সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১২:১৭ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

সিরাজ সিকদারকে দ্বিতীয়বার হত্যাচেষ্টা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ২৬ বার পড়া হয়েছে

কয়দিন পরই সিরাজ সিকদারের মৃত্যুবার্ষিকী। ৫১ বছর আগে তাঁকে শারীরিকভাবে খুন করা হয়। এটা ছিল স্বাধীনতা যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশে বহুল আলোচিত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। শারীরিকভাবে খুন হলেও তাঁর চিন্তাধারা মাটিচাপা দেওয়া দুরূহ।

অল্প দিনের রাজনৈতিক জীবন হলেও তাঁর সময়ের রাজনৈতিক পরিসরে ‘এসএস’ নামে নিজ সহযোগীদের কাছে তিনি যে ভূমিকা রেখেছিলেন, ইতিহাস থেকে সেটা মুছে ফেলা কঠিন।
চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদদের শক্তির জায়গাটা এ রকমই হয়। শারীরিকভাবে কারও জীবিত থাকা না-থাকা জনজীবনে সামান্যই প্রভাব রাখে, যদি প্রকৃতই তাঁর চিন্তা ও কাজের ধরন লোকসমাজকে আলোড়িত করে। এসএসের বেলায় তাই ঘটেছে।

৫৪ বছর পর এবারের ডিসেম্বরেই কেবল বুদ্ধিজীবীদের বলতে শুনছি– একাত্তরে ‘মুক্তি’র যুদ্ধ ত্রিপক্ষীয় ছিল। পাকিস্তান বাহিনীকে মোকাবিলা করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মূল যোদ্ধা দলের বাইরে আমূল পরিবর্তনবাদীদের শ্রেণিযুদ্ধও চলছিল তখন। শেষোক্তরা ভারতের সহযোগিতা ছাড়াই দেশের ভেতরে একাত্তরের মার্চের আগেই স্বাধীনতার লক্ষ্যে সশস্ত্র যুদ্ধের সূচনা ঘটিয়েছিলেন নোয়াখালী, যশোর, নরসিংদী, বরিশালসহ বহু জায়গায়। এর মাঝে এসএসের নেতৃত্বে দক্ষিণাঞ্চলের পেয়ারা বাগান যুদ্ধক্ষেত্র ইতিহাসে বহুল আলোচিত। ওই সময় তাঁর সহযোগীরা দেশের অন্তত আট জায়গায় নিজস্ব শক্তিতে গেরিলা ফ্রন্ট পরিচালনা করছিলেন।

তবে এসএস একজন স্বাধীনতা যোদ্ধার চেয়েও বেশি কিছু ছিলেন। একাত্তরের বেশ আগে থেকে এবং বিশেষভাবে পরে স্বাধীনতাকে সামাজিক-অর্থনৈতিক মুক্তির স্তরে উন্নীত করার লক্ষ্যে তিনি যে সংগ্রামের গতিপথকে ভিন্নভাবে দেখছিলেন, সেটাও রাজনীতিমনস্কদের জানা। সেই সূত্রে তাঁর দল সর্বহারা পার্টি কী ধরনের চড়াই-উতরাইয়ের ভেতর দিয়ে গেছে, সেসব কাহিনি বহুল আলোচিত।
ইতোমধ্যে স্বাধীন বাংলাদেশের ৫৪ বছর পার হয়েছে এবং এখন এ বিষয়ে অনেকে একমত– ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র কাঠামোর সামান্যই বদল ঘটাতে পেরেছে স্বাধীনতা। তার ফলে নব্বই এবং চব্বিশে আরও দুটি গণঅভ্যুত্থান হলো। ‘লাল জুলাই’য়ের ১৬ মাস শেষে এও বলা হচ্ছে, ঔপনিবেশিক প্রশাসনের সংস্কার এবং বৈষম্যমূলক উৎপাদন সম্পর্ক বদলের কাজটি এবারও হলো না।

