২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৩০ আসনে বিজয়ী হয়ে তিনি এ পদে আসীন হন, যদিও সেই নির্বাচন নিয়ে কিছু অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনের পর ৩১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তাদের ভূমিধস বিজয় উদযাপন করতে নিষেধ করেন। বিজয়ের আনন্দে আত্মহারা না হয়ে তিনি তাদেরকে সংযত থাকার নির্দেশ দেন।
তিনি বলেন, ‘যেহেতু বিজয় অর্জন করেছি, তাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে’ (প্রথম আলো, ১ জানুয়ারি ২০০৯)। তিনি নিজেও কোনোরূপ প্রতিহিংসামূলক বক্তব্য প্রদান থেকে বিরত থাকেন। তিনি ২০০৪ সালের আওয়ামী লীগের সভায় গ্রেনেড হামলার, যে হামলায় ২৪ জনের মৃত্যু ঘটে এবং তাঁর নিজের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেননি। বরং তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। আমরা হানাহানির রাজনীতি পরিহার করতে চাই। আমরা ক্ষমতার অপব্যবহার করব না।’
বাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বিএনপির প্রতি জলপাইয়ের ডালও বাড়িয়ে দেন, যদিও সেই নির্বাচনে বিএনপি মাত্র ৩০টি আসনে জয়ী হয়েছিল। তিনি ঘোষণা দেন যে, ‘আমাদের সরকার হবে সকলের।’ তিনি বলেন, বিরোধী দলকে সংখ্যা দিয়ে বিচার করা হবে না, কারণ সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। বিএনপিকে সংসদের ডেপুটি স্পিকার পদ দেওয়ার তিনি অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। রাজি থাকলে বিরোধী দল থেকে মন্ত্রী করার ইচ্ছাও তিনি প্রকাশ করেন। এমনকি খালেদা জিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর প্রস্তাবও তিনি দেন। শেখ হাসিনা দেশে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি উপহার দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি তিনি আহ্বান জানান, ‘আসুন, সব ভেদাভেদ ভুলে দেশের মানুষের জন্য একসঙ্গে কাজ করি’ (প্রথম আলো, ১ জানুয়ারি ২০০৯)।
প্রসঙ্গত, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পেছনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক একটি নির্বাচনী ইশতেহার, যাতে অনেক যুগান্তকারী অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে এবং নির্বাচন পরবর্তী ঘোষণা ছিল সেই ইশতেহারেরই প্রতিধ্বনি। ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, ক্ষমতাধরদের সম্পদের হিসাব প্রদান এবং রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরের ঘুষ, দুর্নীতি, অনুর্পাজিত আয়, ঋণখেলাপি, চাঁদাবাজি, কালো টাকা, পেশি শক্তি ও সন্ত্রাস প্রতিরোধের লক্ষ্যে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ। একই সঙ্গে সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, মানবাধিকার কমিশন গঠন এবং ন্যায়পাল নিয়োগের ঘোষণা এতে দেওয়া হয়। দিনবদলের সনদে আরও অঙ্গীকার করা হয় নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন পদ্ধতির চলমান সংস্কার অব্যাহত রাখার, জাতীয় সংসদকে কার্যকর করার, সংসদ সদস্যদের ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ দেওয়ার, সরকারকে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার আওতায় আনার এবং পুলিশ ও প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও গণমুখী করার। সর্বোপরি এতে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি সর্বসম্মত আচরণবিধি প্রণয়নের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার করা হয়।
নিঃসন্দেহে এসব অঙ্গীকার ছিল যুযোপযোগী ও অনেকটা দুঃসাহসী। এসব অঙ্গীকারের কারণেই বহুলাংশে জনগণ, বিশেষত তরুণরা ব্যাপকভাবে নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন প্রদান করেছিল, যদিও শেখ হাসিনার নেতৃত্বের সরকার অল্প সময়ের মধ্যেই চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয় এবং সমর্থন হারিয়ে ফেলে। সরকারের ব্যর্থতার প্রতিফলন ঘটে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি হাবিবুর রহমানের একটি উক্তি থেকে, যা ছিল– ‘দেশ এখন বাজিকরদের হাতে’ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ০৬ অক্টোবর ২০১০)। শুধু ব্যর্থই নয়, ১৫ বছরের শাসনকালে শেখ হাসিনা চরম স্বৈরাচারী শাসকে পরিণত হয়েছিলেন।
কীভাবে তা ঘটল?
