সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৩৭ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

বাংলাদেশ কখন হবে অপরাজেয়

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: রবিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২১ বার পড়া হয়েছে

সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফের মহান লক্ষ্যকে বক্ষে ধারণ করে ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এই সব মহান লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে ধারণ করা হয়েছিল গণতন্ত্র। মূলত গণতন্ত্র অর্জনের জন্যই মুক্তিযুদ্ধে শত-সহস্র মানুষ শহীদ হয়েছেন। ১৯৭০-এ পাকিস্তানব্যাপী প্রথমবারের মতো যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ আওয়ামী লীগের পক্ষে বিপুলভাবে রায় দেয়। নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘এক লোক এক ভোটের’ নীতির ভিত্তিতে। তখন পাকিস্তানের ৫৬ শতাংশ মানুষের বাস ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ জন জাতীয় সংসদ সদস্যের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসন পেয়ে পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয়।

লক্ষণীয় যে আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে কোনো আসন পায়নি। পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপলস পার্টি ৮৭টি আসন পেয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হয়। পিপলস পার্টিও পূর্ব পাকিস্তানে কোনো আসন পায়নি, এবং পাওয়ার চেষ্টাও করেনি। এভাবে রাজনৈতিকভাবে পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয়ে পড়ে। তারপরও পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার স্বার্থে সামগ্রিকভাবে উচিত ছিল পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা, কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ আওয়ামী লীগের হাতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতা তুলে দিতে কিছুতেই রাজি ছিল না। এ জন্য তারা নানা টালবাহানার আশ্রয় নেয়। ঘোষিত জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার এই ঘোষণায় ঢাকাসহ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে তুমুল বিক্ষোভ ও অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়।

জনতার পক্ষ থেকে বিশেষ করে ছাত্র-তরুণদের পক্ষ থেকে স্বাধীনতার দাবি উচ্চারিত হতে থাকে। মানুষও ভাবতে শুরু করে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের কাঠামোতে থাকা সম্ভব নয়। ২৩ মার্চ ১৯৭১ সমগ্র বাংলাদেশে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলিত হয়। পাকিস্তান সামরিক বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও রসদ এনে নিজেদের ক্ষমতার ভিত্তি পাকাপোক্ত করতে থাকে। সময় থাকতে বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসাররা শেখ মুজিবকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে আহ্বান জানালেও তিনি সে পথে পা বাড়াননি। ২৫ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর ক্র্যাকডাউন শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ আগে তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীনতার ঘোষণা লিখে একটি টেপরেকর্ডারসহ শেখ মুজিবের কাছে নিয়ে গেলেও শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে রাজি হননি। বরং তিনি বললেন, ‘তোমরা কি চাও এটাকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানিরা আমাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করুক?’

স্বাধীনতার পক্ষে ব্যাপকভাবে গণসম্মতি সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও একটি স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য যে প্রস্তুতির প্রয়োজন, সেই প্রস্তুতি শেখ মুজিব ও তাঁর আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেননি। প্রয়োজন ছিল একটি দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের প্রস্তুতি গ্রহণ। আওয়ামী লীগের মতো একটি নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিভূদের পক্ষে একটি সত্যিকারের দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের সূচনা করা ছিল কল্পনাতীত। মার্কস প্রুশীয় বুর্জোয়াদের সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘এরা নিজেদের উপর আস্থাহীন, জনগণের প্রতি আস্থাহীন; ঊর্ধ্বতনের প্রতি অসন্তুষ্ট, অধঃস্তনদের সম্মুখে কম্পমান, উভয়পক্ষের প্রতি স্বার্থপর ও সেই স্বার্থপরতা সম্বন্ধে সচেতন, রক্ষণশীলদের কাছে বিপ্লবী এবং বিপ্লবীদের কাছে রক্ষণশীল, নিজেদের আদর্শ সম্বন্ধেই অবিশ্বাসী, আদর্শের বদলে বাগাড়ম্বরপ্রিয়, বিশ্বঝঞ্ঝায় আতঙ্কিত অথচ বিশ্বঝঞ্ঝাকেই নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে তৎপর; কোনো ব্যাপারেই উদ্যোগ নেই এবং প্রতি ব্যাপারেই কুম্ভীলকবৃত্তি; মৌলিকতার অভাবে মামুলী আবার মামুলীপনার ক্ষেত্রে মৌলিক; নিজেদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে দরকষাকষিতে মত্ত, উদ্যোগহীন, নিজেদের উপর আস্থাহীন, জনগণের উপর আস্থাহীন এবং বিশ্ব-ঐতিহাসিক ভূমিকাহীন; একটি বলিষ্ঠ জাতির প্রথম যৌবনের উত্তেজনাকে পরিচালিত ও স্বীয় স্থবির স্বার্থে তাকে বিচ্যুত করার দায়িত্ব-দণ্ডিত এক জঘন্য বৃদ্ধ– চক্ষুহীন, কর্ণহীন, দন্তহীন, সর্বইন্দ্রিয়হীন– [সূত্র: মার্কস-এঙ্গেলস রচনা সংকলন, ১ম খণ্ড, ১ম অংশ, ৬১ পৃষ্ঠা]।’

আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও রাজনৈতিক আচরণ বোঝার জন্য কার্ল মার্ক্সের এই উদ্ধৃতাংশটি খুবই প্রাসঙ্গিক। এরা ছিল ঊর্ধ্বতন অর্থাৎ পাকিস্তান শাসক-শ্রেণির প্রতি বিরক্ত এবং অধঃস্তন পূর্ব পাকিস্তানি শ্রমিক কৃষক ও সাধারণ মানুষের ভয়ে আতঙ্কিত। এরা সমাজতন্ত্রের বুলি কপচালেও কখনই মানতে পারেনি যে এ দেশে শ্রমিকরাজ ও কৃষকরাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। নিদেনপক্ষে শ্রমিক-কৃষকদের দাবি উচ্চারণের জন্য যে গণতন্ত্রের প্রয়োজন, সেই গণতন্ত্রকেও এরা বিকশিত হতে দেয়নি; বরং গলা টিপে হত্যা করেছে।

