পৌঁছে শরীরে লাগল ঠান্ডা হাওয়া। কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে বের হলাম ট্রেনের টিকিট কাটতে। পরের দিনের এল্লা থেকে ক্যান্ডির ফার্স্ট ক্লাস এসি টিকিট পেয়ে গেলাম–দাম ৩ হাজার ৫০০ শ্রীলঙ্কান রুপি। সেই সন্ধ্যায় এল্লা স্টেশনে বসে ট্রেনের শব্দ শোনার অভিজ্ঞতাই আলাদা ছিল। শ্রীলঙ্কার ট্রেন স্টেশনের একটা বিষয় দেখলাম, ডামুডরার মতো ছোট্ট একটা স্টেশনেও আছে ছোট একটা বুক সেলফ। সিংহলি এবং ইংরেজি দুই ভাষার বই-ই রাখা তাতে। মানে আপনার ট্রেন আসতে দেরি করলেও আপনি দিব্যি একটা বই পড়ে কাটিয়ে দিতে পারেন; যদিও শ্রীলঙ্কান ট্রেন সচরাচর অত লম্বা সময়ের জন্য বিলম্ব হয় না। ছোট্ট এই পাহাড়ি শহর অদ্ভুত মুগ্ধতা নিয়ে ঘুরে ফিরে আমি এলাম রুমে–প্রচণ্ড ঠান্ডা!

পরদিন ভোরে চলে গেলাম নাইন আর্চ ব্রিজ দেখতে। সকাল ৭টায় পর্যটকের ভিড়। চাইলেই হেঁটেই ব্রিজের কাছে যেতে পারেন আপনি। শহরের একদম কোলঘেঁষেই এই ব্রিজ। পর্যটকরা মূলত তাই করেন। ঘন জঙ্গল, পাহাড় পেরোলেই দেখবেন মাথা উঁচিয়ে উঁকি দিচ্ছে ‘নাইন আর্চ ব্রিজ’। বেশ কিছুক্ষণ ব্রিজে বসে ফিরে এলাম রুমে। যাব ট্রেন ধরতে। এল্লা স্টেশন থেকেও আপনি ট্রেনে উঠতে পারেন। কিন্তু আমি তো ব্রিজের ওপরেও ট্রেন দিয়ে পেরুতে চাই। তাই যেই ভাবা সেই কাজ। চলে গেলাম এল্লার আগের স্টেশন ডামুডরায়, ছোট্ট পুরোনো পাহাড়ি স্টেশন। ওই যে বলছিলাম গল্পের মতো! নস্টালজিয়ায় ভর করল খুব–এর মধ্যেই ট্রেনও চলে এলো। ট্রেনে চেপে বসলাম। এসি কামরা। তবে জানালা বেশ পরিচ্ছন্ন। একদম পরিষ্কার সব দেখতে পাবেন। অধিকাংশ মানুষ নন-এসির টিকিট কাটে খোলা জানালায় চোখ রাখতে। চাইলে পুরো ট্রেনেই ঘোরা যায়। টিটি এসে জানিয়ে দেন কোথায় কোন ভিউ দেখা যাবে। নির্দিষ্ট জায়গায় ট্রেনের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়, যাতে যাত্রীরা ছবি তুলতে পারেন। ডামুডরা থেকে ১০ মিনিটেই ট্রেন পৌঁছে গেল নাইন আর্চ ব্রিজে, সেখানে প্রায় ১০ মিনিট দাঁড়ালো।
এরপর শুরু হলো আসল মুগ্ধতা। আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম পুরো যাত্রাপথ, এলেবেলে পাহাড়ি পথ ও নয়নাভিরাম সৌন্দর্য দেখে। হুট করে মনে হবে চা বাগানের কোলে টুপ করে হারিয়ে যাচ্ছে আস্ত ট্রেন, দুই পাশে ঘন চায়ের বাগান। পাহাড় পেরিয়ে শহর, ঝরনা, গাছগাছালির ছায়া, টানেল কী নেই এই যাত্রাপথে। সব মিলিয়ে প্রায় ৭ ঘণ্টার এক স্বপ্নের যাত্রা ছিল। ট্রেনের খাবার সাধারণ হলেও মন্দ নয়। বিকেল গড়িয়ে এসে নামলাম ক্যান্ডিতে–সিংহলি রাজাদের শেষ রাজধানীতে। সেই গল্প থাক,
আরেকদিনের জন্য।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com