এ রকম উপলব্ধির মানে দাঁড়াচ্ছে, এসএস ১৯৭২-৭৪ পর্যায়ে যা বলছিলেন, তা কমবেশি এখন সবাই সঠিক বলে মানছেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক কাজের সশস্ত্র ধরন নিয়ে অনেকের ঘোরতর আপত্তি আছে। কেউ কেউ তাঁকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমাও দিয়েছেন। এসএসের রাজনৈতিক কাজের পদ্ধতি নিয়ে এ রকম বিতর্ক ও ভিন্নমত সত্ত্বেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই মুহূর্তে হঠাৎ তাঁর আবেদন যে বাড়ছে, সেটা কৌতূহলোদ্দীপক এবং ব্যাখ্যা দাবি করে।

বাড়ি ভাঙচুরের রাজনীতি বনাম ব্যবস্থা ভাঙচুরের আদর্শ
এসএস মুক্তিযুদ্ধপন্থি শ্রেণিসংগ্রামী হলেও মুক্তিযুদ্ধে যাদের অস্বস্তি; শ্রেণি-রাজনীতির সঙ্গে যাদের দূরতম সম্পর্কও নেই, গত বছর বৈষম্যবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের পরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা তাঁর গ্রাফিতি বিকৃত করেছিল; বাংলার ইতিহাসের সশস্ত্র সংগ্রামীদের যারা বিভিন্ন সময় ‘ডাকাত’ হিসেবে উল্লেখ করে, ‘চরমপন্থি’ তকমা দিয়ে বছরের পর বছর ‘সর্বহারা’দের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নযজ্ঞে যারা কোনোকালে নাখোশ ছিল না, প্রতিবাদ জানায়নি– এমন অনেকে এখন এসএসের ছবি দিয়ে তৈরি পোস্টার নাড়িয়ে নিজেদের তাঁর অনুসারী প্রমাণের চেষ্টা করছেন।
ব্যক্তি এসএস বা তাঁর চিন্তার কোনো কপিরাইট নেই। এ রকম রাজনীতিবিদ ও চিন্তকরা সমাজের সকলের। যে কেউ নিজেদের এসএসের অনুসারী দাবি করতে পারেন। কিন্তু তাঁর চিন্তার রাজনৈতিকভাবে বিকৃত ব্যবহার প্রশ্নসাপেক্ষ। সে কারণেই বিভিন্ন রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক তৎপরতার পক্ষে এসএসের ইমেজ যুক্ত করার চেষ্টা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অনেকে সম্প্রতি ক্ষমতাচ্যুত শাসকদের বাড়িঘর ভাঙচুর করে তার পাশে এসএসের ছবি টাঙিয়ে রাখছেন। তাঁর ছবির এ রকম অভিনব ব্যবহারের আগে এসএসের রাজনৈতিক চিন্তার পূর্ণাঙ্গ পাঠ জরুরি। কারণ এসএস বাড়ি নয়; বিদ্যমান ব্যবস্থা ভাঙচুরের রাজনীতি করতেন।

অনেকে আবার তাঁর লেখা থেকে পূর্বাপর সংযোগ বাদ দিয়ে পছন্দসই অংশ উদ্ধৃত করে নিজেদের রাজনৈতিক তৎপরতাকে ন্যায্যতা দিতে চাইছেন। এসএসের রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে নিজেদের আচ্ছাদন বানাতে চান তারা। বিশেষভাবে ভারত বিরোধিতার সাম্প্রতিক রাজনীতিতে জ্বালানি হিসেবে এসএসের ডাক পড়ছে। বাস্তবে এসএসের বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে শেষোক্তদের কাজকর্ম এবং রাজনৈতিক অভিমুখ কতটা মেলে, সেটা খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।

