প্লাজমাফেরেসিস কী
প্লাজমাফেরেসিস একটি অতি সংবেদনশীল প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ডোনার অথবা রোগীর শরীর থেকে রক্ত নিয়ে, প্লাজমা আলাদা করে বাকি অংশটুকু পুনরায় শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এজন্য ব্যবহৃত হয় সেন্ট্রিফিউগেশানের পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে রক্ত থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ মিলিলিটার পর্যন্ত প্লাজমা আলাদা করা যায়। যদি এর চেয়ে বেশি প্লাজমা সরিয়ে ফেলা হয়, সে ক্ষেত্রে দেহে রক্তের বাদবাকি উপাদান ফিরিয়ে দেওয়ার আগে এর সঙ্গে অ্যালবুমিন ও নরমাল স্যালাইন অথবা এফএফপি মেশাতে হয়। সেটি ভিন্ন এক প্রক্রিয়া, যার নাম প্লাজমা এক্সচেঞ্জ।
কিভাবে ব্যবহৃত হয়
প্লাজমাফেরেসিসের মাধ্যমে সুস্থ ডোনারের প্লাজমা আলাদা করে বিভিন্ন প্লাজমা ডিরাইভেটিভস তৈরি করা যায়। এর মধ্যে আছে অ্যাক্টিভেটেড ফ্যাক্টর VII, ফ্যাক্টর VIII কনসেনট্রেটস, ফ্যাক্টর IX কনসেনট্রেটস, ফ্যাক্টর XIII কনসেনট্রেটস, ইমিউন সিরাম গ্লোবাউলিন, নরমাল সিরাম অ্যালবুমিন, প্লাজমা প্রোটিন ফ্র্যাকসন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের রোগের চিকিৎসায় এসব ডিরাইভেটিভস ব্যবহৃত হয়।
ডোনারের আর-এইচ হাইপার ইমিউনাইজেশন থাকলে অ্যান্টি আর-এইচ ইমিউনোগ্লোবিউলিন তৈরিতেও প্লাজমা ব্যবহৃত হয়। কিছু রোগীর চিকিৎসায় প্লাজমা এক্সচেঞ্জেরও প্রয়োজন হতে পারে।
চিকিৎসার রকমফের
রক্ত থেকে ক্ষতিকর অ্যান্টিবডি দূর করা : অটোঅ্যান্টিবডিজনিত রোগ; যেমন—গুলেইন বারি সিনড্রোম, মায়েসথেনিয়া গ্র্যাভিস, অ্যাকিউট পলিনিউরাইটিস, গুড পাসতোর সিনড্রোম অথবা অটোইমিউন হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়ার চিকিৎসায় এটি ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া অ্যালোন্টিবডির উপস্থিতি সরাতেও কার্যকর এই পদ্ধতি। এর মধ্যে রয়েছে এ-বি-ও ইনকম্প্যাটিবল অরগ্যান ও ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট রোগী, গর্ভবতীর দেহের অ্যান্টি আর-এইচ অ্যান্টিবডি সরানো, নিওনেটাল থ্রম্বোসাইটোপেনিয়ার চিকিৎসা।
ইমিউন কমপ্লেক্স সরানো : কিছু রোগের উৎপত্তি হয় দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতায় সমস্যা দেখা দিলে। রক্তে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণ ইমিউন কমপ্লেক্স জমে দেখা দেয় নানা রকম উপসর্গ। এর মধ্যে আছে র্যাপিডলি প্রসেসিভ গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস, পলিআর্থ্রাইটিস নোডোসা, সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথেমাটোসাস এবং ওয়েসনারস গ্র্যানুলোমেটোসিস।
হাইপারভিসকোসিটি সিনড্রোম : ওয়ালডেনস্টোম’স ম্যাক্রোগ্লোবিউলিনেমিয়া ও মাল্টিপল মায়েলোমার মতো রোগগুলো দেখা দিলে প্লাজমা অতিরিক্ত ঘন হয়ে যায়। এই চিকিৎসায়ও প্লাজমাফেরেসিস কার্যকর।
বিষাক্ত পদার্থ সরানো : হেপাটিক ফেইলিউর, রেনাল ফেইলিউর, বারবিচুরেট পয়জনিং, এমানিটা মাশরুম পয়জনিংয়ের মতো সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে রোগীর রক্তে মিশে থাকা বিষ (টক্সিন) দ্রুত সরাতে হয়। এক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয় প্লাজমাফেরেসিস।
প্লাজমায় ঘাটতি : অনেক রোগীর প্লাজমায় অত্যন্ত জরুরি কিছু জিনিসের ঘাটতি থাকে। সেসব পদার্থ প্লাজমায় মিশিয়ে আবারও দেহে প্রবেশ করানো হয়। এর মধ্যে আছে থ্রম্বোটিক থ্রম্বোসাইটোপেনিক পারপিউরা ও হিমোলাইটিক ইউরেমিক সিনড্রোমের চিকিৎসা।
পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রে প্লাজমাফেরেসিস নিরাপদ। তবে অন্যান্য থেরাপির মতো এটিরও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে আছে ভেসোভ্যাগাল রি-অ্যাকশন, হাইপোক্যালসেমিয়া, পাইরোজেনিক রি-অ্যাকশন এবং রিপ্লেসমেন্ট ফ্লুইডের প্রতিক্রিয়া। তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে উচ্চমানের চিকিৎসা, ভয়ের কিছু নেই।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক
ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ
ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল