প্রতিটি সংগঠনেরই একটি নিজস্ব পরিচালন ব্যবস্থা থাকে; যার মধ্যে থাকে নিয়ম, কাঠামো এবং সংগঠন চালানোর পথনির্দেশ। কিন্তু যেকোনো সংগঠন, বিশেষ করে সাংস্কৃতিক সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের প্রথম শর্ত কথা বলার স্বাধীনতা।
সংস্কৃতি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে চিন্তা, ভাষা, নন্দন সবকিছুই মানুষের জন্য। তাই সংস্কৃতিকর্মীর মুখ বন্ধ করে রেখে কখনোই সাংস্কৃতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। কবিতা, গান, নৃত্য, নাটক, সিনেমা সংস্কৃতির যেসব শাখা শত শত বছর ধরে মানুষের চেতনাকে জাগিয়ে রেখেছে, সেসবের চালিকাশক্তিও হচ্ছে ফ্রিডম অব স্পিচ। একটি গান ধরুন, বিশেষ করে গণসংগীত। গণসংগীত কেবল রসগম্ভীর সুরের খেলা নয়; এটি সময়ের দলিল, সমাজের প্রতিচ্ছবি। যখন সমাজে বৈষম্য থাকে, অন্যায় থাকে, অত্যাচার থাকে তখন গান হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা। একজন শিল্পী তখন তাঁর কণ্ঠে, তাঁর কথায় মানুষের পক্ষে দাঁড়ান। কারণ সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য মানুষকে সুন্দর, সচেতন, মানবিক জীবনের দিকে এগিয়ে নেওয়া। এ কাজ তখনই সম্ভব, যখন তিনি নিজের কথা, নিজের অবস্থান, নিজের মতামত মুক্তভাবে প্রকাশ করতে পারবেন। তাই সংস্কৃতি মানেই বাকস্বাধীনতা, আর বাকস্বাধীনতা মানেই গণতন্ত্র। স্বাধীনতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অধিকার। আমি সমাজের অবস্থা দেখি, মানুষের কষ্ট দেখি, রাষ্ট্রের নীতি দেখি। সেখান থেকে আমি যদি কিছু বলতে চাই, গান লিখতে চাই, নাটকে তুলতে চাই, কবিতায় ফুটিয়ে তুলতে চাই আমাকে সেই অধিকার দিতে হবে। না হলে সংস্কৃতি বেঁচে থাকে না, কৃত্রিম হয়ে যায়। সংস্কৃতি বন্ধ হলে সমাজের সৃজনশীল শক্তি শুকিয়ে যায়।
আমাদের সমাজে অনেক বাধা আছে ধারণাগত, রাজনৈতিক, সামাজিক সব মিলিয়ে এমন সব শৃঙ্খল–যেগুলো কখনও কখনও সংস্কৃতির অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে দেয়। কিন্তু সংস্কৃতির কাজই হলো সেই বাধাগুলো ভাঙতে সাহায্য করা, মানুষকে সচেতন করা, প্রতিরোধের ভাষা তৈরি করা। অনেকেই চান না সংস্কৃতি সংগঠিত হোক। কারণ সংগঠিত সংস্কৃতি মানে মানুষ একজোট, মানুষ সচেতন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। তাই বাধা আসে কখনও প্রকাশ্যে, কখনও গোপনে। এই জায়গায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব আছে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে সংস্কৃতির অবাধ চলাচল।
এখানে আমি কোনো নির্দিষ্ট দল বা সরকারের কথা বলছি না, বলছি রাষ্ট্রব্যবস্থার চিরস্থায়ী দায়িত্বের কথা। যে দেশ সত্যিকার অর্থেই এগোতে চায়, সেই দেশকে শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও মানুষের কণ্ঠ রক্ষা করতে হবে।
থিয়েটার, সংগীত, কবিতা, নাচ এগুলোর মাধ্যমে মানুষ কথা বলে, মানুষ ভাবতে শেখে, মানুষ সাহসী হয়। আধুনিক পৃথিবীর সব গণতান্ত্রিক দেশে এই ব্যবস্থাই স্থাপন করা হয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেটি ছিল উজ্জ্বল উদাহরণ। যুদ্ধের আগে ও পরে গান, কবিতা, নাটক মানুষের চেতনাকে জাগিয়েছে। স্বাধীনতার ভাবনা, দেশের ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্রগঠনের স্বপ্ন সব আমরা সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে প্রকাশ করেছি। কারণ তখন পরিবেশ ছিল অনুকূল, জায়গা ছিল, সাহস ছিল, মানুষের সমর্থন ছিল। কিন্তু কথা এখানেই শেষ নয়। সংস্কৃতি শুধু সমস্যা বলবে না সমাধানেও অংশ নেবে।
