সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৩৭ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

কৃষকের জন্য এক আন্তরিক সেবাকেন্দ্র

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ২১ বার পড়া হয়েছে

টিন দিয়ে চারচালা করে ছাওয়া ছোট ছিমছাম একটি বাড়ি। গ্রামীণ পাকা সড়কের পাশে অবস্থিত বাড়িটিতে ঢুকতে বিশেষ কোনো ফটক পেরোতে হয় না। তাই দিনের প্রায় প্রতিমুহূর্তই সেখানে কৃষকের অবাধ যাতায়াত চলে। তাদের বসার জন্য বাড়ির ভেতরে রয়েছে সোফার ব্যবস্থা। সেখানে বসে তারা আলাপ করেন চাষাবাদ নিয়ে। তাদের সমস্যা শোনার জন্য কৃষি বিষয়ে জ্ঞান আছে– এমন কেউ না কেউ সব সময় থাকেন। খুব ছোট সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করা হয়। সমস্যা একটু বড় মনে হলেই কৃষককে নিয়ে সরাসরি মাঠে চলে যান কৃষি কর্মকর্তা। এমন আন্তরিক সেবা পেয়ে কৃষকরা যেমন খুশি, তেমনই ফসল আবাদ করেও বেশ লাভবান হচ্ছেন। গত ছয় মাসে এই বাড়িটি তাদের কাছে ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছে।

আসলে এটি কোনো বাড়ি নয়, সেবাকেন্দ্র। দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার সাইতারা ইউনিয়নের খোচনা গ্রামে অবস্থিত এই কেন্দ্রের নাম ‘গ্রাসরুট সার্ভিস আউটলেট’ বা ‘তৃণমূল কৃষক সেবাকেন্দ্র’। প্রান্তিক কৃষকদের কৃষি বিষয়ে যাবতীয় পরামর্শ ও সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে গত ১৫ জুন কেন্দ্রটি চালু করা হয়। চালুর পরের মাস থেকে প্রতি মাসে গড়ে দেড় শতাধিক কৃষক এখানে সেবা নিচ্ছেন। তৃণমূল কৃষক সেবাকেন্দ্রের স্বত্বাধিকারী একই গ্রামের যুবক আসেফ রহমান রিফাত। নিজেদের জমিতে এটি প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি।

রিফাত জানান, এই কেন্দ্রে যে কেউ কৃষি বিষয়ে যে কোনো সমস্যা নিয়ে এলে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। বেশির ভাগ সমস্যাই তাৎক্ষণিক সমাধান করা হয় না। মাঠে গিয়ে ফসলের সমস্যা নিশ্চিত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। এরপর দেওয়া হয় সমাধান। মূলত এখানে সমন্বয় করে কৃষকদের পরামর্শ দেয় উপজেলা কৃষি কার্যালয়। মূল উদ্দেশ্য উন্নত বিশ্বের মতো আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলে কৃষকদের লাভবান করা।

উপজেলা ও জেলা কৃষি কার্যালয় থেকে জানা গেছে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট (এসএসিপি-রেইনস) প্রকল্পের আওতায় ‘গ্রাসরুট সার্ভিস আউটলেট’ বা ‘তৃণমূল কৃষক সেবাকেন্দ্র’ গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রকল্পটি চালু হয় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে। এ পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় ১৪টি জেলায় ৬০টি তৃণমূল কৃষক সেবাকেন্দ্র খোলা হয়েছে। এর মধ্যে দিনাজপুরের সব উপজেলায় (১৩টি) একটি করে রয়েছে এই কেন্দ্র। এখানে আসা কৃষকরা তাদের ফসলের যে কোনো ধরনের পরামর্শ নিতে পারেন অভিজ্ঞ কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে। কেউ চাইলে কৃষি অধিদপ্তর থেকে দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে এমন কেন্দ্র খুলতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে কেন্দ্রটি চালু হলে সেখানকার কৃষকরা সহজে পরামর্শ পাবেন কিনা, উদ্যোক্তার আগ্রহ কেমন ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় নেয় অধিদপ্তর।

রিফাত বলেন, ‘আমি কৃষক পরিবারের সন্তান। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, কৃষকরা নিপীড়নের শিকার। উৎপাদন খরচ কমাতে পারলে তারা লাভবান হবেন। এ জন্য মানসম্মত কৃষি ও টেকসই কৃষির ওপর গুরুত্ব আরোপ প্রয়োজন। তা ছাড়া কৃষক না বাঁচলে দেশ টিকবে না। তারাই দেশের প্রাণ। তাই এমবিএ করার পরও কৃষকদের জন্য কাজ করা শুরু করি। বিষয়টি জানতে পেরে কৃষি অফিস আমাকে সেবাকেন্দ্র খোলার পরামর্শ দেয়। পরে ২০টি প্রশিক্ষণ নিয়ে কৃষি অধিদপ্তরে আবেদন করে এটি চালু করি। আমরা মূলত কৃষকদের লাভজনক ফসলের সঙ্গে পরিচিত করছি। একজন কৃষকের অভিজ্ঞতা আরেকজন কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেইনের মতো কাজ করছি। সেবাকেন্দ্র শুরুর প্রথম মাসে মাত্র ১৪ কৃষক পরামর্শ নেন। কিন্তু পরে তারা যখন বুঝতে পারেন, এখানে এলে লাভ আছে, তখন থেকে তাদের যাতায়াত বাড়তে থাকে।’