বাংলাদেশে বরাবরই ভারত-বিরোধিতার একটা বাজার আছে। গত শতাব্দীর আশি ও নব্বইয়ের দশকে এ পণ্যের এক সোনালি সময় গেছে। সে সময়ও এসএসের আদর্শিক দিক বাদ দিয়ে মুজিব সরকারের আমলে তাঁর খুনের অংশটুকু নিয়ে মামলা-মোকদ্দমা চালুর কথা বলে উল্টোধারার রাজনীতির অনেকে নিজেদের ভারতবিরোধী ভাবমূর্তি শক্ত-পোক্ত করতে নেমেছিলেন।
১৯৯১-পরবর্তী পার্লামেন্টেও সে রকম আলোচনা দেখা গেছে।

এরপর অনেক বছর এ খাতে খরা গেলেও এখন আবার মরা গাঙে পানি আসছে। ঠিক এই সময় এসএসের উদ্ধৃতি আর ছবির কদর বাড়ছে।
এ রকম বাস্তবতায় স্বভাবত এ প্রশ্নও ওঠে, ভারত বিষয়ে সিরাজ সিকদারের অবস্থান কী ছিল? কী পদ্ধতিতে তিনি এই প্রশ্নের সুরাহা চাইছিলেন? যারা এখন এসএসকে নিজেদের রাজনীতির পণ্য বানাতে মরিয়া চেষ্টা করছেন, তাদের সঙ্গে এসএসের রাজনীতির মিল-অমিলই বা কতটা?
এ রকম প্রশ্নের উত্তর খোঁজার ন্যূনতম নির্ভরযোগ্য উপায় হলো এসএসের লেখালেখির দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং তাঁর দলের ইতিহাস জানা-বোঝা। ২০১৪ সালে ঢাকার একটা প্রকাশনী থেকে তাঁর রাজনৈতিক লেখার একটা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ‘সিরাজ সিকদার-এর নির্বাচিত রাজনৈতিক রচনাবলী’ নামে। সেখানে তাঁর রাজনৈতিক ভাবনার অনেক চুম্বক কথা আছে। তাঁর দলের পত্রিকাগুলোর পুরোনো কপিতেও যে কেউ সেসবের ছাপ পাবেন।

বাংলাদেশ ও ‘ছয় পাহাড়ের দালাল’
যারা সত্তর-আশির দশকে সর্বহারা পার্টির রাজনৈতিক সাহিত্য পড়েছেন বা এসএসের লেখাজোখা দেখেছেন তারা জানবেন, তিনি বাংলাদেশের সামনে ছয় ধরনের শত্রু বা ছয়টি দ্বন্দ্ব ও চ্যালেঞ্জ দেখতেন। যাকে তিনি বলতেন ‘ছয় পাহাড়ের দালাল’। এ রকম ‘দালাল’দের একটাকে তিনি বলতেন ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ। বাংলাদেশের প্রতি ভারতীয় শাসকদের মনোভাবকে তিনি ‘সম্প্রসারণবাদী’ মনোভাব হিসেবে চিহ্নিত করতেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এবং তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়নের বাংলাদেশমুখী ভূমিকাকেও তিনি সমজাতীয় দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখতেন। এখানকার সামন্ততন্ত্র ও পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং বামপন্থি নামধারী সংশোধনবাদীদেরও ‘পাহাড়’ হিসেবে উল্লেখ করতেন তিনি। এভাবে তিনি পরিবর্তনবাদী রাজনীতিকে ছয়টি পাহাড় ডিঙানোর চ্যালেঞ্জের কথা শুনিয়েছেন। প্রশ্ন হলো, এসএসকে ব্যবহার করতে আগ্রহী সমকালীন তরুণরা কি আদৌ পুঁজিতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র, বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ইত্যাদি মোকাবিলা করতে আগ্রহী? সেই আগ্রহের চর্চা কোথায়? কেবল একটা পাহাড়ের আলাপে কেন সীমিত
এই রাজনীতি?

ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ নিয়ে আলোচনার সময় এসএস কোথাও এটা হিন্দু-মুসলমান সমস্যা আকারে দেখেছেন বা এটাকে ভারতের জনগণের সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের সংঘাত আকারে দেখেছেন, এমন নজির নেই। তাঁর অভিমত ছিল, স্বাধীনতা যুদ্ধকালে ‘পাকিস্তানি ফ্যাসিস্ট’দের প্রতিরোধের মতোই স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ মোকাবিলায় হিন্দু-মুসলমান ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের ঐক্য দরকার (পূর্বোক্ত, পৃ. ৮৪)।
এ প্রসঙ্গে যে কেউ তাঁর ১৯৭২ সালের বিখ্যাত লেখা ‘পূর্ববাংলার বীর জনগণ’ পড়ে দেখতে পারেন। ভারতীয় শাসকদের সম্প্রসারণবাদী মনোভাব আর ‘ভারত বিরোধিতা’ বা ভারতবাসীদের বিরোধিতা এক কথা নয়। এক ধরনের রাজনীতিও নয়।

এসএস বাংলাদেশে আমূল পরিবর্তনবাদী সংগ্রামের সামনে যে ছয়টি পাহাড়সম শত্রুর কথা বলেছেন, সেগুলো চিহ্নিত করেছিলেন রাজনৈতিক-অর্থনীতির বাস্তবতা থেকে; কোনো ধরনের ধর্মভিত্তিক লোকরঞ্জনবাদী সাংস্কৃতিক যুদ্ধের জায়গায় দাঁড়িয়ে নয়। সম্প্রতি যারা নিজেদের কর্মতৎপরতাকে ন্যায্যতা দিতে এসএসকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন, তারা সেটা যদি উগ্র ধর্মভিত্তিক জাতিবাদী উত্তেজনা থেকে করে থাকেন তাহলে এসএসের সঙ্গে তার কোনো মিলের জায়গা নেই। আপাতত যা দেখা যাচ্ছে, নবীন এই এসএস অনুসারীরা যতটা ভারত নিয়ে উচ্চকিত, ঠিক ততটা সরব নন যুক্তরাষ্ট্র ও গণচীনের বাংলাদেশকেন্দ্রিক বিগত বছরগুলোর ভূমিকায়।

অনেকে হয়তো জানেন, মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী এবং মুক্তিযুদ্ধের পর রক্ষীবাহিনীর আগে ১৯৬৭-৬৮ সালে এসএস ও তাঁর সহযোগীরা প্রথম আক্রান্ত হন তখনকার বেসামরিক দক্ষিণপন্থিদের দ্বারাই। সে সময় ঢাকার মগবাজারে তরুণ এসএসদের পাঠচক্রের অফিসটিতে আক্রমণ চালানো হয়েছিল। আক্রমণকারী এসব শক্তির সঙ্গে এসএসের চিন্তার ফারাক ছিল এই যে, তিনি মনে করতেন গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লড়াই সফল হতে পারে সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে এবং শ্রমিক-কৃষকের মৈত্রী নিশ্চিত করে। কিন্তু এ সময়ের এসএসের কোটেশন ব্যবহারকারীরা এবং তাদের সাংগঠনিক ধরন সম্পূর্ণরূপে শহুরে পেটি-বুর্জোয়া স্বার্থ তাড়িত। শ্রেণিভিত্তির বদলে তাদের সাংগঠনিক ধরন মূলত পপুলিস্ট। যেহেতু গত ১৫ বছর বাংলাদেশে ভারতের শাসকদের আধিপত্যধর্মী ভূমিকায় এখানকার জনগণ বিরক্ত, ক্ষুব্ধ, অসন্তুষ্ট; সে কারণে এখন ভারত-বিরোধিতার পণ্যায়নে এসএসের প্রয়োজন পড়েছে। সেটা করা হচ্ছে তাঁর রাজনীতির মূল অংশ বাদ দিয়ে।

