সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৩৭ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

বিশ্ব মানবাধিকার দিবস ও নারীর মানবাধিকার

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ২২ বার পড়া হয়েছে
আজ বিশ্ব মানবাধিকার দিবস। মানবাধিকারের মূলকথা হলো, একজন ব্যক্তি মানুষ হিসেবে সর্বজনীন সমমূল্য এবং মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য। এই সর্বজনীনতাই হচ্ছে মানবাধিকার সনদের মূলমন্ত্র। যে জন্য মানবাধিকার এবং তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য।

কিন্তু মানবাধিকারের এই ঘোষণা এবং বাস্তবতার মধ্যে দুস্তর ব্যবধান রয়েছে। সে জন্যই মানবাধিকার বিষয়টি নির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার তাগিদ অনুভব হচ্ছে। 

প্রশ্নই উঠতে পারে, মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও কেন আবার আলাদাভাবে নারীর মানবাধিকারের বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর হাজার বছর ধরে নারীর প্রতি বৈষম্য আর নারীর অধস্তনতার ইতিহাসের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। প্রতিটি দেশের রয়েছে নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ধর্মীয় সংস্কার, রীতিনীতি, আচার ব্যবহার।

এই আর্থ-সামাজিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করেই প্রতিটি দেশের আইন-কানুন, সামাজিক কাঠামো, শাসনব্যবস্থা, সংবিধান ইত্যাদি গড়ে ওঠে। যার মধ্যে এই সমাজের নারী-পুরুষ সম্পর্কের প্রচলিত ও অনুমোদিত আচরণবিধির প্রতিফলন ঘটে। 

মানবাধিকার শব্দটির মধ্যেই সুপ্ত রয়েছে এই সত্য যে দুনিয়াজুড়ে এখনো অগণিত মানুষ অধিকারহীন জীবনযাপন করছে, আর যখন নারীর মানবাধিকার প্রসঙ্গটি তোলা হয়, তখন আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে যে অধিকারহীনদের মধ্যে নারীরা আরো অধিকারহীন। নারীর মানবাধিকার এবং সমতা বিকাশে জাতিসংঘের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নারীর প্রতি চরম বৈষম্য এখনো বিরাজ করছে।

সিডও সনদে বলা হয়েছে, বিরাজমান বৈষম্য সম-অধিকার ও সম্মানের নীতিমালাকে লঙ্ঘন করে। এ ছাড়া সিডও লিঙ্গভিত্তিক নির্যাতন থেকে মুক্তিলাভের ওপর বিশেষ জোর দেয়। বর্তমান মানবাধিকার কাঠামোসমূহ মূলত পুরুষশাসিত সমাজে পুরুষের অভিজ্ঞতাকেই প্রতিফলিত করে। তারা প্রায় এই সত্যকে  উপেক্ষা করে যে বিশ্বব্যাপী অগণিত নারী তাদের প্রাত্যহিক জীবনে নির্যাতনকে প্রত্যক্ষ করছে কিংবা নির্যাতনের হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে ব্যক্তিগত অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়ার অধিকার কিন্তু পারিবারিক ক্ষেত্রে নারী নির্যাতনকে ধারণ করতে পারেনি।

অন্যান্য আইনও এই বিষয়টিকে যথাযথভাবে শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেকের কাছে পারিবারিক ক্ষেত্রে নারী নির্যাতন বা নিপীড়ন সাংস্কৃতিকভাবে গ্রহণযোগ্য। আবার কেউ কেউ একে প্রচলিত সমাজব্যবস্থায় অনিবার্য বলে মনে করে। এমনকি নিপীড়নের সংজ্ঞার মধ্যে আবার যৌন নিপীড়নকে ধরা হয় না। অনেক দেশেই এখনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে এ ধরনের নিপীড়নকে স্বীকার করা হয় না। অর্থনৈতিক, সামাজিক অথবা রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা কিংবা আন্তর্জাতিক সংঘাত এবং গৃহযুদ্ধের সময় যৌন নির্যাতনকে নিপীড়নের সংজ্ঞার মধ্যে যুক্ত করা হয় না। এ ক্ষেত্রে নারী নির্যাতনের ক্রমবর্ধমান ঘটনা আপাতদৃষ্টিতে আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও তা কিন্তু খুবই পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়। অথচ এই বাস্তবতা সব সময়ই এড়িয়ে যাওয়া হয়। 

এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকদের দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৬, ২৭, ২৯ এবং ৬৫ (৩) ধারায় নারীর সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। অথচ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও মানসিকতার কারণে পেশাগত দিক থেকেও নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছে নারীরা। পুরুষতান্ত্রিক নিয়মের শিকলে বাঁধা হয় তেমনি কর্মক্ষেত্রেও পুরুষতান্ত্রিক বিভিন্ন সংস্কার নারীদের জন্য অন্তরায় হয়ে রয়েছে।

এটা আমরা জানি যে দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান পোশাকশিল্পের। এই শিল্পে কর্মরত বেশির ভাগ শ্রমিকই নারী। অথচ তারাই বেশি অবহেলিত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক ও অমানবিক আচরণ করা হয়। নির্মাণ, চাতাল, মৎস্যসহ অনেক অসংগঠিত সেক্টরে নারী শ্রমিকরা একই রকম শ্রম দেওয়ার পরও পুরুষ শ্রমিকদের তুলনায় নারী শ্রমিকদের বেতন বা মজুরি কম। মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা নেই অনেক কারখানায়। অধিকাংশ পোশাক তৈরির কারখানাসহ অনেক সেক্টরে কাজের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর। শুধু নারী হওয়ার জন্য কর্মক্ষেত্রে শ্রমজীবী নারীদের নানা ধরনের বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়। নিজের ঘর বা কর্মক্ষেত্র কোনো জায়গায় নিরাপদ নয় নারী। যৌন হয়রানিসহ নানা নির্যাতনের শিকার হতে হয় তাদের। এগুলো সবই নারী অধিকার ও মর্যাদার পরিপন্থী এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা যথেষ্ট গণতান্ত্রিক না হওয়ায় নারীর মানবাধিকার কিংবা নারী শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হচ্ছে না।

২০২৩ সালে কর্মক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য নিয়ে কাজ করে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লডিয়া গোল্ডিন। ২০০ বছর ধরে নারীদের উপার্জন এবং শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের প্রথম ব্যাপক বিবরণ প্রদান করেছেন ক্লডিয়া গোল্ডিন। কাজ এক। পরিশ্রমও এক। মানসিক-শারীরিক গঠনও এক। কিন্তু পার্থক্য বেতনে। নিজের কাজের মাধ্যমে নারী শক্তির অধিকার আদায়ে কাজ করে গেছেন এই মহীয়সী নারী। এ ছাড়া সমাজবদলের কারণও উঠে এসেছে তাঁর গবেষণায়। শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ এবং তার উপার্জনের সম্ভাবনা বোঝা সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নারীদের অংশগ্রহণ যদি কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে শ্রমবাজারে আমরা দক্ষতা হারাব। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার সম্পর্কে বুঝতে সহায়ক করেছে তাঁর গবেষণা।

নারীর অধিকার শুধু নারী সম্প্রদায়ের জন্য নয়, এটি মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার এবং সমতার জন্য একটি বৃহত্তর আন্দোলন। তাই পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে নারীর সমান অংশগ্রহণ, মজুরি ও পেনশনে সমতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। নারীদের শ্রমকে সঠিক মূল্যায়ন না করলে সমাজের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় নারী শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com