উঠানটা প্রথম দেখলে আলাদা করে চোখে পড়ার কথা নয়। গ্রামের আর দশটা উঠানের মতোই। কাছে গেলে বোঝা যায়, এখানে কিছু একটা বদলাচ্ছে। মাটির ওপর পলিথিন শিট পাতা। চারপাশে গোল হয়ে বসে আছেন ২৫ জন কিষান-কিষানি। কারও হাতে খাতা, কারও হাতে গাছের পাতা, কারও চোখে প্রশ্ন। দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আংগারপাড়া ইউনিয়নের পাকেরহাটের এই উঠানেই চলছে নীরব কৃষিবিপ্লব। কোনো সেমিনার কিংবা বক্তৃতা নয়; এখানে কৃষি শেখানো হয় গাছ ধরে, মাটি ছুঁয়ে, পোকা চিনিয়ে। নাম ‘পার্টনার মাঠস্কুল’। কৃষকের ভাষায়, ‘এখানে যা শেখা যায়, তা মাঠে কাজে লাগে।’
মাঠস্কুলের প্রশিক্ষক উপজেলা কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা বোর্ড-চক নিয়ে আসেন না। সঙ্গে আনেন গাছ, ফল, পোকা, মাটি। একটি গাছের পাতায় দাগ দেখিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দেন–এটা রোগ, না পোকা? হলে কোনটা? দমন কীভাবে হবে? প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই শুরু হয় শেখা। নির্বিচারে বালাইনাশক ছিটানো নয়, আগে কারণ বুঝতে হবে। কোন পোকা ক্ষতিকর, কোনটা উপকারী। কোন পর্যায়ে কী করা দরকার। পরিবেশবান্ধব উপায়ে কীভাবে ফসল বাঁচানো যায়, সেটিই মূল শিক্ষা।
প্রতিটি মাঠস্কুলে ১০টি পাঠ। সপ্তাহে এক দিন, তিন ঘণ্টার ক্লাস। বিশেষ নিয়ম আছে–প্রতিদিন একজন কৃষক নিজেই হন দলনেতা। তিনি ক্লাস পরিচালনায় সহযোগিতা করেন। এতে কৃষকের আত্মবিশ্বাস বাড়ে, শেখাটাও হয় নিজেদের ভাষায়। নাটক, দলীয় আলোচনা, হাতে-কলমে অনুশীলন– সব মিলিয়ে ক্লাসগুলো প্রাণবন্ত। সে কারণে এখানে কৃষকদের টানতে হয় না। তারা নিজেরাই সময় বের করে আসেন।
সারাদেশে এমন মাঠস্কুলগুলো ‘প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’, সংক্ষেপে পার্টনার প্রকল্পের অংশ। কৃষিকে শুধু উৎপাদনের জায়গা হিসেবে না দেখে পুষ্টি, পরিবেশ, বাজার আর টেকসই ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করাই এর লক্ষ্য। দেশের প্রতিটি উপজেলায় গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (গ্যাপ) প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। ‘গ্যাপ’ মানে শুধু কম কীটনাশক নয়। এর মধ্যে আছে মাটি ও পানি পরীক্ষা, সুষম সার ব্যবহার, জৈব সার প্রয়োগ, ফসল আবর্তন, নিরাপদ সেচ, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা–এমনকি ফসল তোলার পর সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে প্রথমবারের মতো পার্টনার প্রকল্পের আওতায় ‘গ্যাপ’ অনুসরণ করে লাউ ও বেগুন চাষ হয়েছে। উপজেলার ইব্রাহিমপুর ইউনিয়নের কৃষক মাইনুদ্দিন ও সুমন মিয়া পুরো প্রক্রিয়া শুরু করেন কৃষক স্কুল থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে। চাষের আগে মাটি ও পানি পরীক্ষা করা হচ্ছে। মাটি পরীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী জৈব সার প্রয়োগ করা হচ্ছে। বালাই দমনে ফেরোমন ফাঁদ, জৈব বালাইনাশক ব্যবহার হচ্ছে।