তা ঘটেছে ২০০৯ সালের জানুয়ারি মাসে শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় আসীন হয়েছিলেন তখন যে নিবর্তনমূলক শাসন ব্যবস্থা আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বিরাজমান ছিল, মূলত সেই পথে হেঁটেই। তাঁর সরকারের কিছু উদ্যোগও– যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল– তাঁকে একজন ঘৃণিত ফ্যাসিস্টে রূপান্তর করেছিল।
পাঠকের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের পর তিনি দলীয় প্রধানের পদ ছাড়েননি। বরং তিনি একই সঙ্গে সংসদ নেতার পদও গ্রহণ করেন। এভাবে তিনি একই সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের এবং আইনসভার প্রধান হন, যা ছিল ক্ষমতার পৃথকীকরণ নীতির পরিপন্থি। ফলে তিনি মোগল বাদশাদের মতো চরম ক্ষমতাধর ব্যক্তিতে পরিণত হন। এই ব্যবস্থায় দল ও সরকারের মধ্যে ফারাক বিলীন হয়ে যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না, শেখ হাসিনাই প্রথম একাধারে এই তিনটি পদে আসীন হয়েছিলেন তা নয়, অতীতেও এভাবেই চলে আসছিল।
শেখ হাসিনা একাধারে সরকার, সংসদ ও দলীয় প্রধান হওয়ার কারণে সরকার ও দলের মধ্যে যে একটি স্বাভাবিক ও অনানুষ্ঠানিক নজরদারিত্বের কাঠামো বিরাজ করার কথা, তা ভেঙে পড়ে– যা দিনবদলের সনদের বলিষ্ঠ অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকারের দায়িত্ব ছিল দিনবদলের সনদের অঙ্গীকারগুলো সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা। আর যেহেতু নির্বাচনী ইশতেহার ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে জনগণের এক ধরনের অলিখিত চুক্তি, তাই দলের দায়িত্ব ছিল শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভাকে দায়বদ্ধ করা। একই সঙ্গে দিনবদলের সনদ কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে তা পরিবীক্ষণ করা এবং বাস্তবায়িত না হলে কেন তা হয়নি তার জন্য শেখ হাসিনা ও মন্ত্রিসভাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় প্রধান হওয়ার কারণে তা সম্ভব ছিল না।
শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আরও তিনবার তিনি এই পদে আসীন হন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পতন না হলে, তিনি আমৃত্যু প্রধানমন্ত্রী থাকতেন, কারণ তাতে কোনো আইনগত বাধা ছিল না। এইভাবে বহুদিন ধরে ক্ষমতায় থাকলে বিভিন্ন ধরনের সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সুযোগ-সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে দলে এবং সরকারে ব্যক্তিগত আনুগত্য সৃষ্টি হয়, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোকে দুর্বল করে এবং স্বেচ্ছাচারিতার জন্ম দেয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও বিশেষ বাহিনীর সদস্যরাই ঘুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নানা ধরনের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনে লিপ্ত হয়েছিল এবং দলের মধ্যে অনুগতরা জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ব্যাপকভাবে খুনখারাবিতে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। তাই স্বৈরাচারী পদ্ধতির জাঁতাকল থেকে মুক্ত হতে হলে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় লাগাম টানতে এবং মেয়াদ সীমিত করতে হবে।
মন্ত্রিপরিষদের পরিবর্তে আমাদের দেশে একটি প্রধানমন্ত্রী শাসিত ব্যবস্থা বিরাজমান। এই ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিপরিষদের কাছে দায়বদ্ধ হওয়ার পরিবর্তে মন্ত্রিপরিষদের সব সদস্যই প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায়ে ও কর্তৃত্বে দায়িত্ব পালন করেন। এ ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীই সর্বেসর্বা এবং তিনি যখন যাকে ইচ্ছা নিয়োগ দিতে এবং অপসারণ করতে পারেন। এই অসীম স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাচনের পর দলের যোগ্য, অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের পাশ কাটিয়ে শেখ হাসিনা একদল অনভিজ্ঞ ও প্রশ্নবিদ্ধ যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছিলেন, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে সাহারা খাতুন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে ডা. দীপু মনি। শেখ হাসিনার এ মন্ত্রিসভাকে তখন ‘কচিকাঁচার আসর’ বলে অনেকেই হাসি-ঠাট্টা করতেন। একই সঙ্গে তিনি পাঁচজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তাকে নিয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন এবং এই উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের সহায়তায় তিনি নিজে সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেন, যা সকল ক্ষমতা তাঁর হাতে কুক্ষিগত রাখতে সহায়তা করে। অন্যদিকে মন্ত্রিসভার সদস্যদের অনেকেই, যাদের কাঁধে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল না, নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়েন। তাই সত্যিকারের সংসদীয় পদ্ধতি প্রচলন করতে হলে আমাদের মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