এই উদ্যোক্তা জানান, সেবাকেন্দ্র চালু করতে প্রাথমিকভাবে সরকারিভাবে পাঁচ লাখ টাকা অনুদান পেয়েছিলেন। এরপর কেন্দ্রের ভেতরের পরিবেশ, যার মধ্যে আছে কৃষকদের বসার জন্য সোফা, বুক শেলফসহ যাবতীয় ব্যবস্থা নিজ খরচে করেছেন। এখানে রাখা কৃষি উপকরণ ও বীজ তিনি প্রদর্শনীর পাশাপাশি বিক্রিও করেন। তা ছাড়া ছোট ছোট কৃষিযন্ত্র কৃষকদের ভাড়া দেন। প্রকল্পটির জন্য কৃষি কর্মকর্তারা কাজ করছেন। কৃষকদের পরামর্শ দেওয়ার জন্য তারা সহযোগিতা করছেন।

সম্প্রতি রিফাতের তৃণমূল কৃষক সেবাকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে বড় একটি কক্ষে সোফায় বসে আছেন চারজন। তারা সবাই কৃষক। চারজনই খোশমেজাজে গল্প করছেন। তাদের পাশের চেয়ারে বসে আছেন দুই নারী। কক্ষের এক কোণে চেয়ার-টেবিল পেতে বসে আছেন রিফাত। সামনের চেয়ারে বসা এক কৃষককে কৃষি বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি। উপস্থিত নারী-পুরুষরাও মনোযোগ দিয়ে সেই আলাপ শুনছেন।

পরিপাটি কক্ষের দেয়ালজুড়ে কৃষি বিষয়ে বিভিন্ন বার্তা। কোনো লক্ষণ দেখা দিলে বোঝা যায় ফসলের কী রোগ হয়েছে, তার প্রতিকার কী– সব তাতে স্পষ্ট উল্লেখ করা। পাশেই কর্নারে বুক শেলফে কিছু বই। এগুলোও কৃষিবিষয়ক। আরেক পাশে সাজানো বীজ কর্নার, যেখানে সুন্দর করে সাজানো ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা, শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলের বীজের প্যাকেট। আরও আছে বালাইনাশকের প্যাকেট ও বোতল। রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি সেবাকেন্দ্র ও মাটি পরীক্ষাগার।

কেন্দ্রে আসা পশ্চিম সাইতারা গ্রামের কৃষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘অনেক অফিসে যাই, কিন্তু সেখানে কেউ বসতে বলে না। এখানে এলে বসতে বলে, ভালো করে পরামর্শ দেয়। কৃষকের প্রতি কোনো অবহেলা নেই। আমি কয়েক মাস ধরে এখানে আসি। পরামর্শ নিই। পরামর্শ অনুযায়ী আবাদ করতে সারও যেমন কম লাগছে, ফলনও ভালো পাচ্ছি।’
তৃণমূল কৃষক সেবাকেন্দ্র থেকে পরামর্শ নিয়ে বাড়ির আঙিনাসহ বিভিন্ন পতিত জায়গায় শাকসবজি আবাদ করছেন উপজেলার অনেক নারী। তাদের একজন বাংলাবাজার এলাকার পিংকি আক্তার বলেন, ‘আমার বাড়ির পাশে পুকুরের ধারে সবজি চাষ করছি। ফলমূলের চারাও লাগিয়েছি। এ জন্য যাবতীয় পরামর্শ নিয়েছি এখান থেকে। এটিকে কৃষি পাঠাগারও বলা যেতে পারে। আমি মাঝেমধ্যে এখানে এসে কৃষি বিষয়ের বই পড়ি। নানাভাবে এখান থেকে উপকার পাচ্ছি।’

কৃষকরা জানান, শুধু চাষাবাদের বিষয়েই নয়, কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনা, ঋণ নেওয়ার নিয়মাবলিও এই কেন্দ্র থেকে জানতে পারছেন তারা। রিফাত বলেন, ‘জটিল সমস্যা পেলে সেটা নিয়ে অভিজ্ঞ কৃষি কর্মকর্তার সহযোগিতা নিই। ইউনিয়ন কৃষি কর্মকর্তাদের কেউ না কেউ প্রতিদিন এখানে আসেন। জটিল সমস্যাগুলো তাঁর সহযোগিতা নিয়ে সমাধান করা হয়।’
চিরিরবন্দর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ জোহরা সুলতানা মনে করেন, বর্তমানে কৃষককে টিকে থাকতে হলে ব্যবসা শিখতে হবে। তারা কী আবাদ করবেন, তার পরিকল্পনা আগেই করলে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন। তিনি বলেন, ‘তৃণমূল কৃষক সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে আমরা সেসব বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে আসছি। আমাদের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কৃষি অফিস তাদের সেবা দিয়ে আসছে। তৃণমূল কৃষক সেবা সম্প্রসারণ করলে কৃষকরা উপকৃত হবেন। এ জন্য কৃষি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে।’

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com