জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সাম্প্রতিক সময়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কিছু বক্তব্য এবং আচরণ দেশের মানুষকে গভীরভাবে হতবাক করছে। বিশেষ করে নারীদের নিয়ে যেসব অবমাননাকর, বিদ্বেষমূলক ও অযাচিত মন্তব্য করা হচ্ছে এবং কোথাও কোথাও নারীদের শারীরিকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে, তা শুধু রাজনৈতিক শিষ্টাচারবিরোধী নয়। এগুলো সংবিধান, মানবাধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শেরও বিরোধিতা।
দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। ভোটার হিসেবেও নারী-পুরুষের সংখ্যা প্রায় সমান। সেই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নারীদের সম্পর্কে অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য, কটূক্তি কিংবা রাজনৈতিক মঞ্চে নারীর উপস্থিতি অস্বীকার করার প্রবণতা কেবল হতাশাজনক নয়, বরং গভীরভাবে উদ্বেগজনক। একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মানসিকতা বোঝা যায় সে রাষ্ট্র তার নারীদের কতটা মর্যাদা দেয়; আর সেই মানদণ্ডে দাঁড়িয়ে সাম্প্রতিক কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য এসেছে, যা আমাদের উদ্বিগ্ন করেছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে– নারীর অধিকার কোনো কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি বাংলাদেশের সংবিধান-স্বীকৃত অধিকার। সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে, রাষ্ট্র নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো বৈষম্য করবে না। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড, যেমন– নারী বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও), যেটিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপক্ষ, সেখানেও নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ আমরা দেখছি, নির্বাচনের সময় এলেই কিছু প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী নারীর অধিকারকে ‘হুমকি’ হিসেবে দেখাতে চায়। নারীর স্বাধীনতা ও অংশগ্রহণকে অবজ্ঞার চোখে দেখতে শুরু করে। আমরা মনে করি, যারা এ ধরনের ভাবনার মধ্যে রয়েছে তারা নারীর শক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়।
আমাদের উদ্বেগের কারণ, এই দেশে বেগম রোকেয়ার মতো একজন মহীয়সী নারীকে নিয়ে কটূক্তি করতে দেখা যাচ্ছে। যিনি নারী জাগরণের প্রতীক, যাঁর চিন্তা ও সংগ্রাম আজকের বাংলাদেশের নারী শিক্ষার ভিত্তি গড়ে দিয়েছে, তাঁকে অবমাননা করা মানে ইতিহাসকে অস্বীকার ও নিজের শিকড়কে অস্বীকার করা। যারা নারীর সমানাধিকারের দাবি সহ্য করতে পারেন না, তাদের মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি– এই দেশের ইতিহাস নারীদের হাত ধরেই বহুবার এগিয়েছে।
ভাষা আন্দোলনের দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাই, ১৪৪ ধারা ভাঙার সাহসও দেখিয়েছিলেন নারীরা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও নারীর অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ এবং অবদান অনস্বীকার্য। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্ম দিয়েছেন যারা, সেই রত্নগর্ভা মায়েদের অবদান এ দেশের মাটির প্রতিটি ধূলিকণায় মিশে আছে। কাজেই নারীর বিরুদ্ধে বিরূপ মন্তব্য করার আগে এই ইতিহাস স্মরণ করা কেবল শোভনই নয়; সকলের নৈতিক দায়িত্ব।
আমরা লক্ষ্য করছি, সামনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে নারীকে অবমাননাকর পরিস্থিতিতে ঠেলে দিচ্ছে। কোথাও নারীর পোশাক নিয়ে মন্তব্য, কোথাও নারীর রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন, আবার কোথাও প্রকাশ্য মঞ্চে একজন নারী প্রার্থীর সঙ্গে এক মঞ্চে না বসার মতো ঘটনা ঘটছে। একটি নির্বাচনী আলাপের অনুষ্ঠানে নারী প্রার্থীর সঙ্গে মঞ্চ ভাগাভাগি না করার ঘটনাটি শুধু একজন নারীকে নয়, সমগ্র নারী সমাজকে অপমান করার শামিল। নারীকে শারীরিকভাবে হেনস্তা আরও জঘন্য। এটি সেই বাংলাদেশ নয়, যেখানে নারীরা নীরবে অপমান সহ্য করবে।
নারীর প্রতি এই বিদ্বেষমূলক আচরণ কেবল সামাজিকভাবে ক্ষতিকর নয়; সরাসরি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট নয়। গণতন্ত্র মানে সমান অংশগ্রহণ, সমান মর্যাদা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। যখন নারীদের কণ্ঠকে চেপে ধরা হয়, তখন আসলে গণতন্ত্রকেই সংকুচিত করা হয়।
এই দেশ নারী-পুরুষের সমান শ্রমে গড়ে উঠেছে, নারীর সংগ্রামে শক্তি পেয়েছে। নারীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কেউ এই দেশে রাজনীতি করতে পারবেন না– ইতিহাস তার সাক্ষী।
নাদিমা খান, ঝর্না খানম, শিল্পী সাহা, তামান্না নাসরীন ও শিল্পী শর্মা: লেখকবৃন্দ মানবাধিকারকর্মী