সিরাজ সিকদারের দৃষ্টিতে ‘ভারতীয় আধিপত্যবাদ’ 
একালে সমাজ বদলে সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বদায়ী ভূমিকা, এই শ্রেণির পার্টিরূপী নির্ধারক ভূমিকা, শ্রমিক-কৃষকের প্রয়োজনীয় সক্রিয় মৈত্রী এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাজার দখলভিত্তিক ঠান্ডাযুদ্ধের আগ্রাসী ধরনকে একদম আড়াল করে কেবল ভারতকে একটা বিশেষ ধর্মীয় মোড়কে হাজির করার সঙ্গে এসএসকে জড়িয়ে নেওয়া কতটা রাজনৈতিক কৌশল আর কতটা অপকৌশল,
সে বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্ক তুলেছেন কেউ কেউ।

এসএসের কাছে ভারত প্রশ্ন ছিল সেখানকার শাসকশ্রেণির সঙ্গে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার নিপীড়িত শ্রেণির দ্বন্দ্ব। ভারতকে মূল্যায়ন করতেন তিনি শ্রেণি চোখে। ভারতের ভেতরকার শ্রেণিযুদ্ধের প্রতিও ছিল তাঁর আগ্রহ, মনোযোগ ও যোগাযোগ। এসএসদের রাজনীতির মিত্ররাও সেখানকার শ্রেণিযুদ্ধে ছিলেন। হরেদরে ভারত বিরোধিতার রাজনীতি বা ভারতীয় আধিপত্যবাদকে হিন্দু-ভারতের সঙ্গে মুসলমান-বাংলাদেশের দ্বন্দ্ব আকারে কখনও দেখেননি এসএস। পপুলিস্ট এই সমীকরণে তাঁকে ব্যবহার চেষ্টার বিপদ হলো, এতে নবীন প্রজন্ম ৫১ বছর আগে খুন হওয়া একজন রাজনীতিবিদের চিন্তা ও তৎপরতার প্রধান প্রধান অংশ সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনে তাঁকে সংকীর্ণ এক পরিচয়ে উপলব্ধি করবে, যা হতে পারে এসএসের আরেক দফা রাজনৈতিক হত্যাতুল্য।

এসএসের রাজনৈতিক সাহিত্যের বড় এক অংশ স্বাধীনতা যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের শাসক দলের ভারতমুখী পরাধীনতাতুল্য নতজানু নীতির আলোকে লিখিত। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরেও এসএস লিখছেন (পূর্বোক্ত, পৃ. ১৭৩-৭৫), ভারত হলো দক্ষিণ এশিয়ায় ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশম্যান’। এসব পর্যবেক্ষণের পর পাঁচ দশক পেরিয়ে গেছে। এর মাঝে এ অঞ্চলের ভূ-রাজনৈতিক বিন্যাসে অনেক যোগ-বিয়োগ হয়েছে। আজকের দিনে বাংলাদেশে একই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে বসলে ভারতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, চীন, পাকিস্তানসহ আরও অনেক দেশের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ভূমিকা বিবেচনায় নিতে হবে।
আজও বাংলাদেশ অনেক বিদেশি মুরব্বির কাছে নতজানু। অনেক করপোরেট শক্তির স্বার্থের কাছে জিম্মি। এ রকম শক্তিগুলোর সঙ্গে লেপটে থেকে, তাদের যাবতীয় ইচ্ছা-অনিচ্ছা বাস্তবায়নের পথ মসৃণ করে দিয়ে, সামন্তীয় মূল্যবোধ এবং মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী প্রতিক্রিয়াশীলদের সঙ্গে মৈত্রী করে সে-ই রাজনীতিকে ভারত বিরোধিতার মোড়কে হাজির করে, ওই মোড়কের ওপর এসএসের ছবি বসিয়ে দেওয়া হাস্যকর। ১৯৬৮ সালে নিজের প্রথম থিসিসে এসএস ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রথম নীতি’ হিসেবে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের কথাই বলছিলেন। তাদের মোটেই সহায়ক শক্তি মনে করেননি।

