সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:১৯ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

ওষুধপত্র সরবরাহ না থাকায় ঝুঁকিতে মা ও শিশু স্বাস্থ্য

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

শেরপুরে তিন লাখের বেশি সক্ষম দম্পতি ৯ মাস ধরে পাচ্ছেন না জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী। এতে জন্মনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বড় ধাক্কা খেয়েছে। দিন দিন বাড়ছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতেও ওষুধ সরবরাহ না থাকায় ঝুঁকিতে রয়েছে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও গর্ভের শিশু। চিকিৎসকরা বলছেন, অন্তঃসত্ত্বা নারী সময়মতো ওষুধ না খেতে পারলে তাদের গর্ভে প্রতিবন্ধী শিশু জন্মগ্রহণের শঙ্কা রয়েছে।

পরিবার-পরিকল্পনা অফিসের তথ্যমতে, শেরপুরে সক্ষম দম্পতি তিন লাখের বেশি। সদরে এক লাখ পাঁচ হাজার ৩৭৩ জন, নালিতাবাড়ীতে ৫৫ হাজার ৫০৭, নকলায় ৪৭ হাজার ১৫১, ঝিনাইগাতীতে ৩৯ হাজার ৩৪৬ ও শ্রীবরদী উপজেলায় ৫৭ হাজার ২০০ জন। তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ দম্পতি সরকারি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর ওপর নির্ভরশীল।

প্রান্তিক পর্যায়ে সক্ষম দম্পতিকে নিয়ে কাজ করেন পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তারা। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে দম্পতিদের প্রজনন-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে যেসব পরামর্শ দেন তা হলো– স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ, গর্ভধারণের আগে ও পরে যত্ন, নিরাপদ প্রসব এবং যৌনবাহিত রোগ প্রতিরোধ। এ ছাড়া পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী মেডিকেল অফিসাররা (স্যাকমো) প্রতি মাসে বিভিন্ন গ্রামের পরিচিত বাড়িতে ৮-১০টি করে স্যাটেলাইট ক্লিনিক স্থাপন করেন। স্যাটেলাইট ক্লিনিক হলো– একটি নির্দিষ্ট দিনে বা সময়ে একটি নির্দিষ্ট স্থানে অস্থায়ীভাবে স্থাপিত স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, সেখানে অন্তঃসত্ত্বা মা ও শিশু, সক্ষম দম্পতিরা আসেন। তাদের সাধারণ চিকিৎসা, ওষুধ সরবরাহ, পরিবার-পরিকল্পনা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দেওয়া হয়। এই কার্যক্রমগুলো প্রায় বন্ধ।

সাধারণত ইউনিয়নে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে স্যাকমো ও ভিজিটররা সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বা মা ও গর্ভের শিশু সুরক্ষায় পরামর্শ দেন। সেবাগ্রহীতাদের হাতে তুলে দেন বিনামূল্যের ওষুধ। দেশে প্রান্তিক ও অসচ্ছল মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই কার্যক্রম চলে আসছে কয়েক যুগ ধরে। কখনও বন্ধ হয়নি সরকারি চিকিৎসা সেবা ও ওষুধ সরবরাহ। ফলে প্রজনন স্বাস্থ্য ছিল সুরক্ষিত, কমে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ। দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ ছিল সন্তোষজনক পর্যায়ে। কিন্তু গত ১৩ মাস ধরে ওষুধ সরবরাহ না থাকায় প্রান্তিক পর্যায়ে এই স্বাস্থ্যসেবা হুমকির মুখে পড়েছে।

পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তারা জানান, জেলায় সক্ষম দম্পতিদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ অসচ্ছল। চরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকার মানুষের আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ। প্রতিনিয়ত পরামর্শ দিয়ে মেডিকেল ক্যাম্প করে ও বিনামূল্যে ওষুধ দিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। গত ৯ মাস ওষুধ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হচ্ছে। বাস্তবতা হলো, মানুষ ঠিকমতো সেবা পাচ্ছে না।

