সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:২০ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

বিয়ের শাড়ি বেনারসি

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

বিয়েতে বেনারসি পরার স্বপ্ন অনেক মেয়ের। সেই আদিকাল থেকে নারীর কাছে এ শাড়ির কদর অনেক। ধারণা করা হয়–‘পদ্মপুরাণ’ কাব্যের কালজয়ী চরিত্র বেহুলা তাঁর বিয়েতে বেনারসি বা এই জাতীয় কোনো অভিজাত শাড়ি পরেছিলেন। কেননা ‘পদ্মপুরাণ’-এ উল্লেখ আছে–বেহুলা গায়ে জড়িয়েছিলেন ‘নেতের বসন’। এই নেতের বসন বলতে মূলত সে সময়ের অভিজাত রেশম শাড়িকে বোঝানো হয়েছে। সেটি হতে পারে জামদানি কিংবা সিল্ক সুতায় বোনা বেনারসি।

বেনারসির কথা কথাসাহিত্যে, কাব্যে, সিনেমায় উল্লেখ আছে। সমরেশ মজুমদার তাঁর সাতকাহন উপন্যাসে লিখেছেন, ‘ভালোবাসা হলো বেনারসি শাড়ির মতো, ন্যাপথালিন দিয়ে যত্ন করে আলমারিতে তুলে রাখতে হয়, তাকে আটপৌরে ব্যবহার করলেই সব শেষ।’ আবার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘শিল্পী’ ছোটগল্পে উল্লেখ করেছেন, ‘বাবুদের বাপের আমলে বেনারসি বুনে দেবার বায়না পেয়েছিল মদনের বাপ।’ এই উক্তিটি বেনারসি শাড়ির ঐতিহ্য ও তাঁতি সম্প্রদায়ের জীবনযাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা বেনারসির গুরুত্ব তুলে ধরে। সত্যজিৎ রায়ের ‘সমাপ্তি’ সিনেমায় বেনারসি শাড়িতে সজ্জিত অপর্ণা সেনের দৃশ্যও বিয়ে ও শুভ অনুষ্ঠানের সঙ্গে বেনারসির সখ্যের প্রতীক হয়ে আছে।

যুগে যুগে, কালে কালে বিয়ের পোশাক-আশাকে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রথা ভেঙে কনেরা পরছেন ভিন্ন পোশাক। অমলিন বেনারসির গুরুত্ব এখনও ঐতিহ্যবাহী সাজে সাজতে পছন্দ করেন অনেক কনে। তাই পছন্দের শীর্ষে রাখেন প্রিয় বেনারসি।

ইরান থেকে ভারতের বেনারসে
বেনারসি নাম শুনলেই মনে হয় এর জন্ম ভারতের বেনারসে। ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। বেনারসি বুননের শাড়ি প্রথম ইরানে তৈরি হয়েছিল। এরপর সেখান থেকে ভারতে এ শাড়ির দেখা মেলে। মোগল সাম্রাজ্যের অধিপতি বাদশাহ জাহাঙ্গীরের স্ত্রী নূরজাহানের ইরানি শাড়ির প্রীতি ছিল। তিনি ভালোবেসে বেনারসি বুননের শাড়ি পরতেন। এরপর তাঁর ফেলে দেওয়া শাড়ি পরতেন দাসীরা।

প্রায় ৫০০ বছর আগে ভারতীয় উপমহাদেশে বেনারসির যাত্রা শুরু হয়। সেসব শাড়ি ইরানিদের শাড়ি থেকে অনেক আনকোরা ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশের তাঁতিরা তাদের নিজেদের মতো করে অলংকরণ শুরু করেন। বেনারসির জমিন ও পাড়ে–দুই জায়গাতেই কলকা মোটিফের দেখা মেলে। ফুলেল নকশাও বেনারসি শাড়িতে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করা হয়। আগে জমিন ও পাড়ে নকশা ফুটিয়ে তোলা হতো জরি ব্যবহার করে। সেই ধারা এখনও আছে। মোগল আমলে রুপার তারে স্বর্ণের পাতলা রাংতা মুড়ে নিয়ে তৈরি করা হতো জরি। এখন তা অবশ্য অনেকটাই কৃত্রিম উপাদানের দখলে।

বাংলায় বেনারসির যাত্রা
বেনারসির যাত্রা শুরু হয় মোগল সাম্রাজ্য থেকে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে রেশম ও অলংকরণের বেশির ভাগ উপাদানের আকস্মিক দাম বাড়ার কারণে এ শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়ে। অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে মুক্তির আশায় ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁতিরা ছড়িয়ে পড়েন। ব্রিটিশ শাসনামলে মুসলিম তাঁতিদের কিছু অংশ পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমানে বাংলাদেশ) এবং কিছু অংশ পশ্চিম পাকিস্তানে নিবাস গড়ে তোলেন। প্রথমে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার নারিন্দা, নবাবগঞ্জ, সিদ্দিক বাজার, ইসলামপুর, বেচারাম দেউড়ি, দক্ষিণ মৈশুন্ডি ও নবাবপুরে তাঁতিরা হস্ততাঁত স্থাপন করেন। পরে শব্দহীন পরিবেশের খোঁজ করে মিরপুর-১০ এবং মিরপুর ১-এ এসে থিতু হন তারা। এরপর মিরপুর ১০ থেকে ১২ জুড়ে গড়ে ওঠে বেনারসিপল্লি; যা এখন মিরপুর-১৪ পর্যন্ত বিস্তৃত। সেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁতিরা বসবাস করছেন এবং বেনারসি শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বেনারসিপল্লির তাঁতশিল্পী মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘মিরপুর বেনারসিপল্লিতে শাড়ি বুনন করা হয় হস্ততাঁতের মাধ্যমে। একটি শাড়ি তৈরিতে অন্তত দুই মাস লাগে, আবার কখনও কখনও নকশার ভিন্নতার কারণে ছয় মাস প্রয়োজন হয়।’

