সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৩৮ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

দুই দশক পর পুরোনো রূপে পদ্মা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৬ বার পড়া হয়েছে

হেমন্ত প্রায় শেষ। শীত আসন্ন। এই সময় সাধারণত পদ্মায় পানি কমে যায়। এ বছর ততটা কমেনি। সেই পানিতে মাছ ধরছিলেন রাজশাহীর জেলে মিজানুর রহমান। মুখে হাসি লেগে আছে। তিনি বললেন, ‘আগে আমরা এক-দুমাস মাছ ধইরেছি। এব্যার ছ মাস থ্যাকি মাছ ধইরছি। ট্যাংরা, বোয়াল, আইড়, বাঘাআইড়, বাতাসি সব মাছই পাছি। নদীতে এখুনো ভালো পানি আছে। আরও দুমাস ভালো মাছ পাব।’

শুধু যে নদীতে পানি আছে তা না। প্রায় দেড় যুগ আগে রাজশাহী নগরীর আইবাঁধ থেকে তালাইমারি ফুলতলা ঘাট পর্যন্ত ৮ কিলোমিটারজুড়ে সৃষ্টি হয় বালুচর। এবারের বর্ষায় স্রোতে এই চরের ৮০ ভাগ পানিতে ভেসে গেছে। এতে করে দূরে সরে যাওয়া নদী এসেছে শহরের কাছে। শহররক্ষা বাঁধ ঘেঁষে এখন প্রবাহ। বন্ধুদের নিয়ে পদ্মাপারে বেড়াতে আসা যুবক সোহেল রানা সমকালকে বলেন, ‘আগে নদী দেখতে এসে চর দেখতাম, এ বছর নদী দেখছি।’

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুই দশক পর এবার স্বরূপে ফিরেছে পদ্মা নদী। দীর্ঘ সময় পানি থাকায় মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। দেখা গেছে কুমির। কৃষিকাজে সেচের পরিমাণ কমেছে। তবে অতিবৃষ্টি ও বন্যায় এবার বেড়েছে নদীভাঙন, ফসলহানি ও সাপের উপদ্রব। চলতি বছর প্রায় দেড় হাজার সাপেকাটা রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে।

হিমালয় থেকে গঙ্গা নামে উৎপন্ন নদীটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। রাজশাহী শহরের পাশ দিয়ে গোয়ালন্দ হয়ে চাঁদপুর পর্যন্ত পদ্মা নামে বয়ে গেছে।
গবেষকরা বলছেন, এ বছর উত্তরপ্রদেশে দুইবার বন্যা হয়েছে। যে অংশে গঙ্গা বা পদ্মা, সে অংশে প্রচুর বৃষ্টি। গত বছর জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুই মাস নদীতে পানি ছিল। এবার জুলাই থেকে নভেম্বর মাসেও পানির প্রবাহ আছে। এতে করে নদীর আয়তন বেড়েছে। মাছের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার দীর্ঘ সময় পেয়েছে। এ ছাড়া নদীর পানি খাল-বিলে যাওয়ায় দেশি মাছের উৎপাদন আগের বছরগুলোর চেয়ে বেড়েছে। শুধু মাছ নয়, নদীতে বেড়েছে জলজ প্রাণীও।

দেখা মিলছে বিলুপ্ত কুমিরের
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংগঠনগুলোর জোট আইইউসিএন ২০১৫ সালে বাংলাদেশে মিঠাপানির কুমির বিলুপ্ত ঘোষণা করেছিল। বিলুপ্ত সেই কুমিরের দেখা মিলেছে এ বছর রাজশাহীর পদ্মা নদীতে। গত ১৬ অক্টোবর বাঘা উপজেলা ষাটবিঘা চরে কুমিরের দেখা পান ইমরুল কায়েস ও উম্মে খাদিজা ইভা দম্পতি। তারা ছবিও তোলেন। তাদের তোলা ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

বিনোদনপ্রেমীরা নৌভ্রমণে বেড়াতে এসে ভরা পদ্মায় আনন্দ করছেন। তবে এবার সেই আনন্দে কিছুটা ভাটা ফেলেছে কুমির। পদ্মা নদীর মাঝি বকুল হোসেন বলেন, ‘নদীতে কুমিরের ছবি দেখার পর মানুষ নৌকায় উঠতে ভয় পাচ্ছে। যদি নৌকা ডুবে যায় আর কুমিরে ধরে?’