শিল্প সমাজকে কেবল আয়না দেখায় না, পথও দেখায়। সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে তার অধিকার হিসেবে গ্রহণ করে, আবার গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত রাখার জন্যও কাজ করে–এ যেন দুই দিক থেকেই সম্পর্কিত বন্ধন। এবার আসি সংগঠন পরিচালনার কথায়।
প্রতিটি নাট্যদলের একটি পরিচালনা পর্ষদ থাকে। একটি নাটক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া কাজ করে। পরিচালক প্রথমে নাটক পড়েন, বিশ্লেষণ করেন, দেখেন নাটকটি সময়োপযোগী কিনা, সমাজবাস্তবতার সঙ্গে কতটা সম্পর্কযুক্ত। তারপর দল পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয় নাটকটি করা হবে কী হবে না। এরপর নাটক নির্বাচিত হলে নির্দিষ্ট নির্দেশক, নকশাকার, মিউজিক, আলোক প্রক্ষেপণ সবই দলগত সিদ্ধান্তে এগিয়ে যায়। এখানে দলের ভেতরেই গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে।
কারণ যে সংগঠন নিজে গণতান্ত্রিক নয়, সে বাইরে গিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বললে সেটি বিশ্বাসযোগ্য হয় না। তাই গণতন্ত্র একটি দ্বিমুখী পথ আমি যেটি চাই, নিজেকেও সেটি অনুসরণ করতে হবে। তাহলেই সামনে এগিয়ে চলা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানকে উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়। এই ফেডারেশানের সদস্য তিনশ’র বেশি নাট্যদল। বেশির ভাগ নাট্যদলই সক্রিয়। তাদের পরিচালনা পর্ষদও নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়। দেশের পরিস্থিতি যখন খারাপ হয়, মানুষ যখন সমস্যায় পড়ে, গণতন্ত্র যখন সংকটে পড়ে তখন থিয়েটার ফেডারেশান রাস্তায় নামে, সাহসের সঙ্গে প্রতিবাদ করে, বিবৃতি দেয়, কর্মসূচি নেয়। কারণ সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো মনে করে গণতন্ত্র শুধু উপভোগ করার জিনিস নয়, মানুষের হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্বও সংস্কৃতির।
জেলা, উপজেলা, শহর, গ্রাম দেশের সবচেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যন্ত সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য কাজ করে গেছে এবং করে যাচ্ছে। এটিই সংস্কৃতির শক্তি। এটি কোনো অস্ত্র নয়, কোনো দণ্ড নয় এটি মানুষের মনের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন।
সংস্কৃতি মানুষের জীবনকে সুন্দর করে, মানুষকে দিশা দেয়, মানুষকে আশা জাগায়। সে বলবে কীভাবে সমাজের চলমান সংকট মোকাবিলা করা যায়, কোথায় পরিবর্তন দরকার, কোথায় অন্যায় আছে, কোথায় মানুষকে দাঁড়াতে হবে। এ কারণেই বলি সংস্কৃতি ও গণতন্ত্রকে আলাদা করা যায় না; যেখানে সংস্কৃতি স্তব্ধ, সেখানে গণতন্ত্র দুর্বল।
যেখানে মানুষ কথা বলার স্বাধীনতা পায়, সেখানেই জাগে সৃষ্টিশীলতা, মানবতা, মুক্ত চিন্তা। তাই আমি মনে করি সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিতে চাইলে, দেশকে এগিয়ে নিতে চাইলে, সমাজকে সচেতন রাখতে চাইলে প্রথম শর্ত হলো কথা বলার স্বাধীনতা। এ স্বাধীনতা যেন কখনও স্বেচ্ছাচারিতায় পরিণত না হয় সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যতক্ষণ শিল্পী মানুষের জন্য কথা বলবেন এই স্বাধীনতা তাদের অধিকার, তাদের অস্তিত্ব। সংস্কৃতি গণতন্ত্রে বাঁচে, আবার গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখেও। এই দুইয়ের সম্পর্ক অনিবার্য। এদের বিচ্ছেদ মানে সমাজের ভেতর অন্ধকার। সংস্কৃতি যত বেশি মুক্ত, দেশ তত বেশি আলোকিত। সংস্কৃতি যত বেশি সংগঠিত, গণতন্ত্র তত বেশি শক্তিশালী।