প্রশ্নই উঠতে পারে, মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও কেন আবার আলাদাভাবে নারীর মানবাধিকারের বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর হাজার বছর ধরে নারীর প্রতি বৈষম্য আর নারীর অধস্তনতার ইতিহাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। প্রতিটি দেশের রয়েছে নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ধর্মীয় সংস্কার, রীতিনীতি, আচার ব্যবহার।
মানবাধিকার শব্দটির মধ্যেই সুপ্ত রয়েছে এই সত্য যে দুনিয়াজুড়ে এখনো অগণিত মানুষ অধিকারহীন জীবনযাপন করছে, আর যখন নারীর মানবাধিকার প্রসঙ্গটি তোলা হয়, তখন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে যে অধিকারহীনদের মধ্যে নারীরা আরো অধিকারহীন। নারীর মানবাধিকার এবং সমতা বিকাশে জাতিসংঘের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নারীর প্রতি চরম বৈষম্য এখনো বিরাজ করছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে ব্যক্তিগত অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার অধিকার কিন্তু পারিবারিক ক্ষেত্রে নারী নির্যাতনকে ধারণ করতে পারেনি।
এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৬, ২৭, ২৯ এবং ৬৫ (৩) ধারায় নারীর সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অথচ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও মানসিকতার কারণে পেশাগত দিক থেকেও নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে নারীরা। পুরুষতান্ত্রিক নিয়মের শিকলে বাঁধা হয় তেমনি কর্মক্ষেত্রেও পুরুষতান্ত্রিক বিভিন্ন সংস্কার নারীদের জন্য অন্তরায় হয়ে রয়েছে।
এটা আমরা জানি যে দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান পোশাকশিল্পের। এই শিল্পে কর্মরত বেশির ভাগ শ্রমিকই নারী। অথচ তারাই বেশি অবহেলিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক ও অমানবিক আচরণ করা হয়। নির্মাণ, চাতাল, মৎস্যসহ অনেক অসংগঠিত সেক্টরে নারী শ্রমিকরা একই রকম শ্রম দেওয়ার পরও পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় নারী শ্রমিকদের বেতন বা মজুরি কম। মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা নেই অনেক কারখানায়। অধিকাংশ পোশাক তৈরির কারখানাসহ অনেক সেক্টরে কাজের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর। শুধু নারী হওয়ার জন্য কর্মক্ষেত্রে শ্রমজীবী নারীদের নানা ধরনের বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়। নিজের ঘর বা কর্মক্ষেত্র কোনো জায়গায় নিরাপদ নয় নারী। যৌন হয়রানিসহ নানা নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাদের। এগুলো সবই নারী অধিকার ও মর্যাদার পরিপন্থী এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা যথেষ্ট গণতান্ত্রিক না হওয়ায় নারীর মানবাধিকার কিংবা নারী শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হচ্ছে না।
২০২৩ সালে কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য নিয়ে কাজ করে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লডিয়া গোল্ডিন। ২০০ বছর ধরে নারীদের উপার্জন এবং শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের প্রথম ব্যাপক বিবরণ প্রদান করেছেন ক্লডিয়া গোল্ডিন। কাজ এক। পরিশ্রমও এক। মানসিক-শারীরিক গঠনও এক। কিন্তু পার্থক্য বেতনে। নিজের কাজের মাধ্যমে নারী শক্তির অধিকার আদায়ে কাজ করে গেছেন এই মহীয়সী নারী। এ ছাড়া সমাজবদলের কারণও উঠে এসেছে তাঁর গবেষণায়। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ এবং তার উপার্জনের সম্ভাবনা বোঝা সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নারীদের অংশগ্রহণ যদি কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে শ্রমবাজারে আমরা দক্ষতা হারাব। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার সম্পর্কে বুঝতে সহায়ক করেছে তাঁর গবেষণা।
নারীর অধিকার শুধু নারী সম্প্রদায়ের জন্য নয়, এটি মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার এবং সমতার জন্য একটি বৃহত্তর আন্দোলন। তাই পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে নারীর সমান অংশগ্রহণ, মজুরি ও পেনশনে সমতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। নারীদের শ্রমকে সঠিক মূল্যায়ন না করলে সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় নারী শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র