সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৩৭ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

পাহাড়ি নারীর অব্যক্ত কথা জানতে…

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: রবিবার, ১৮ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে

২০২৪ সাল। নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র তুলে আনার লক্ষ্যে ‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’-এর কাজ শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে শত শত প্রশিক্ষিত তথ্য সংগ্রহকারী চষে ঘুরেছেন পুরো বাংলাদেশ। তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটাই–নারীর অভিজ্ঞতা শোনা, নথিভুক্ত করা এবং সহিংসতার প্রকৃত রূপ অনুধাবন করা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে শামিল ছিলেন তুসা চাকমাও। পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি জনপদে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন তিনি।
পার্বত্য অঞ্চল মানেই বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি আর দুর্গম ভূপ্রকৃতি। এমন পরিবেশে নারীর মনের কথা বের করে আনা কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতার বিষয় নয়, এর জন্য প্রয়োজন গভীর বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং অসীম ধৈর্য।
একজন চাকমা নারী হিসেবে তুসার জন্য এ কাজ ছিল অনেকটা ‘ঘরে ফেরা’র মতো। তিনি বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতাকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে হলে আপনাকে সেখানে যেতে হবে যে পরিবেশে নারীরা থাকেন, সেই স্থান যত দুর্গমই হোক না কেন।’
একটি জাতীয় জরিপ তখনই সফল হয়, যখন তা দেশের সব জনপদ, শ্রেণি এবং পরিস্থিতির নারীকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। তুসা চাকমার মতো তথ্য সংগ্রহকারীদের কারণেই তা সফল হয়ে থাকে। তাদের স্থানীয় জ্ঞান, ভাষা এবং জীবনবোধ নারীর জন্য এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে তারা নির্দ্বিধায় নিজেদের কথা বলতে পেরেছেন।
তুসা বলেন, ‘আপনি ধনী না গরিব, শিক্ষিত না অশিক্ষিত, ঢাকায় থাকেন নাকি প্রত্যন্ত চরে– তাতে কিছু যায় আসে না। সহিংসতা সবখানেই ঘটে। আমরা প্রায়ই ভাবি, এসব অন্যের সঙ্গে ঘটে, আমাদের সঙ্গে নয়। বাস্তবতা হলো, সহিংসতা আমাদের চারপাশেই আছে।’
‘ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন সার্ভে ২০২৪’ বাংলাদেশে এ ধরনের তৃতীয় জাতীয় পর্যায়ের জরিপ। এ জরিপটি আগেরগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক। এবারই প্রথম প্রতিবন্ধী নারী, দুর্যোগপ্রবণ এলাকা, শহরের বস্তিবাসী, প্রযুক্তিগত সহিংসতার শিকার এবং নির্যাতনের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন নারীর অভিজ্ঞতাও এই জরিপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জরিপের ফলাফলে সমস্যার গভীরতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে–দেশের অর্ধেকেরও বেশি বিবাহিত নারী তাদের জীবনে অন্তত একবার স্বামী বা সঙ্গীর দ্বারা শারীরিক, যৌন, মানসিক বা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন। শুধু নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হয়েছেন ৬৮ শতাংশ নারী, যা স্বামীর দ্বারা সংঘটিত সহিংসতার সবচেয়ে সাধারণ রূপ। প্রায় ৪০ শতাংশ নারী মানসিক নির্যাতনের শিকার, যা প্রায়ই অন্যান্য নির্যাতনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে।
তুসা চাকমা নিজেও দুই সন্তানের জননী। স্কুল শেষ করার পরপরই বিয়ে হয়ে যায়। বাংলাদেশের অনেক মেয়ের ক্ষেত্রেই এ গল্পটা সত্যি। তুসা হয়তো পরবর্তী সময়ে একজন দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন, কিন্তু জরিপ বলছে–বাল্যবিয়ে মেয়েদের সহিংসতা থেকে রক্ষা করতে পারে না।
২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, ওই বছরে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতার শিকার হওয়া নারীদের মধ্যে ৬২ শতাংশই ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরী। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এই সহিংসতার হার কিছুটা কমে আসে। কিশোরীদের তুলনায় ৪৫-৪৯ বছর বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি প্রায় ৮০ শতাংশ কম।
তুসা আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিয়ে মেয়েদের নিরাপত্তা দেয়, এমন ধারণার প্রতি জরিপের ফলাফল এক বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ অনেক মেয়ের ক্ষেত্রে বিয়েই ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।’
প্রতিটি সাক্ষাৎকার শুরু করাই ছিল এক একটি চ্যালেঞ্জ। নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তুসা জানান, প্রথমে ভুক্তভোগীর বিশ্বাস অর্জন করতে হয়। যখন নারীরা নিরাপদ বোধ করতে শুরু করেন, তখন তারা এমন সব অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন, যা তুসার মনে গভীর দাগ কেটে যায়। বিশেষ করে একজন ভুক্তভোগী নারীর কথা তিনি ভুলতে পারেন না। ওই নারী তাঁর স্বামীর প্রতিটি নির্যাতনের ঘটনা গোপনে একটি খাতায় লিখে রাখতেন। তাঁর আশা ছিল, নির্যাতনের ধরনগুলো বুঝতে পারলে হয়তো তিনি পরের আঘাতটি থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারবেন। তুসা বলেন, ‘তিনি শুধু নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। আমাদের কাজ বিচার করা বা ব্যাখ্যা করা ছিল না। আমাদের কাজ ছিল সহানুভূতির সঙ্গে শোনা এবং তাঁর অভিজ্ঞতা সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা।’
নারীর প্রতি সহিংসতাবিষয়ক এ জরিপ বন্ধ দরজার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র জনসমক্ষে এনেছে। যখন সহিংসতা গণনার বাইরে থাকে, তখন তার পুরো ভার বইতে হয় কেবল ভুক্তভোগীকেই। এই জরিপ নিশ্চিত করেছে, যেন দুর্গম এলাকার নারীর কণ্ঠস্বরও হারিয়ে না যায়। এই বিশাল জাতীয় প্রচেষ্টার পেছনে রয়েছেন তুসা চাকমার মতো অদম্য নারীরা; যারা দুর্গম পাহাড় ডিঙিয়ে, বিচারপ্রবণ না হয়ে কেবল শুনেছেন এবং নিশ্চিত করেছেন, কোনো ভুক্তভোগীর আকুতিই যেন মুছে না যায়।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com