যক্ষ্মা (টিবি) একটি সংক্রমণজনিত রোগ যা মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস নামে পরিচিত একটি ব্যাকটেরিয়ার কারণে হয়ে থাকে। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ব্যাকটেরিয়া ফুসফুসকে সংক্রমিত করে; এছাড়াও কিডনি, মেরুদন্ড এবং মস্তিষ্কসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গকেও প্রভাবিত করতে পারে। অসুস্থ ব্যক্তির হাঁচি, কাশি বা থুথু-এর ছোট কনা থেকে বাতাসের মাধ্যমে এই রোগ ছড়িয়ে পরতে পারে। বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় এক চতুর্থাংশ টিবি ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। সংক্রমিত ব্যাক্তিদের মধ্যে প্রায় ৫-১০% অবশেষে উপসর্গ দেখা দেয় এবং টিবি রোগে আক্রান্ত হয়।
যক্ষ্মা ইনফেকশনে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে শুধুমাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশই টিবি রোগের প্রকাশ ঘটায়। অন্যদিকে, যখন একজন ব্যক্তি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন, তখন তাদের মধ্যে যক্ষ্মা রোগের লক্ষণ দেখা যায়। টিবি সংক্রমণ অনেকের মাঝে সুপ্ত অবস্থায়ও থাকে। যাদের ভেতর টিবি ইনফেকশন সুপ্ত অবস্থায় থাকে, সেসব আক্রান্ত ব্যক্তিরা অসুস্থ বোধ করেন না এবং সংক্রামকও হন না।
টিবির সাধারণ কিছু লক্ষণগুলো হলো:
● দীর্ঘায়িত কাশি (কখনও কখনও কাশির সাথে রক্ত যাওয়া )
● বুক ব্যাথা
● দুর্বলতা
● ক্লান্তি
● ওজন কমে যাওয়া
● জ্বর
● রাতে ঘাম হওয়া
কিছু নির্দিষ্ট কারণ একজন ব্যক্তির জন্য যক্ষ্মা রোগের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে:
● ডায়াবেটিস (রক্তে উচ্চ শর্করা )
● দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (উদাহরণস্বরূপ, এইচআইভি বা এইডস)
● অপুষ্টি
● তামাক ব্যবহার
● দূষিত বায়ু (ফুসফুসের যক্ষ্মার জন্য প্রযোজ্য)
যক্ষ্মা রোগের এই ভয়াবহতা সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে ২৪ মার্চ পুরো বিশ্ব জুড়ে পালন করা হয় যক্ষ্মা দিবস। বাংলাদেশেও বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালিত হচ্ছে এবং গত বছরের মত এবারেরও প্রতিপাদ্য “হ্যাঁ! আমরা যক্ষ্মা নির্মূল করতে পারি!” যক্ষ্মার বিস্তার এবং প্রভাব নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও এটি বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ সৃষ্টিকারী একটি রোগ। উচ্চ টিবি রোগের বোঝা সম্পন্ন ৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম এবং বিশ্বের মোট ৩.৬% টিবি রোগের জন্য দায়ী। বাংলাদেশে প্রতি লাখে যক্ষ্মা রোগের আনুমানিক ঘটনা ২২১ জন, মৃত্যুর হার প্রতি লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ২৪ জন। বাংলাদেশে প্রায় ৮০% টিবি রোগী পালমোনারি টিবি রোগে আক্রান্ত। পালমোনারি যক্ষ্মা সাধারণত ফুসফুসকে আক্রান্ত করে থাকে, তবে তা অন্যান্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী এই সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের চলমান লড়াইয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কৌশলপত্র মতে, ২০২৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মায় মৃত্যু ৭৫ শতাংশ (২০১৫ সালের তুলনায়) কমাতে হবে। ২০১৫ সালে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছিল প্রায় ৭৩ হাজার মানুষের, যা ২০২৫ সালের মধ্যে কমিয়ে আনতে হবে ১৮ হাজারে। তবে বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রা থেকে বেশ পিছিয়ে রয়েছে। দেশে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি কাজ করছে এবং এই প্রতিষ্ঠানের লাইন ডিরেক্টর মাহফুজুর রহমান সরকার এর মতে, লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ধরা হয়েছিল যা অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। তিনি আরো বলেন যে, মানুষের মধ্যে যক্ষ্মা নিয়ে সচেতনতা এখনো অনেক কম। তাদের এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে আইসিডিডিআরবি। আইসিডিডিআরবি এর সিনিয়র সায়েন্টিস্ট সায়েরা বানু বলেন, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এর দেয়া লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে সকল জনগণের নিকট যক্ষ্মা রোগের সেবা পৌঁছাতে হবে। তার মতে, মানুষের মধ্যে এখনো যক্ষ্মা রোগ বিষয়ক সচেতনতার অভাব রয়েছে। বাংলাদেশে যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা বিনামূল্যে দেয়া হলেও এখনো এ সম্পর্কে অনেকেই অবহিত নয়। যক্ষ্মা মোকাবিলায় শুধু সরকার বা যক্ষ্মা নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থার উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। বরং সাধারণ জনগণ, সুশীল সমাজ ও বেসরকারি খাতকেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
ফুসফুসের যক্ষ্মার ক্ষেত্রে বায়ু দূষণ হতে পারে মারাত্মক ঝুঁকির কারণ। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) করা এক গবেষণায় দেখা যায় যে, বিগত ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানী ঢাকার বায়ুদূষণের গড় মান আগের সাত বছরের এই মাসের তুলনায় বেড়েছে। বায়ু দূষণের সাথে বেড়েছে দূষণজনিত রোগের মাত্রা। রাজধানীর শ্যামলীর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট টিবি হাসপাতালে দৈনিক রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০০ যা জানুয়ারি মাসে ছিলো ২৫০ এর বেশি। হাসপাতালটির উপপরিচালক ডা. আয়শা আক্তার মনে করেন, বায়ু দূষণ বৃদ্ধির সাথে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
তাই যক্ষ্মা রোগের উপদ্রব কমাতে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সোচ্চার হতে হবে সাধারণ জনগনকে। এছাড়াও বায়ু দূষণসহ অন্যান্য বিষয় যা যক্ষ্মা রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে সেগুলো মোকাবেলা করতেও সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।