অন্যদিকে একই কীটনাশক বারবার ব্যবহারে পোকামাকড় ও রোগজীবাণু প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। ফলে ওষুধ দিয়েও কার্যকর ফল মিলছে না। আগাছা দমনে অতিনির্ভরতা তৈরি হয়েছে আগাছানাশকের ওপর, যার প্রভাবে পরিচিত আগাছাগুলোও এখন প্রতিরোধী হয়ে উঠছে।
এই অবস্থায় আমাদের প্রয়োজন এমন এক কৃষিব্যবস্থা, যা প্রকৃতির মতো কাজ করবে, যেখানে কোনো কিছু অপচয় হবে না, বরং একটির বর্জ্য অন্যটির সম্পদে পরিণত হবে। এমন সমন্বিত ব্যবস্থাকেই বলা হয় চক্রক্রমিক কৃষি (Cyclic Agriculture)।
আসলে এটি কোনো নতুন ধারণা নয়।
উর্বরতা হারাচ্ছে কৃষিজমি : মাটির উর্বরতা মানে হলো মাটির সেই ক্ষমতা, যা গাছকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ করে ভালো ফলন দিতে সক্ষম করে। প্রাকৃতিকভাবে এই পুষ্টিচক্র অবিরত চলার কথা, গাছ মাটি থেকে পুষ্টি নেয়, আর ঝরা পাতা, অবশিষ্টাংশ ও অণুজীবের মাধ্যমে সেই পুষ্টি আবার মাটিতে ফিরে আসে।
কিন্তু আধুনিক কৃষির অপপ্রয়োগ সেই স্বাভাবিক চক্রকে ভেঙে দিয়েছে। উচ্চ ফলনশীল ফসলের পুষ্টি চাহিদা অনেক বেশি, অথচ কৃষকরা প্রায়ই অন্ধভাবে সার ব্যবহার করেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সারের সঠিক অনুপাত মানা হয় না। ফলে কিছু ফসলের উৎপাদন সাময়িকভাবে বাড়লেও মাটির গভীরে তৈরি হচ্ছে অদৃশ্য ক্ষয়।
চাষাবাদের ঘনত্ব ও অতিরিক্ত সেচ মাটির গঠন নষ্ট করছে; রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটি অম্লীয় হয়ে পড়ছে; মাটির অণুজীব ধ্বংস হচ্ছে; এবং মাটি শক্ত হয়ে তার স্বাভাবিক প্রাণ হারাচ্ছে। ফলে একটি ‘উচ্চ ইনপুটের ফাঁদ’ তৈরি হয়েছে, যত বেশি সার ও কীটনাশক দেওয়া হচ্ছে, খরচ তত বাড়ছে, কিন্তু মাটির গুণমান ততই কমছে।
প্রকৃতির মতো কৃষিব্যবস্থা : চক্রক্রমিক কৃষি এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে খামারের প্রতিটি উপাদান—ফসল, পশু, মাছ ও গাছ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করে। একটির বর্জ্য অন্যটির খাদ্য বা সার হয়ে মাটিতে ফিরে আসে। ফলে সম্পদের অপচয় বন্ধ হয় এবং মাটির পুষ্টি পুনরুজ্জীবিত হয়।
এই ব্যবস্থার মূল তিনটি নীতি হলো :
* কোনো কিছু অপচয় হবে না : উৎপাদনের সব অবশিষ্টাংশ পুনরায় ব্যবহৃত হবে।
* বৈচিত্র্যের মাধ্যমে ভারসাম্য : ফসল, পশু, মাছ ও গাছ একত্রে কাজ করে স্থিতিশীলতা তৈরি করবে।
* সম্পদের পুনর্জন্ম : ব্যবহৃত উপকরণ পুনরায় প্রাকৃতিক চক্রে ফিরে আসবে।
কৃষিচক্রের ভিত্তি : চক্রক্রমিক কৃষির মূলভিত্তি হলো ফসল উৎপাদন। ফসলের মাধ্যমে মাটি থেকে পুষ্টি নেওয়ার পাশাপাশি মাটিতে পুষ্টি ফেরানোও এখানে সমান জরুরি। এ জন্য :
* ফসল পর্যায়ক্রম (Crop rotation) বজায় রাখা প্রয়োজন, যেমন—ধান ও ডাল পর্যায়ক্রমে চাষ করলে মাটির নাইট্রোজেন প্রাকৃতিকভাবে ফিরে আসে।
* একই জমিতে একাধিক ফসল চাষ (Intercropping) পোকামাকড় কমায় ও মাটিক্ষয় রোধ করে।
* ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটিতে ফেরানো হলে জৈব পদার্থ বাড়ে, পানি ধরে রাখার ক্ষমতা উন্নত হয় এবং হিউমাস তৈরি হয়, যা মাটিকে নরম ও প্রাণবন্ত রাখে।
বর্জ্য থেকে সম্পদে রূপান্তর : গবাদি পশু চক্রক্রমিক কৃষির অন্যতম স্তম্ভ। তারা ফসলের খড়, খৈল বা অন্যান্য উপজাত খেয়ে গোবর ও মূত্র তৈরি করে, যা উত্কৃষ্ট জৈব সার। এই বর্জ্য কম্পোস্ট বা বায়োগ্যাস প্লান্টে ব্যবহার করা যায়। এতে জ্বালানি উৎপন্ন হয়, আর অবশিষ্ট স্লারি উচ্চমানের সার হিসেবে জমিতে দেওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, ধানের খড় গরুর খাদ্য, গোবর মাঠের সার, আর বায়োগ্যাস ঘরের জ্বালানি—সব মিলিয়ে তৈরি হয় একটি শূন্য বর্জ্য খামার।
জলের মাধ্যমে পুষ্টি ফেরানো : চক্রক্রমিক কৃষিতে মাছ চাষ একটি কার্যকর উপাদান। মাছের পুকুরের পানি ফসলের সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়, আর পশুর বর্জ্য বা ফসলের উপজাত মাছের খাদ্য হয়।
বাংলাদেশসহ এশিয়ার অনেক অঞ্চলে প্রচলিত ধান-মাছ চাষ পদ্ধতি এই ধারণার উত্কৃষ্ট উদাহরণ। এতে মাছের বর্জ্য পানিতে পুষ্টি জোগায়, ধানগাছ সেই পুষ্টি গ্রহণ করে, আর মাছ পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করে কীটনাশকের প্রয়োজন কমায়। একই জমি থেকে ধান ও মাছ—দুটিই উৎপাদন সম্ভব, যা একদিকে পরিবেশবান্ধব, অন্যদিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক।
সংযোগ ও স্থিতিশীলতা : অরণ্য কৃষি (Agroforestry) মানে গাছ, ফসল ও পশুপালন একত্রে চাষ করা। গাছের গভীর শিকড় মাটির নিচ থেকে পানি ও পুষ্টি টেনে আনে এবং ঝরা পাতার মাধ্যমে তা আবার মাটিতে ফিরিয়ে দেয়। এতে মাটির গঠন ও পুষ্টি বজায় থাকে, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং মাটিক্ষয় রোধ পায়। গাছ ও ফসলের বৈচিত্র্য পোকামাকড়ের আক্রমণ ও জলবায়ুগত বিপর্যয়ের প্রভাব কমায়। ফলে কৃষিব্যবস্থা হয় আরো স্থিতিশীল ও টেকসই।
চক্রক্রমিক কৃষির উপকারিতা : এই সমন্বিত কৃষি পদ্ধতি মাটিকে উর্বর রাখে, উৎপাদন বাড়ায় এবং খরচ কমায়। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমে, ফসল, মাছ, গবাদি পশু ও বৃক্ষ থেকে একাধিক আয়ের উৎস তৈরি হয়। ফলে কৃষকের আয় স্থিতিশীল হয়, মাটির স্বাস্থ্য উন্নত হয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলা করা সহজ হয়।
উপসংহার : ভবিষ্যতের কৃষি এমন হতে হবে, যেখানে কিছুই অপচয় হবে না, বরং প্রতিটি উপাদান অন্যটির সম্পদে রূপ নেবে। চক্রক্রমিক কৃষি সেই পথ দেখাচ্ছে, যেখানে ফসলের সঙ্গে পশু, মাছ ও গাছপালা একত্রে কাজ করে মাটিকে আবার জীবন্ত করে তুলবে। একই সঙ্গে এটি কৃষককে দেবে বেশি ফলন, কম খরচ এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারা।
আজ আমাদের উপলব্ধি করা উচিত, ‘মাটিকে খাওয়াও, মাটিই তোমাকে খাওয়াবে।’
লেখক : সিনিয়র টেকনিক্যাল কনসালট্যান্ট, কৃষিজ মিথেন নির্গমন হ্রাস কর্মসূচি, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগ
আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (IFAD)