

প্রতি শুক্রবার মানুষকে খাওয়ান পূরবী-রাসেল দম্পতি। ছবি : লেখক
মাঝবয়সী এই নারীর নাম পূরবী খাতুন। অভাবের সঙ্গে লড়ে বড় হওয়া পূরবী এখন পথ দেখাচ্ছেন অন্যদের। গরু-ছাগল পালন করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। ছেলেমেয়েদের পড়ার খরচ জোগাচ্ছেন। স্বামীকেও সহায়তা করছেন। এভাবে গ্রামে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন তিনি। পাবনার সুজানগরের নগরবাড়ী গ্রামে জন্ম পূরবীর। চার ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। পূরবীর বয়স তখন পাঁচ-ছয় বছর। দ্বিতীয় বিয়ে করে বউ নিয়ে অন্যত্র চলে গেলেন তাঁর বাবা। চার সন্তানকে নিয়ে যেন অকূল পাথারে পড়লেন পূরবীর মা মরিয়ম। সংসারে রীতিমতো দুর্যোগ নেমে এলো। মরিয়ম তখন অন্যের বাড়িতে কাজ নিলেন। মানুষের থালা-বাসন মেজে দিতেন, কাপড়চোপড় ধুয়ে দিতেন। বিনিময়ে যা পেতেন, তা নিয়ে কোনোমতে সন্তানদের মুখে আহার তুলে দিতেন। যেসব বাড়িতে কাজ করতেন, সেখানকার লোকজনও মাঝেমধ্যে কিছু ভাত-তরকারি দিয়ে দিত। পরে সন্তানদের সঙ্গে বসে খেতেন। সেদিন চাল ছিল না পূরবীদের ঘরে। যে বাড়িতে কাজ করতেন, সেই গৃহকর্ত্রীকে বলে ভাত নিয়ে ফিরছিলেন। বর্ষাকাল। কর্দমাক্ত পথ। পিছলা খেয়ে পড়ে গেলেন। নিজে ব্যথা পেয়েছেন বলে নয়, মরিয়মের বেশি কষ্ট লেগেছিল কাদার মধ্যে ভাতগুলো পড়ে গিয়েছিল বলে! বাসায় যে ছেলেমেয়েরা না খেয়ে আছে। সে রাতে না খেয়েই কাটাতে হয়েছিল পূরবীদের। এত অভাবের মধ্যে সপ্তম শ্রেণির বেশি পড়তে পারেননি পূরবী। বললেন, ‘তখন তো ভাতই পাই না, পড়াশোনা করব কিভাবে?’ একসময় পূরবী নিজেও কাজে যেতেন মায়ের সঙ্গে। তাঁকে অল্প বয়সেই বসতে হলো বিয়ের পিঁড়িতে। স্বামীর বাড়িতে এসেও দেখেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে অভাবের অক্টোপাস। পরে স্বামীর সঙ্গে চলে এলেন গাজীপুরের বোর্ডবাজারে। কাজ নিলেন গার্মেন্টসে। ওভারটাইম মিলিয়ে সাড়ে ছয় হাজার টাকার মতো পেতেন মাসে। বছর তিনেক পর আবার পাবনায় ফিরলেন। তত দিনে দ্বিতীয় মেয়ের জননী হলেন পূরবী। মেয়েকে দেখতে এসে প্রতিবেশী, স্বজনরা খুশি হয়ে যে টাকা দিয়েছিল, তা দিয়ে একটি ছাগল কিনলেন। পাশাপাশি নকশি কাঁথা সেলাই করেছেন, দরজির কাজ করেছেন। দিনমজুরিও দিয়েছেন। বললেন, ‘আমার জীবনে কষ্টের কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না।’
যা হোক, পূরবীর দিনবদলের শুরু এই ছাগল দিয়ে। একসময় একে একে ১৯টি ছাগল হলো তাঁর। ছাতা নিয়ে মাঠে চলে যেতেন ছাগল চরাতে। তত দিনে করোনা আঘাত হানল। এ সময় ব্যাংক থেকে ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিলেন পূরবী। ২৭ হাজার টাকায় কিনলেন একটি বাছুর। বড় হলে সেটি বিক্রি করে কিনলেন একটি গাভি। সেই গাভির দুটি বাছুর বিক্রি করে পরে আরো একটি গাভি কিনলেন। তত দিনে ছাগলগুলো বিক্রি করে দিলেন। তাঁর স্বামী রাসেল তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা ব্যাংকঋণ নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিনেছিলেন। দুটি বাছুর, একটি গরু আর ছাগল বিক্রির টাকায় সেই ঋণ শোধ করলেন পূরবী। একদিন স্বামীকে বললেন, ‘আমাকে ভালো জাতের গরু কিনে দাও। যে গরুর দুধ বেশি হয়, সেই গরু।’
পরে ব্যাংক থেকে তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিজিয়ান জাতের দুটি গরু কিনলেন রাসেল। এখন পূরবীর খামারে গরু মোট ছয়টি। সকাল-বিকাল দুই বেলা দুধ দোহন করেন। প্রতিবার ১৫-১৬ লিটার করে পান। খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন পূরবী। ভোর সাড়ে ৫টার মধ্যেই দুধ দোহন করা হয়ে যায়। সকালে দুধ বাজারে বিক্রির জন্য পাঠিয়ে দেন। আর বিকেলে প্রতিবেশীরা নিয়ে যায়। এভাবে নিজেদের দায়দেনা শোধ করেছেন। কয়েক দিন আগে বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বাকি দুই ছেলে-মেয়ের পড়াশোনার খরচ জোগান। এবার গরুর জন্য ৪৫ হাজার টাকার খড়ও কিনেছেন। তাঁর স্বামী রাসেল খান বললেন, ‘একসময় আমরা অভাব-অনটনে কাটিয়েছি। এখন ওপরওয়ালা মুখ তুলে চেয়েছে। পূরবী দিনরাত খাটছে সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে।’ পূরবীর দেখাদেখি গ্রামের অনেকে এখন গরু-ছাগল পালন করে ভাগ্যবদলের চেষ্টা করছেন।
অর্থবিত্তে এখনো যে রাসেল-পূরবী দম্পতি খুব সচ্ছল, তা নয়। তবে ভুলে যাননি অতীতের কথা। তাঁরা এখন নিজেদের সাধ্যমতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। গরুর দুধ বিক্রির টাকা এবং রাসেলের আয়ের একটি অংশ খরচ করেন অসহায় মানুষের জন্য। প্রতি শুক্রবার নিজ হাতে খাবার তুলে দেন প্রায় ৫০ জন অভুক্ত মানুষের পাতে। পূরবী বলেন, ‘ভাই, দুনিয়ায় এখনো ভাতের কষ্ট করে অনেকে। আমরাও কষ্ট কম করিনি। তাই অভুক্ত মানুষকে খাওয়ানোর চেষ্টা করি। আমাদের বড়লোক হওয়ার ইচ্ছা নেই। মানুষের হাসি দেখলেই সুখ লাগে।’ ভবিষ্যতেও এই কাজ চালিয়ে যাবেন পূরবী। বললেন, ‘খামারটা আরো বড় করতে চাই। আয় বাড়লে আরো বেশিসংখ্যক মানুষের পাশে দাঁড়াব আমরা।’