শীত নামলেই মানুষ পোশাক নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভাবতে শুরু করে। কী পরলে গরম থাকবে, আবার সারাদিন পরে থাকলেও অস্বস্তি লাগবে না–এ প্রশ্নই এ সময় সবার আগে আসে। এখান থেকেই হুডি-জ্যাকেটের চাহিদা তৈরি হয়েছে। আজকের দিনে শীত মানেই শুধু সোয়েটার বা ভারী জ্যাকেট নয়, বরং হুডি-জ্যাকেট হয়ে উঠেছে সবচেয়ে ভরসার পোশাক। আগে হুডি ছিল মূলত খেলাধুলার পোশাক বা ঘরের ভেতর পরার কিছু। জ্যাকেট মানে ছিল ভারী, শক্ত, অনেক সময় চলাফেরায় ঝামেলা হয়–এমন পোশাক। সময়ের সঙ্গে মানুষের চাহিদায় পরিবর্তন এসেছে। এখন মানুষ এমন পোশাক চায়, যেটি সকালে পরে বের হয়ে সারাদিন ব্যবহার করা যাবে। এই চাহিদার জায়গাটা হুডি-জ্যাকেট খুব সহজে পূরণ করেছে। সে কারণে এখন কেবল তরুণ-তরুণীই নয়, সব বয়সীর কাছে হুডি-জ্যাকেট সমান জনপ্রিয়।
বর্তমান ফ্যাশনে হুডি-জ্যাকেট মানেই ক্যাজুয়াল কিন্তু স্মার্ট লুক। ওভারসাইজড হুডি, জিপার দেওয়া হুডি কিংবা গ্রাফিক প্রিন্টের হুডি–সব ধরনের ডিজাইনই এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। এবারের শীতে হুডি-জ্যাকেটের ট্রেন্ডের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে এর সাধারণ ডিজাইন। খুব বেশি বাহারি কাট বা ভারী প্রিন্ট এখন বেশি নজর কাড়ে না। বরং এক রঙের হুডি-জ্যাকেট, সামনে ছোট লোগো বা অল্প লেখা–এ ধরনের ডিজাইনই বেশি চলছে। কালো, ধূসর, নেভি ব্লু, অলিভ, খয়েরি, গাঢ় সবুজ–এ রংগুলো এখন সবচেয়ে জনপ্রিয়। কারণ এ রংগুলো পরলে আলাদা করে মেলানোর ঝামেলা থাকে না। অফিসের বাইরে, বাজারে, আড্ডায় এসব রং সহজে মানিয়ে যায়।
ঢিলেঢালা কাটের হুডি-জ্যাকেট এখন তরুণদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। এই ধরনের হুডি পরলে শরীরে বাড়তি চাপ লাগে না, চলাফেরা সহজ হয়। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলেও ক্লান্ত লাগে না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার বা যারা বাইরে কাজ করেন তাদের কাছে এ হুডিগুলো খুবই পছন্দের। আবার যারা একটু গোছানো দেখতে চান, তাদের জন্য সাধারণ ফিটের জিপার দেওয়া হুডি-জ্যাকেটও ভালো বিকল্প। এগুলো দেখতে পরিপাটি লাগে; তাই অফিস শেষে বা প্রয়োজনীয় কাজে বের হলেও এসব মানানসই হয়।
ব্যবহারিক দিক থেকে হুডি-জ্যাকেট এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক। জিপার দেওয়া হুডি-জ্যাকেটের চাহিদা বাড়ছে। কারণ এগুলো সহজে খোলা ও বন্ধ করা যায়। সকালে ঠান্ডা বেশি থাকলে জিপ বন্ধ রাখা যায়; দুপুরে গরম হলে খুলে নেওয়া যায়। এতে হাত, মোবাইল, চাবি বা মানিব্যাগ রাখা যায়। হুডের দড়ি টেনে বাঁধা যায়। ফলে বাতাস বেশি হলেও মাথা ঢেকে রাখা যায়।
ফেব্রিকের দিক থেকে এবারের শীতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আরাম আর ইউজার ফ্রেন্ডলি ব্যবহারের ওপর। বাংলাদেশের শীত খুব বেশি কনকনে নয়; তাই খুব মোটা জ্যাকেট অনেক সময় অস্বস্তিকর লাগে। এ কারণে কটন ফ্লিস ফেব্রিকের হুডি-জ্যাকেট সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। ভেতরের নরম ফ্লিস শরীরের তাপ ধরে রাখে আর বাইরের কটন স্তর শরীরে ঘাম জমতে দেয় না। অনেক ব্র্যান্ড কটনের সঙ্গে পলিয়েস্টার মিশিয়ে হুডি-জ্যাকেটের কাপড় তৈরি করছে; যাতে এটি দীর্ঘদিন ভালো থাকে এবং ধোয়ার পরেও নষ্ট না হয়।
