দেশের কৃষিকে টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে মৌলিক ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণের সুপারিশ করেছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা। তাঁরা বলছেন, শুধু নতুন জাত উদ্ভাবনই যথেষ্ট নয়, বরং সেই জাতগুলো যেন সঠিক সময়ে কৃষকের হাতে পৌঁছায় এবং সংগ্রহ-উত্তর পর্যায়ে ফসলের ক্ষতি কমে আসে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বাড়তি চাপ মোকাবেলা, ফলন বৃদ্ধি, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্রুত কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়া—এই চারটিকে গবেষণা অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বারির উদ্ভাবিত বেশ কিছু সফল জাত সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যায় কৃষকের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। তাই কার্যকর বীজ সরবরাহ চেইন গড়ে তোলাকে অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে অভ্যন্তরীণ গবেষণা পর্যালোচনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন কর্মশালায় অংশ নেওয়া গবেষকদের মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে। প্রতিবেদনে আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে বারি উদ্ভাবিত লালশাক-১, মুলা-১ ও ২, মিষ্টিকুমড়া-১, হাইব্রিড টমেটো-৮সহ বিভিন্ন জনপ্রিয় জাতের বীজ দেশের প্রতিটি অঞ্চলে নির্ভরযোগ্যভাবে পৌঁছে যায়।
এতে শুধু কৃষকের আস্থাই বাড়াবে না, চাষাবাদের সাফল্যও নিশ্চিত করবে।
এর পাশাপাশি বারি টেকনোলজি ভিলেজে উদ্ভাবিত জাতগুলোর ওপর পাইলট উৎপাদন কর্মসূচি চালু করে সেসব প্রযুক্তি হাতে-কলমে কৃষকদের সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, জাতগুলো যেন দ্রুত গ্রামের পর গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এরই মধ্যে দেশে সাড়া জাগানো জাতগুলোর পরিচিতি ও বাজার সম্প্রসারণে গণমাধ্যমে প্রচার বাড়াতে হবে। কৃষকের চোখে যেন বারির উদ্ভাবনগুলো আরো দৃশ্যমান হয়, বাজারে যেন তাদের মর্যাদা আরো পোক্ত হয়।
জনপ্রিয় আম সূর্যপুরী ও হাঁড়িভাঙ্গা এ দুই জাতের সংকরায়ণ করে উচ্চ ফলনশীল ও রোগ সহনশীল নতুন জাত উদ্ভাবনের সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বারি আম ১১সহ কিছু হাইব্রিড ফলে ফাটল ও অপরিণত অবস্থায় ঝরে যাওয়ার হার বেড়েছে। এর সমাধানে দ্রুত কারণ নির্ণয় ও প্রযুক্তি উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তার কথা জানানো হয়। পাশাপাশি এমডি২ আনারস জাতকে দ্রুত অবমুক্ত করা এবং কাঁঠাল, চালতা ও নারকেলের নতুন হাইব্রিড জাত উদ্ভাবনকেও অগ্রাধিকারের পরামর্শ ওঠে। বহুমূল্য জিনগত সম্পদ রক্ষায় রায়খালী, পাহাড়তলী ও রামগড়ে ফিল্ড জিন ব্যাংক স্থাপনের প্রস্তাব কর্মশালায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাতক্ষীরাসহ উপকূল অঞ্চলে লবণাক্ততা সহনশীল বেগুন, টমেটো ও অন্যান্য সবজির জার্মপ্লাজম দ্রুত স্ক্রিনিং সম্পন্ন করতে হবে। বারি মিষ্টি মরিচ-২ এর পুরুত্ব কম হওয়ায় পরিবহনে ক্ষতি হচ্ছে। এ কারণে এর গুণগত মান উন্নয়নের পরামর্শ দেওয়া হয়। কন্দাল ফসল গবেষণায় আলুর স্কেব প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সাশ্রয়ী মূল্যের স্মার্ট সেচ প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে জোর দেওয়া হয়েছে। চরাঞ্চলে পানি ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তি প্রয়োগে আলাদা গবেষণা কর্মসূচি নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। নারকেলগাছে ওঠার যন্ত্রের নিরাপত্তা বাড়িয়ে কৃষকের ঝুঁকি কমানোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মতামতও তুলে ধরা হয়।