জানা গেছে, শেরপুর জেলায় ৪১টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। সদরে ১৪টি, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদীতে আটটি করে ১৬টি, নকলায় ছয়টি ও ঝিনাইগাতীতে পাঁচটি রয়েছে। প্রতিদিন প্রান্তিক পর্যায়ের দেড়-দুই হাজার মানুষ এখান থেকে চিকিৎসা নিতেন। বর্তমানে পরামর্শ ছাড়া কিছুই দেওয়া হচ্ছে না। ওষুধ না পেয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে ফিরে যাচ্ছেন লোকজন।

কথা হয় সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের উপসহকারী কমিউিনিটি মেডিকেল অফিসার সায়েদা খাতুনের সঙ্গে। তিনি জানান, বছর খানেক আগেও প্রতিদিন শতাধিক অন্তঃসত্ত্বা নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষ সেবা নিতে আসতেন। গত মে মাসের পর থেকে কোনো ওষুধ নেই। দরিদ্ররা বিপদে পড়েছেন। তারা অপমান-অপদস্থ করছেন। গালিগালাজ সহ্য করতে হচ্ছে।
ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে এসেছেন গনই মোমিনাকান্দা গ্রামের অন্তঃসত্ত্বা রোজিনা, মোর্শেদা জেরিন ও রামখিলা গ্রামের শিখা। কিন্তু কোনো ওষুধ নেই। মোর্শেদা জেরিন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। পুষ্টিকর খাবার খেতে পারি না। পেটে বাচ্চা আসার পর আয়রন, ফলিক এসিড, ক্যালসিয়ামসহ অনেক ওষুধ খেতে হয়, কিন্তু কিনতে পারতাছিনা। হাসপাতালেও ওষুধ নাই। ডাক্তার কইছে, এইগুলা না খাইলে বাচ্চার অসুবিধা হবো। কী করমু বুজবার পারতাছি না।’

লছমনপুর পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের স্যাকমো গোলাম মোস্তফা জানান, আগে প্রতিদিন ৫০-৬০ জন করে অন্তঃসত্ত্বা নারী আসতেন সেবা নিতে। ওষুধ না থাকায় এখন আর আসেন না। অনেকেই ওষুধ কিনে খেতে পারেন না। ফলে ঝুঁকি বাড়ছে মা ও গর্ভের শিশুদের।
সদর উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মারুফা আক্তারের ভাষ্য, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও ওষুধের ভীষণ সংকট। প্রান্তিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সেবাকেন্দ্র স্যাটেলাইট ক্লিনিকে ভিজিটর গিয়ে শুধু পরামর্শ ও চেকআপ করছেন। তিনি বলেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও ওষুধ না পেয়ে স্যাকমো ও পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাদের অপমান করছেন সেবাপ্রত্যাশীরা।

শ্রীবরদী উপজেলার ভেলুয়া ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শিকা সেরিনা খাতুন জানান, তিনি কাউনেরচর, ডাকাপাড়া, ঢালিপাড়ায় এক হাজার ৩০০ দম্পতি নিয়ে কাজ করেন। তাদের মধ্যে অর্ধেক নারীর জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনার সামর্থ্য নেই। মাথা খারাপ করে দিচ্ছে। শতকরা চার-পাঁচ ভাগ অপরিকল্পিত গর্ভধারণ হচ্ছে।