মাইনুদ্দিন জানালেন, ‘আগে যা করতাম, তা এখন ভুল মনে হয়। আন্দাজে সার দিতাম, পোকা দেখলেই বিষ দিতাম। এখন বুঝে কাজ করছি। দুই দফা লাউ বিক্রি করেছি। ফলন ভালো, রোগ কম। সবচেয়ে বড় কথা, আশপাশের কৃষকরা আমার জমি দেখতে আসছেন। কেউ শিখছেন, কেউ ফসল কিনে নিচ্ছেন।’ সুমন মিয়া এখনও বেগুন বিক্রি শুরু করেননি। তবে গাছ দেখে তিনি আশাবাদী। তিনি বলেন, বেগুন উৎপাদন খুব ভালো হয়েছে। যদি এভাবে চলতে পারে, তাহলে বিষমুক্ত বেগুন পাওয়া যাবে। ‘গ্যাপ’-এর ফল মাঠেই দেখা যাচ্ছে। রোগবালাই কম, ফলন ভালো, স্বাদও আলাদা।
‘গ্যাপ’ শুধু নিরাপদ খাদ্যের কথা বলে না, বাজারও বদলাতে পারে–এর বড় উদাহরণ নওগাঁর আমচাষি সোহেল রানা। ২০১৩ সাল থেকে তিনি আম চাষ করছেন। অতিরিক্ত সার আর কীটনাশক ব্যবহার করে ফলন বাড়ানোর চেষ্টা করতেন। জানতেন, এতে মাটি ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। বিকল্প ছিল না। বাজারে বিক্রি করে খুব সামান্য লাভ হতো। এই চিত্র বদলে যায় ‘গ্যাপ’ অনুসরণের মাধ্যমে। গত গ্রীষ্মে কাতারে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে তিনি ৪ দশমিক ৫ টন আম রপ্তানি করেন। আম্রপালি, কলা আম ও বারি-৪ জাতের এই আম থেকে তাঁর লাভ প্রায় ১৬ লাখ টাকা। নওগাঁর তিন উপজেলায় বিস্তৃত তাঁর ২০০ বিঘা খামার। তিনি মনে করেন, গ্যাপ ছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে টেকা সম্ভব নয়।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাপ একটি কাঠামোবদ্ধ কৃষিপদ্ধতি। এখানে কী সার দেওয়া হলো, কখন দেওয়া হলো, কী কীটনাশক ব্যবহার হলো–সবকিছুর নথি রাখতে হয়। পণ্য উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হয়। ফলে ক্রেতা জানেন, তিনি কী খাচ্ছেন। প্রচলিত চাষে এসবের কিছুই নেই। স্থানীয় অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে কাজ হয়। মান নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ঝুঁকি সেখানেই।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পার্টনার প্রকল্প পাঁচ বছর মেয়াদি। সরকার, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল যৌথভাবে অর্থায়ন করছে। দুই বছরেই প্রায় দুই লাখ কৃষক ‘গ্যাপ’ প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। মাঠপর্যায়ে কাজের জন্য প্রশিক্ষিত হয়েছেন এক হাজার ৪০০-এর বেশি উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা। ২০২৮ সালে শেষ হওয়ার কথা এই কর্মসূচির লক্ষ্য তিন লাখ হেক্টর জমিতে উত্তম কৃষিচর্চায় চাষ এবং ১০ লাখ কৃষক পাবেন প্রশিক্ষণ।
বাস্তবতা হলো, এত প্রশিক্ষণের পরও কঠোর পরিদর্শনে ‘গ্যাপ’ সনদ পেয়েছেন মাত্র ১৮ জন কৃষক। কারণ মানদণ্ড অত্যন্ত কঠিন। বাংলাদেশ গ্যাপে আছে ২৪৬টি শর্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জটিলতা কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে পারে। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও গ্যাপ বিশেষজ্ঞ আবু নোমান ফারুক আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ গ্যাপে ২৪৬টি শর্ত কৃষকদের জন্য অত্যন্ত জটিল। গ্লোবাল গ্যাপের ১৯০টি শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে সনদ দিচ্ছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি ইউনিট, যেখানে গ্লোবাল গ্যাপের সনদ দেয় স্বাধীন বেসরকারি সংস্থা। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে গ্রহণযোগ্যতা কমতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান আবদুস সালাম বলেন, মানদণ্ড সংশোধন করে জটিলতা কমানো হবে। তিনি স্বীকার করেন, বেসরকারি সংস্থা দিয়ে সনদ দেওয়া ভালো, তবে উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান এখনও পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যোগ্য বেসরকারি সংস্থা বা বিশ্ববিদ্যালয়কে সনদ প্রদানে দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘গ্যাপ’ টিকবে কিনা, তার বড় পরীক্ষা বাজারে। এখনও দেশজুড়ে গ্যাপ পণ্যের আলাদা ব্র্যান্ডিং নেই। প্যাকেজিং, লোগো, ভোক্তা সচেতনতা–সবকিছুই সীমিত। তবু ঢাকার সুপারশপগুলো গ্যাপ পণ্য কিনতে আগ্রহী। নলডাঙ্গার সবজিচাষি ইলিয়াস শেখ বলেন, গ্যাপ সনদ পাওয়ার পর বাজার নিজেই তাঁর কাছে এসেছে, কেউ কেউ বেশি দামও দিতে চেয়েছে। ২৫ বছর ধরে দুই একর জমিতে সবজি চাষ করে কোনো মৌসুমে সামান্য লাভ, আবার কোনো মৌসুমে খরচও উঠত না তাঁর। এ বছর প্রথমবার ‘গ্যাপ’ মেনে চাষ করে তুলনামূলকভাবে ভালো আয় করেছেন।
মীনাবাজারের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম বলেন, উচ্চমান ও তত্ত্বাবধানে উৎপাদনের কারণে গ্যাপের ফল ও সবজির চাহিদা শহরের অভিজাত এলাকার সুপারশপে বেশি। ক্রেতা গ্যাপ সনদপ্রাপ্ত পণ্য আগ্রহ নিয়ে কিনছেন। আরও বিক্রি করা যেত। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার গ্যাপ সনদপ্রাপ্ত আমচাষি আঙুর বেগম বলেন, দাম বেশি পেয়েছি, সেটি ভালো। তবে নিরাপদ খাবার উৎপাদন করতে পারার সম্মানটাই সবচেয়ে বড়।
ইউরোপে গ্যাপ চালু হয় ১৯৯৭ সালে, আর আসিয়ান দেশগুলোতে ২০০৬ সালে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেক পরে উদ্যোগ নেয়। পার্টনার প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক মাহবুবা মুনমুন বলেন, বাংলাদেশে গ্যাপ বাস্তবায়নের নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বার্ক)। পার্টনার প্রকল্পের আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সনদ দিচ্ছে। এই প্রকল্পে অর্থায়ন আছে বিশ্বব্যাংকের ৫০ কোটি ডলার ও ইফাদের চার কোটি ৩০ লাখ ডলারের ঋণ থেকে। বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
বার্কের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও পুষ্টিবিদ জাকিয়া রহমান মনি বলেন, প্রচলিত চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহারের ফলে মাটির প্রাকৃতিক পুষ্টি চক্র নষ্ট হয় এবং ফসলের পুষ্টিমান কমে যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া সবজির ৩০-৪০ শতাংশে অতিমাত্রায় কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ থাকে। এর ফলে কিডনি রোগ, স্নায়বিক সমস্যা–এমনকি ক্যান্সারের মতো দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। গ্যাপ অনুসরণ করলে এসব ঝুঁকি কমে এবং মাটির গুণাগুণ ও খাদ্যের পুষ্টিমান বজায় থাকে।