২০০৯ সালের নির্বাচনের পর জিল্লুর রহমান, আবদুল হামিদ ও মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ পান; যাদের মূল যোগ্যতা হলো তারা ছিলেন অন্ধ আওয়ামী লীগ। বর্তমান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের দলীয় অন্ধত্ব প্রকাশ পায় তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি থেকে যে, রাষ্ট্রপতি হওয়ার কারণে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদধূলি থেকে বঞ্চিত হবেন। সংসদে তাদের দলের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ফলে তাদের নিয়োগের জন্য ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি– প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাই ছিল শেষ কথা। অর্থাৎ আমাদের বিদ্যমান পদ্ধতিতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী যাকে ইচ্ছা তাকে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন করতে পারেন। একই সঙ্গে সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের বলে, যে অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী এবং প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ব্যতীত সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ নিতে বাধ্য করা হয়, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর ক্রীড়নকে পরিণত হন; যা ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার চরম পরিপন্থি। তাই আমাদের ভবিষ্যতে সৎ, যোগ্য ও সুনামসম্পন্ন ব্যক্তিদের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার এবং তাদের নির্বাচকমণ্ডলী বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
আমাদের বিদ্যমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় বিচার বিভাগ রাষ্ট্রের একটি পৃথক ও স্বাধীন বিভাগ হলেও প্রধান বিচারপতি ছাড়া সকল বিচারপতিকে নির্বাহী বিভাগ তথা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ দেওয়া হয়। এই প্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করে শেখ হাসিনা পক্ষপাতদুষ্ট বিচারপতিদের উচ্চ আদালতে নিয়োগ দেন। এ ধরনের ‘কোর্ট প্রাকিং’ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা হরণ করে, যার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অতি প্রয়োজনীয় চেকস অ্যান্ড ব্যালান্স তথা নজরদারিত্বের কাঠামোকে চরমভাবে ভূলণ্ঠিত হয় এবং শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট শাসকে পরিণত করে। আমরা আনন্দিত যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার এবং বিচারক নিয়োগে যোগ্যতা বিবেচনার কিছু পদক্ষেপ সরকার ও আদালতের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই নেওয়া হয়েছে।
একটি রাষ্ট্রে অনেক ‘ইনস্টিটিউট অব অ্যাকাউন্টেবিলিটি’ থাকে, যেগুলো সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পাটাতন হিসেবে কাজ করে। এসব সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলো নির্বাচন কমিশন, সরকারি কর্মকমিশন, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, ন্যায়পাল; যাদের নিরপেক্ষতা সরকারকে দায়বদ্ধ করার জন্য অপরিহার্য। আর্থিক খাতকে দুর্নীতিমুক্ত রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বাধীনতাও আবশ্যক। কিন্তু নির্বাহী বিভাগের অংশ না হওয়া সত্ত্বেও ঐতিহাসিকভাবে এসব প্রতিষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে আসছেন। শেখ হাসিনার শাসনামলে যা চরম আকার ধারণ করে এবং এসব প্রতিষ্ঠান দুর্বল ও দলবাজির আখড়ায় পরিণত হয়। এ কথা কারও অজানা নয় যে, গত শেখ হাসিনার আমলে নির্বাচন কমিশনে পক্ষপাতদুষ্ট ব্যক্তিদের নিয়োগের মাধ্যমে আমাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়। দলীয় অনুগতদের বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করার মধ্য দিয়ে আমাদের ব্যাংকিং খাতকে লুটপাটের আখড়ায় পরিণত করা হয়। তাই এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যোগ্য ও দলনিরপেক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রদানের বিকল্প নেই। শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট শাসকে পরিণত করতে বড় ভূমিকা রেখেছে সংসদে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা– আলেসক্স টকোভিলের ভাষায়, ‘টিরানি অব দ্য মেজরিটি’– কাজে লাগিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা– যা আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছে। সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটির সর্বসম্মত সুপারিশ উপেক্ষা করে প্রচলিত পদ্ধতিতেই সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে এটি পাস করা হয়, যার মাধ্যমে শেখ হাসিনার একচ্ছত্র ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হয়। তাই কথায় কথায় এবং স্বার্থপ্রণোদিতভাবে ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধন বন্ধ করতে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের এবং সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কোনো বিকল্প নেই।
পরিশেষে, ক্ষমতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর কুক্ষিগত হওয়া ও অপব্যবহার করা। সাংবিধানিকভাবে অগাধ ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রচলিত বিধি-বিধান, পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করেই আরও ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন এবং চরম স্বৈরাচারী দানবে পরিণত হন। তাই প্রচলিত পদ্ধতিতে হাঁটলে নতুন গন্তব্যে কোনোভাবেই পৌঁছা যাবে না। অর্থাৎ কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক গন্তব্যে পৌঁছতে হলে কতগুলো সুদূরপ্রসারী সংস্কার কার্যক্রমের মাধ্যমে আমাদের বিদ্যমান শাসন কাঠমোর আমূল পরিবর্তন করতে হবে।