শ্রীবরদী সদরের পরিদর্শিকা খুশি বেগম বলেন, তাঁর অধীন তিনটি গ্রামে সক্ষম দম্পতি ৮৭০। ৫০-৬০ শতাংশ দরিদ্র। তারা ওষুধ কিনতে পারেন না। সরকারি সামগ্রী না পেয়ে অনেকেই পদ্ধতি নিতে অনাগ্রহী। এতে নিম্নবিত্তদের মধ্যে জন্মহার বেড়ে যেতে পারে।
শ্রীবরদী উপজেলার পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নূর ইসলাম জানান, আগে প্রতি মাসে দুটি করে ডিডিএস কিট (ড্রাগ অ্যান্ড ডায়েটারি সাপ্লিমেন্ট কিট) দেওয়া হতো। সব সময় তিন মাসের সামগ্রী মজুত থাকত। অন্তঃসত্ত্বা মা ও শিশু, সাধারণ মানুষ পেতেন ২২ প্রকার ওষুধ। গত মে মাস থেকে সরবরাহ বন্ধ। পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী না পাওয়ায় দরিদ্র দম্পতিদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বাড়ছে। তিনি বলেন, তাঁর উপজেলায় ৫৭ হাজার ২০০ সক্ষম দম্পতি রয়েছে। এর মধ্যে ৪২ হাজার জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করতেন। এখন কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন কি ধরনের পদ্ধতি নিচ্ছেন তারা। না নিয়ে থাকলে বাজার থেকে কিনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ঝিনাগাতী উপজেলা পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা জুনিয়র তাহের রেনেসাঁর ভাষ্য, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু আয়রন সাপ্লিমেন্ট, ফলিক এসিড পাচ্ছেন না তারা। গর্ভাবস্থায় এই ওষুধগুলো মায়েদের খাওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু দরিদ্র দম্পতিরা কিনতে পারছেন না, ফলে গর্ভস্থ শিশুর সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গর্ভের প্রথম তিন মাস আয়রন, ফলিক এসিড না খেলে বাচ্চার মাথা তৈরি হয় না। মাথার হাড় ও মস্তিষ্ক তৈরি হয় না। বাকা পা, ঠোঁটকাটা, তালুকাটাসহ হতে পারে নানা জটিল রোগ। বাচ্চা হওয়ার পর মায়ের শরীরে হিমোগ্লোবিনের যে স্বল্পতা হয় তা পূরণ করতে সামগ্রিক শরীরটা স্বাভাবিক হতে কমপক্ষে দেড় থেকে দুই বছর লাগে। এ জন্য একটি বাচ্চা হওয়ার কমপক্ষে তিন বছর পর আরেকটি বাচ্চা নেওয়া দরকার। তিনি বলেন, ‘আমরা জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী দিতে না পারায় অপরিকল্পিত গর্ভধারণ হচ্ছে। এক বছরের বাচ্চা আছে, ফের বাচ্চা পেটে আসছে। ফলে যে বাচ্চাটা হচ্ছে, তার যত্ন নিতে পারছে না মা। আবার যার দুই বা তিন বছর পরে গর্ভে আসার কথা ছিল, সে এক বছরের মধ্যে গর্ভে আসছে। ফলে দুটি বাচ্চাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নালিতবাড়ী ও নকলা পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা প্রবাল সরকার পার্থ জানান, ওষুধপত্র না পেয়ে নকলার চরাঞ্চল ও নালিতাবাড়ীর গারো পাহাড়ের দরিদ্র মানুষ বিপাকে পড়েছেন। বিশেষ করে, সক্ষম দম্পতিদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বাড়ছে এবং অপুষ্টিজনিত কারণে কম ওজনের শিশু জন্ম নেওয়ার শঙ্কা বেড়েছে।

শেরপুর পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক নিরঞ্জন বন্ধু দাম বলেন, আমার কোনো বক্তব্য নেই। কারণ আমরা ওষুধ ক্রয় করি না। আমরা সরবরাহ পাই অধিদপ্তর থেকে। ইনজেকশন কিছু আছে। খাবার বড়ি, কনডম অল্প আছে। ওষুধ না পাওয়ায় জনসংখ্যা বাড়ার সম্ভবনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিশ্চিতভাবে সুযোগ আছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, যারা কিনে ব্যবহার করতে পারবে না, তাদের সমস্যা হবে। ক্রয় প্রক্রিয়া কতদিন লাগবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি বলা সম্ভব না। আমরা যখন ওষুধ পাব, তখন দিতে পারব।

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com