জাতিবাদ বনাম আন্তর্জাতিকতাবাদ
বাংলাদেশে অনেক রাজনৈতিক গোষ্ঠী ইদানীং উত্তর-পূর্ব ভারতীয় রাজ্যগুলো নিয়ে মতামত দিচ্ছেন। মনে হচ্ছে, এসব রাজ্যে বসবাসকারী নাগা, মিজো, খাসি, মৈতৈ, কুকি, তিপরা ইত্যাদি জাতির সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির ব্যাপারে খুব আগ্রহী তারা। কিন্তু একই গোষ্ঠী দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, গারো, রাজবংশীদের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, সাংবিধানিক স্বীকৃতির ব্যাপারে বৈরী এবং তাদের বসবাসের অঞ্চলগুলোতে যত পারা যায় সমতলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠদের পুনর্বাসনের পক্ষে। এ রকম মহলও ইদানীং এসএসের কথা বলছে আলাপ-আলোচনায়। অথচ জাতিগত সমস্যার সমাধানে তাঁর অবস্থান ছিল ভিন্ন।

রাজনৈতিক কাজের শুরুতে চট্টগ্রাম, বান্দরবানসহ বিভিন্ন স্থানে কোণঠাসা জনগোষ্ঠীর মাঝেই সংগঠন করতে গিয়েছিলেন এসএস। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিপ্লবে এসব জাতিসত্তার সমমর্যাদায় অংশগ্রহণ ছিল তাঁর রাজনীতির গোড়ার কথা। ২০২৪ সালে প্রকাশিত (আদর্শ প্রকাশনী) ‘পাহাড়ের লাল আখ্যান’ বইটিতে যে কেউ এ বিষয়ে বিস্তারিত দেখতে পাবেন।

প্রসঙ্গক্রমে এও বলতে হয়, সর্বহারা পার্টির নেতৃত্ব পর্যায়ে অনেক অ-বাঙালি ছিলেন। কোথাও কোনো আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করা বা এক দেশকে অপর দেশের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর পপুলিস্ট রাজনীতি নয়; বরং সকল জাতিসত্তার মানুষের সম্মিলিত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করত এসএসের দল এবং জোর দিয়েছিল আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে নিম্নবর্গের শ্রেণিমৈত্রীর ওপর। বাংলাদেশের পার্বত্য জাতিগুলোর মুক্তির প্রশ্নে তিনি যে জনসংহতি সমিতির সঙ্গে তীব্র মতাদর্শিক বিরোধিতায় লিপ্ত ছিলেন, সেটাও হয়তো এখন অনেকের অজানা। তাঁর ওই মতাদর্শিক সংগ্রামের কারণ হলো, এসএস আন্তর্জাতিকতাবাদী ছিলেন; জাতীয়তাবাদী নন; ধর্মীয় পুনর্জাগরণবাদীও নন। ধর্মীয় মেরূকরণ বা বিচ্ছিন্নতায় নয়; জাতিগত নিপীড়নের রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সমাধানে দক্ষিণ এশিয়ার মুক্তি ঘটবে বলে মনে করতে তিনি। ফলে তাঁর ছবির নিচে প্রতিক্রিয়াশীল সংখ্যাগরিষ্ঠবাদী রাজনীতি দাঁড় করানোর কোনো সুযোগ নেই। সেটা হবে তাঁকে শারীরিকভাবে হত্যার ধরনে আদর্শিকভাবে খুন করার মতো অপরাধতুল্য ব্যাপার। যে রকম অপরাধ ছিল বিগত সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী স্বৈরতন্ত্র কায়েম।

আলতাফ পারভেজ: ইতিহাস বিষয়ে গবেষক

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com