বন্ধুদের নিয়ে পদ্মাপারে বেড়াতে আসা রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থী মহুয়া মৌ বলেন, ‘অন্য বছর পানি থাকে না। এ বছর নদীর কাছের চর ভেঙে যাওয়ায় নদীটা অনেক প্রশস্ত লাগছে।’

নদীতে দীর্ঘমেয়াদি পানি
রাজশাহীতে পদ্মার পানি জুলাই থেকে বাড়তে শুরু করে। গত ২৪ জুলাই পানির উচ্চতা ছিল ১৬ দশমিক ৩৫ মিটার। গত ১০ আগস্ট ছিল ১৭ দশমিক ২২ মিটার। সর্বশেষ চলতি বছরের গত ২৫ নভেম্বর পানির উচ্চতা ছিল ১১ দশমিক ২৬ মিটার। গত বছরের একই দিন পানির উচ্চতা ছিল ১০ দশমিক ৯৮ মিটার।

দুই বছরে পদ্মার হার্ডিঞ্জ সেতুর স্থানে পানির পরিমাপ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রতি মাসে সর্বনিম্ন পানির পরিমাপ বেশি ছিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, জানুয়ারিতে গত বছর সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৭৩ ও সর্বনিম্ন ৩ দশমিক ৮১, এ বছর সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ০৯ ও সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৫৫ মিটার পানি পাওয়া যায়। জুনে গত বছর সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৬০ ও সর্বনিম্ন ৩ দশমিক ৮৩, এ বছর সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৭৮ ও সর্বনিম্ন ৫ দশমিক ১ মিটার। গত জুলাইয়ে  সর্বোচ্চ ১১ দশমিক ৪৮ ও সর্বনিম্ন ৭ দশমিক ৫৭, এ বছর ১১ দশমিক ৮৮ ও সর্বনিম্ন ৭ দশমিক ৭৭ মিটার। আগস্টে গত বছর সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ১৮ ও সর্বনিম্ন ১০ দশমিক ৫৬, এ বছর সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৯৪ ও সর্বনিম্ন ১১ দশমিক ২৫ মিটার। সেপ্টেম্বরে গত বছর সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৩৮ ও সর্বনিম্ন ১০ দশমিক ৮৫, এ বছর সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫৩ ও সর্বনিম্ন ১১ দশমিক ০৬ মিটার। অক্টোবরে গত বছর সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ২৫ ও সর্বনিম্ন ৮ দশমিক ৯২, এ বছর ১১ দশমিক ৩০ ও সর্বনিম্ন ৯ দশমিক ০৬ মিটার পানি পাওয়া যায়।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর জানান, পদ্মার হার্ডিঞ্জ সেতুর স্থানে এ বছর আগস্টে ১৭ লাখ ৬৪ হাজার ৭০০, গত বছরের সেপ্টেম্বরে ১৬ লাখ দুই হাজার ৬১৩, ২০২৩ সালের আগস্টে ১১ লাখ ৪৭ হাজার ২৭৭ এবং ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ১৪ লাখ ২৬ হাজার ২৯১ কিউসেক পানি পাওয়া গিয়েছিল।

নদী গবেষকরা কী বলছেন
হেরিটেজ রাজশাহীর সভাপতি, নদী ও পরিবেশ গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, বিহার, নেপালসহ আমাদের দেশে এবার প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই বৃষ্টির পানিতেই গঙ্গা ও পদ্মা আশাতীত রূপে সমৃদ্ধ হয়েছে।

রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, গত বছর রাজশাহীতে বৃষ্টিপাত হয়েছে এক হাজার ৩৯৩ দশমিক ৪ মিলিমিটার। এবার তা বেড়ে হয়েছে এক হাজার ৫৬৪ দশমিক দুই মিলিমিটার।

মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, কয়েক বছর এমন বৃষ্টি হলে রাজশাহীতে আবারও ইলিশের ঝাঁক দেখতে পাব। নদীতে মিঠাপানির কুমির, গাঙ্গেয় ডলফিন (শুশুক), ঘড়িয়াল আবারও ফিরে আসছে। দেশি মাছের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পলিমাটি পড়ে জমিও উর্বর হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়ামিন হোসেন বলেন, ২৪ বছর ধরে পদ্মা যেসব অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, সেখানে তেমন বৃষ্টি হয়নি। এবার প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে পদ্মায় পানি ধারণক্ষমতা বেড়েছে।

ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. লতিফুর রহমান সরকার বলেন, কয়েক বছর নিয়মিত বৃষ্টি হলে এবং পদ্মায় পানি থাকলে জীববৈচিত্র্যে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

এগ্রোনমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ বলেন, পদ্মায় বেশি পানি থাকায় ভূগর্ভে পানির স্তর বাড়বে। নদীর পানি বোরো চাষের সেচে ব্যবহার করতে পারলে টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব হয়।

কিছু ক্ষতি ও লাভ
রাজশাহীর বাঘা, গোদাগাড়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোরের লালপুর, পাবনা ও কুষ্টিয়ার চরে অন্যান্য বার চাষিরা সবজি চাষ করেন। এর মধ্যে রয়েছে মুগডাল, বেগুন, মুলা, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি ও টমেটো। এ বছর পদ্মায় দীর্ঘমেয়াদি পানি থাকায় আগাম ফসল হয়নি। ফলে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

লালপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা প্রীতম কুমার বলেন, চরাঞ্চলে অতিরিক্ত পানি কৃষিতে ক্ষতি হয়েছে। আগাম সবজি চাষ ব্যাহত হয়েছে। তবে পদ্মার পানি জমিতে যে পলি ফেলেছে, তাতে আগামী রবিশস্য ভালো হবে।

সাপে কাটা অর্ধশত রোগীর মৃত্যু
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত রামেক হাসপাতালে এক হাজার ৪৪৮ জন সাপে কাটা রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৫০ জন।
রামেক হাসপাতালের সাপে কাটা ওয়ার্ডের প্রধান ডা. আবু শাহীন বলেন, এবারের মতো এত বেশি সাপে কাটা রোগী অতীতে কখনও এ হাসপাতালে আসেনি। এ বছর অতিবৃষ্টি ও পদ্মায় পানি থাকায় সাপের উপদ্রব বেশি। এ জন্য সাপে কাটা রোগীও বেশি। তবে এর মধ্যে বিষাক্ত সাপের দংশনের শিকার হয়েছেন ৩২৬ জন। এক হাজার ১২২ জনই বিষহীন সাপের কামড়ে হাসপাতালে এসেছিলেন। বিষাক্ত সাপের দংশনে আসা রোগীদের মধ্যে রাসেলস ভাইপারের দংশনের শিকার ছিলেন ৭৯ জন। এর মধ্যে মারা গেছেন ১৬ জন। তবে যারা দ্রুত হাসপাতালে এসেছেন, তাদের মৃত্যুহার কম।

ফারাক্কা নয়, বৃষ্টি ও ঢলের প্রভাব
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান অঙ্কুর বলেন, ‘গত পাঁচ বছরে এবারই দুবার পানি সতর্কতাসীমা পার করেছিল। স্রোতে শহর রক্ষা বাঁধের সামনের চর হারিয়ে গেছে। স্রোত থাকায় বড়াল, মুসাখাঁসহ অনেক নদী ও খালবিলে পানি গেছে। তবে নদীভাঙন বেড়েছে। খানপুর, খিদিরপুর, আষাড়িয়াদহসহ চরাঞ্চলের অধিকাংশ ভূমি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। চরাঞ্চল ছাড়াও গোদাগাড়ী উপজেলার নিমতলা, বাঘার চকরাজাপুর, আলাইপুরে ভাঙন তীব্র হয়েছে। নদীর বামতীর রক্ষায় এক হাজার ১৩৭ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।’

তিনি জানান, নদীর পানি খালবিলে প্রবেশ করাতে বড়াল নদীর জলকপাট খুলে দেওয়া হয়। এ ছাড়া বড়াল নদীর ৪৮ কিলোমিটার এলাকা খনন করতে ৪৮ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই নদীতে পানি সংরক্ষণ করতে পারলে পানির স্তর ধরে রাখাসহ সেচকাজে ভূমিকা রাখা সম্ভব।

তিনি বলেন, উজানে ফারাক্কা বাঁধের সব কপাট বর্ষায় খোলা থাকে। শুষ্ক মৌসুমে নিয়ন্ত্রণ থাকে। এবারের পানিপ্রবাহে ফারাক্কার প্রভাব নেই। মূলত দীর্ঘমেয়াদি অতিবৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের পানি রয়েছে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com