তিনি দুঃখ প্রকাশ করে জানান, এখন অনেক নকল বেনারসি পাওয়া যায়। যেগুলো কৃত্রিম সুতা দিয়ে তৈরি এবং নিম্নমানের। নকলের ভিড়ে আসল অর্থাৎ দেশীয় বেনারসি পরার চল ফেরা এবং দেশীয় বেনারসি কেনার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
মিরপুরের তাঁতি দিয়ে নিজস্ব ডিজাইনের বেনারসি শাড়ি বানিয়ে বিপণন করে ‘দ্য মসলিন’। দ্য মসলিনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও তাসনুভা ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলার সংরক্ষণ, প্রচার এবং এর বিশ্বব্যাপী প্রসারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে দ্য মসলিন। বেনারসি শাড়ি আমাদের ঐতিহ্যের প্রতীক। তাই বেনারসি কাতান শাড়িই বাংলাদেশের বিয়েতে প্রাধান্য পেয়ে থাকে এর সূক্ষ্ম ও দক্ষ কারিগরির জন্য। বিয়ের বেনারসি শাড়িতে ব্যবহৃত আসল সোনা, রুপা, জরি ও সিল্কের গুণমান, এর দাম ও মেয়াদ ব্যবহার উপযোগিতা নির্ধারণ করে।’

তিনি বলেন, ‘অনেকে ভারতীয় মেশিনে বোনা শাড়ি এনে দেশের বাজারে দেদার বিক্রি করছেন। কম দামে এনে বেশি দামে বিক্রি করছেন। এদিকে আমাদের বয়নশিল্পীদের ঠকাচ্ছেন মহাজনরা। মেশিনে যারা বেনারসি বুনেন তারা এ শাড়িকে মূল্যায়ন করেন না। বরং হাতে বোনা শাড়িই আমাদের ঐতিহ্য। দ্য মসলিন তাঁতিদের যথাযথ মূল্যায়ন করে এবং শাড়িকে যতটা সম্ভব বিদেশি ও দেশি ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর।’

দরদাম
বেনারসি শাড়ির দাম, এর ডিজাইন, ম্যাটেরিয়াল ও গুণগত মানের ওপর নির্ভরশীল। মিরপুর বেনারসিপল্লিতে ৫ হাজার থেকে ৪০-৫০ হাজার টাকায়ও শাড়ি কেনা যাবে। দ্য মসলিনে মোটামুটি ৮ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকার মধ্যে বিভিন্ন মানের বেনারসি কাতান পাওয়া যায়।

বিয়ের সাজ 
বেহুলা তাঁর বিয়েতে সেজেছেন মোহনীয় সাজে। তিনি অভ্রের চিরুনি (অভ্র হলো এক ধরনের প্রাকৃতিক, উজ্জ্বল ও স্বচ্ছ খনিজপদার্থ, যা পাতলা পাতলা স্তরে বিভক্ত হয় এবং এর প্রধান ব্যবহার বৈদ্যুতিক অন্তরক ও প্রসাধন সামগ্রী হিসেবে) দিয়ে চুল আঁচড়িয়ে নাকে গজমতির নোলক আর পায়ে মল পরেছিলেন। এখনকার কনেরাও বিয়েতে সবচেয়ে সুন্দরভাবে সাজেন। রাজিয়া’স মেকওভারের স্বত্বাধিকারী ও রূপবিশেষজ্ঞ রাজিয়া সুলতানা জানান, এখনও অনেক কনে ঐতিহ্যবাহী শাড়িতে সাজতে পছন্দ করেন। সেটি হতে পারে কাতান বা বেনারসি শাড়ি। এর সঙ্গে চোখভরা কাজল, কপার ব্ল্যাক টোনের শেড ব্যবহার করা হয়। সঙ্গে গ্লিটারস, স্কিনটোনের বেজ, লাইট কপার ব্রাউন টোনের ব্লাশন, সঙ্গে লাল বা মেরুন লিপস্টিক সাজে পূর্ণতা আনে।

তিনি জানান, মাথায় টিকলি বা টায়রা দুটোই মানায়। নাকে নথ, কানে বড় দুল, গলায় চোকারসহ সীতাহার ভালো মানায়। চুলের সাজের ক্ষেত্রে এদিন মাঝে সিঁথি করে খোঁপা করলেই ভালো লাগে। বেলি ফুলের মালা বা লাল গোলাপ দিয়ে খোঁপা সাজালে গর্জিয়াস লুক পাওয়া যায়।
বউ ভাতের সাজে অনেকে লেহেঙ্গা, গাউন পরেন। আবার অনেকে ম্যাজেন্টা বা পার্পেল বেনারসি কিংবা কাতান শাড়ি বেছে নেন। বউ ভাতের সাজে কেউ কেউ অনেকটা সিলভার টোন রাখতে ভালোবাসেন। সে ক্ষেত্রে গহনা ডায়মন্ড কাট, কুন্দন, পুঁতি বা মেটালের হলে ভালো মানায়।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com