হাল ফ্যাশনের হুডি-জ্যাকেট নিয়ে ‘সারা’ লাইফস্টাইলের ডিজাইনার রায়হান নিশান বলেন, ‘এবারের শীতের কালেকশনে আমরা বিশেষ ডিজাইন, ফেব্রিক ও রঙের সমন্বয়ে কাজ করেছি। ড্রপ-শোল্ডার ও ওভারসাইজড সিলুয়েট, মাল্টি-ফাংশনাল জ্যাকেট, বোল্ড গ্রাফিক প্রিন্ট এবং কন্ট্রাস্ট পাইপিং দিয়ে তরুণদের শক্তি ও আত্মবিশ্বাস ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বাছাই করা নরম ফ্লিস ফেব্রিক আর পলিশড কটন-ফাইবার মিশ্রণ হুডি এবং সোয়েট শার্টে আরাম ও কার্যকারিতা দুই-ই নিশ্চিত করে। তাঁর মতে, কালো, নেভি ব্লু, অলিভ এবং খয়েরি রঙের সমন্বয়ে তৈরি হুডি কিংবা জ্যাকেট সব ধরনের পোশাকের সঙ্গে মানানসই।
বিক্রেতারা জানান, যারা একটু বেশি ঠান্ডা অনুভব করেন, তাদের জন্য ভেতরে মোটা ফ্লিস দেওয়া হুডি-জ্যাকেটও বাজারে আছে। আবার হালকা শীতের জন্য পাতলা ফেব্রিকের হুডি পাওয়া যায়– যেগুলো সকাল-সন্ধ্যার জন্য একদম উপযোগী। এখন মানুষ হুডি কেনার সময় শুধু রং বা ডিজাইন দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না।
মেয়েদের হুডি
মেয়েদের হুডিতে এখন বৈচিত্র্যপূর্ণ ডিজাইন ও কাট চোখে পড়ে। ওভারসাইজড হুডি, ক্রপ হুডি কিংবা লং হুডি–সবই রয়েছে ট্রেন্ডে। নরম ফ্লিস বা কটন ফেব্রিকের হুডি শীতে যেমন উষ্ণ রাখে, তেমনি স্টাইলেও এনে দেয় আধুনিকতা।
ছেলেদের হুডি
ছেলেদের হুডি সাধারণত হয় সিম্পল ও ক্ল্যাসিক। সলিড কলার, জিপার হুডি কিংবা গ্রাফিক প্রিন্টের হুডি এখন বেশ জনপ্রিয়।
কীভাবে স্টাইল করবেন
জিন্সের সঙ্গে হুডি জ্যাকেট মানেই ক্ল্যাসিক কম্বিনেশন। যারা একটু স্পোর্টি লুক পছন্দ করেন, তারা জগার প্যান্ট বা ট্র্যাক প্যান্টের সঙ্গে হুডি পরতে পারেন। মেয়েদের ক্ষেত্রে লেগিংস বা স্কার্টের সঙ্গে হুডি-জ্যাকেটও বেশ মানানসই। আরও স্টাইলিশ লুক পেতে হুডির ওপর লং কোট বা ডেনিম জ্যাকেট লেয়ার করা যেতে পারে।
সবার কাছে গ্রহণযোগ্য
হুডি-জ্যাকেটের সবচেয়ে সুবিধা হলো এর সর্বজনীন ব্যবহার। একই পোশাক সকালে কাজে যাওয়ার সময় পরা যায়, বিকেলে আড্ডায় মানিয়ে যায়, আবার রাতে বাইরে বের হলেও ঠিক থাকে। জিন্সের সঙ্গে পরলে স্বাভাবিক ক্যাজুয়াল লুক পাওয়া যায়, চিনো প্যান্টের সঙ্গে পরলে একটু গোছানো ভাব আসে আর ট্র্যাক প্যান্টের সঙ্গে পরলে স্পোর্টি লুক তৈরি হয়। বয়সের কোনো বাধা নেই–কিশোর থেকে মধ্যবয়সী মানুষ সবাই নিজের মতো করে হুডি-জ্যাকেট ব্যবহার করতে পারে।
কোথায় পাবেন এবং দরদাম
দামের দিক থেকে হুডি-জ্যাকেট এখন সব ধরনের মানুষের নাগালের মধ্যে। স্থানীয় বাজারে সাধারণ মানের হুডি-জ্যাকেট ৩০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যায়। এগুলো প্রতিদিনের ব্যবহার বা স্বল্প সময়ের শীতের জন্য যথেষ্ট। মাঝারি মানের ব্র্যান্ডে ভালো কাপড়, পরিষ্কার সেলাই আর ঠিকঠাক কাটের হুডি-জ্যাকেটের দাম সাধারণত ৮০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে থাকে। যারা একটু উন্নতমানের কাপড়, ভালো ফিটিং আর সুন্দর ফিনিশিং চান তাদের জন্য কিছু ব্র্যান্ডে এর দাম এক হাজার ৮০০ টাকার কাছাকাছিও হতে পারে।
হুডি-জ্যাকেটের কালেকশন এখন রাজধানীর নিউমার্কেট, বঙ্গবাজার, শপিং মলগুলোর পাশাপাশি জেলা শহরেও পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া অনলাইন শপিংয়ের কারণে মানুষ ঘরে বসেই বিভিন্ন ডিজাইন, রং আর দামের হুডি দেখে পছন্দ করতে পারছে। এতে সময় বাঁচছে আবার বাড়তি ঝামেলাও কমছে।