চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তান গত এক দশক ধরে ক্রমান্বয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাজারে তাদের উপস্থিতি বাড়িয়ে আসছে। নতুন মার্কিন শুল্কব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পর বিশেষত বাণিজ্য–শক্তিধর চীন এখন এ বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
উচ্চ পরিমাণ পাল্টা শুল্ক আরোপের ফলে দেশগুলো তাদের রপ্তানির গন্তব্য বৈচিত্র্যময় করতে বাধ্য হচ্ছে এবং ২৭ সদস্যের ইউরোপীয় ব্লক তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।
ইউরোস্ট্যাট ডেটা অনুযায়ী, চীন ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রতি মাসে গড়ে ১ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের তৈরি পোশাক ইউ–তে রপ্তানি করেছে। কিন্তু জুলাই–সেপ্টেম্বরে সেই গড় বেড়ে দাঁড়ায় ২ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ইউরোতে। ফলে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ইউ–তে চীনের মোট পোশাক রপ্তানি হয়েছে ১৯ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ইউরো। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ২০২৫ সালের জুলাই–সেপ্টেম্বর সময়ে মাসিক গড়ে ১ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরো রপ্তানি করেছে, যেখানে জানুয়ারি–জুন সময়ে গড় ছিল ১ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ইউরো।
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ রপ্তানি শুরু করে ১ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ইউরো দিয়ে, আর মার্চে সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১১ বিলিয়ন ইউরো আয় করে। তবে তথ্য–বিশ্লেষণে দেখা যায়, এপ্রিল থেকে রপ্তানির গতি কমতে থাকে।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়েছে মোট ১৫ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ইউরো, যা আগের বছরের একই সময়ের ১৩ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ইউরো থেকে ১৩ দশমিক ১৭ শতাংশ বেশি। তবে একক মাসের আয়ে আর মার্চের রেকর্ড স্পর্শ করা যায়নি।
বিশেষজ্ঞ ও রপ্তানিকারকরা বলেন, মার্কিন শুল্কবাধার কারণে চীনসহ বিভিন্ন দেশের সরবরাহ জাপান, কানাডা এবং সবচেয়ে বেশি ইউ–মুখী হচ্ছে।
বাংলাদেশ ইউ বাজারে ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধরে রাখে—এই অবস্থায় এসব দেশের বাজারমুখী রপ্তানি প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র করবে, দাম কমিয়ে আনবে এবং মুনাফা ক্ষয় করবে বলে তারা মনে করেন।
সাম্প্রতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন এর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, তথ্যই দেখায় বাংলাদেশ ও চীনের প্রতিযোগিতা–ক্ষমতার ব্যবধান কতটা।
তিনি বলেন, “চীনের প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক ভালো। সেখানে বন্দরগুলি বেশি কার্যকর, কোনো বিদ্যুৎ বিভ্রাট নেই এবং বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে, বাংলাদেশে উৎপাদনশীলতা কম, লিড টাইম বেশি এবং উৎপাদন খরচও বেশি।”
তিনি আরও বলেন, “চীনে মজুরি বেশি হলেও তারা বেশি প্রতিযোগিতামূলক উচ্চ উৎপাদনশীলতা, কাপড়সহ কাঁচামালের সহজলভ্যতা, উৎপাদন বিঘ্নিত না হওয়া এসব কারণে তারা খুব দ্রুতই মার্কিন শুল্কের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে রপ্তানি গন্তব্য বদলে ইউ মুখী হতে পারছে।”
তিনি দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, “বাংলাদেশ কেবল সস্তা উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে প্রতিযোগিতা করতে পারে না,” ।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন -এর প্রাক্তন পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের গড় রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ভালো ছিল, তবে চীন, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং পাকিস্তান সহ অন্যান্য প্রতিযোগীদের পারফরম্যান্স ছিল আরও বেশি।
তিনি বলেন, নতুন ইউএস শুল্ক ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার পরে গত তিন মাসের গড় চালানের পরিস্থিতি সামগ্রিক বাজারের মাত্রা বদলে দিয়েছে। গড়ে, প্রতি মাসে চীন প্রায় ১ দশমিক ০ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের পোশাকের বেশি ভলিউম পাঠিয়েছে।
“তুলনায়, জুলাই থেকে গত তিন মাসে বাংলাদেশের গড় চালান বরং হ্রাস পেয়েছে,” তিনি বলেন এবং যোগ করেন যে প্রতিযোগীরা, বিশেষত চীন, উল্লেখযোগ্যভাবে দাম কমিয়ে দয়ে ইউ বাজারে আগ্রাসীভাবে প্রবেশ করছে।
তথ্য অনুযায়ী, ইউ এর পোশাক আমদানি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরে মূল্য–ভিত্তিতে ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ, এবং পরিমাণে ১৩ দশমিক ৮০ শতাংশ বেড়েছে—যেখানে ইউনিট মূল্য কমেছে ৫ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
পরিচালক রুবেল জানান, ভারতের পোশাক রপ্তানি এ সময়ে ৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ইউরো—মূল্যে ১০ দশমিক ৬২ শতাংশ, পরিমাণে ১৬ দশমিক ০১ শতাংশ বৃদ্ধি; কিন্তু দাম কমেছে ১৬ দশমিক ০১ শতাংশ।
পাকিস্তানের রপ্তানি হয়েছে ২ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ইউরো—মূল্যে ১৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ, পরিমাণে ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ বৃদ্ধি; এবং ইউনিট–মূল্য কমেছে ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
কম্বোডিয়া বিশেষভাবে শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখিয়েছে, যেখানে রপ্তানি ৩ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে, মূল্যে ২২ দশমিক ৫১ শতাংশ এবং পরিমাণে ৩৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করেছে। কম্বোডিয়ায় তৈরি পোশাকের ইউনিট মূল্য ১২ দশমিক ২৭ শতাংশ কমেছে, যা ইউএস বাজারের দুর্বল পরিস্থিতিতে ইউ এর দিকে একটি দৃঢ় কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে, ভিয়েতনামের পোশাকের ইউনিট মূল্য ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, তিনি এর কারণ হিসেবে তাদের উচ্চ মূল্য সংযোজিত পণ্যকে দায়ী করেন।
ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবেল মন্তব্য করেন, “যদিও এসব দেশ মূল্য ও পরিমাণ উভয় দিকেই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, তবে সামগ্রিকভাবে গড় দাম কমে যাওয়া প্রমাণ করে ইউ বাজারে প্রতিযোগিতা এখন খুবই তীব্র এবং ক্রেতারা মূল্য নিয়ন্ত্রণে আগের চেয়ে বেশি মনোযোগী, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতির কারণে।”