সাড়ে সাত কোটি জনগণের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা ও সংগঠিত করার জন্য যে শক্তি, সাহস, উদ্যম ও উদ্যোগের প্রয়োজন আওয়ামী লীগের সেসবের কিছুই ছিল না। এ কারণে তারা পুরো মুক্তিযুদ্ধকে ভারতীয় আধিপত্যবাদের হাতে তুলে দেয়। ভারতও সে-কাজ সানন্দচিত্তে সাধন করে। কারণ বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রে পরিণত করা তাদের লক্ষ্য ছিল না। তাদের লক্ষ্য ছিল চিরশত্রু পাকিস্তানকে দ্বিখণ্ডিত করে দুর্বল করা এবং তাদের সামরিক স্ট্র্যাটেজিগত স্বার্থ উদ্ধার করা। মুক্তিযুদ্ধের সময় অধ্যাপক সমর গুহের নেতৃত্বে একদল ভারতীয় বুদ্ধিজীবী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশকে যেন একাত্তর সালের বিরল সুযোগে ভারত দখল করে নেয়। ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন ধীমান রাজনীতিক। তিনি অতটা উলঙ্গ হতে চাননি। অত্যন্ত কৌশলী উপায়ে বাংলাদেশকে নামমাত্র স্বাধীন করে দিয়ে এর ওপর সাত দফা গোপন চুক্তিসহ নানান শর্তের বেড়াজাল চাপিয়ে দিয়ে দেশটিকে তিনি এক ধরনের করদরাজ্যে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। যে কারণে আজকের দিন পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণ সময়ে-সময়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠলেও শেষ পর্যন্ত কেন যেন তার স্বাধীন সত্তাকে অক্ষুণ্ন রাখতে পারে না। ভারতীয় শৃঙ্খলের জাল ছিন্ন করে বাংলাদেশের পক্ষে একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের সেই স্বাধীনতা বেহাত হয়ে যায়।

তবুও বলব, ‘বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা/ এর যত মূল্য সে কি ধরার ধুলায় হবে হারা।’ আমার বিশ্বাস সেদিন যারা মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জান বাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন, যুদ্ধের ময়দানে অকাতরে আত্মাহুতি দিয়েছিলেন, তাঁদের আত্মাহুতি ব্যর্থ হবার নয়। তাঁদের রক্তে সিক্ত হয়ে এ মাটিতে আজ হোক, কাল হোক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পত্রপল্লবশোভিত বৃক্ষ একদিন গোটা জাতিকে তার স্নিগ্ধ ছায়ায় আবৃত করে নেবে। বাংলাদেশ হবে অপরাজেয়। তবে এর জন্য প্রয়োজন নিষ্ঠা ও দেশপ্রেম। প্রয়োজন আরও আত্মাহুতি, আরও রক্তদান।

একটি পতাকা ও একটি জাতীয় সংগীত নিয়ে বাংলাদেশ নামমাত্র স্বাধীন হলেও এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গজুড়ে থেকে গেল আধিপত্যবাদের খামচে খাওয়া আঁচড়। সেই আঁচড় থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই একাধিক গণঅভ্যুত্থান হয়েছে।

নামমাত্র স্বাধীনতার পর শেখ মুজিব শপথ না নিয়েই হয়ে গেলেন রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী। ভারতীয় সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার হলেও লিখিত হলো পঁচিশ বছরের তথাকথিত বন্ধুত্ব ও মৈত্রী চুক্তি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনানায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানীকে দেখতে পেলাম না। সারেন্ডার ডকুমেন্টটি স্বাক্ষরিত হলো ভারত ও পাকিস্তানের সেনাকর্মকর্তাদের দ্বারা। বিজয় তো এভাবেই ছিনতাই হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা রেখেছিল বেঙ্গল রেজিমেন্টের জোয়ান ও তরুণ অফিসাররা। বাংলাদেশের জন্য একটি সামরিক বাহিনী গঠিত হলো, কিন্তু সেই বাহিনীকে অস্ত্রশস্ত্রে, পোশাক-আশাকে চরমভাবে বঞ্চিত করে রাখা হলো। অন্যদিকে ভারতীয় সামরিক বাহিনী এ দেশের ক্যান্টনমেন্টগুলো থেকে অস্ত্র-গোলাবারুদ থেকে শুরু করে সব ধরনের মূল্যবান সামগ্রী ট্রাকে করে লুট করে নিয়েছে। এগুলোর মূল্য ছিল হাজার হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ভারত কর্তৃক লুট করা অস্ত্র নিয়ে বিতর্ক হলে সিদ্ধান্ত হলো, ভারতের কাছ থেকে অস্ত্রগুলো ফিরিয়ে আনতে একটি ডেলিগেশন যাবে। এই ডেলিগেশনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ। ভারত মাত্র ১৪টি ফিল্ডগান ফেরত দিল। এ যেন বলা, ‘লিখে রেখো এক ফোঁটা দিলেম শিশির’। সীমান্তে মুক্তবাণিজ্যের নামে বাংলাদেশ থেকে কৃষিজ পণ্যসহ নানা ধরনের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী চোরাচালান হতে থাকল। বাংলাদেশের পাটকলগুলো হতশ্রী হয়ে পড়ল, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের হুগলি নদীর দুই তীরে ৩০টি পাটকল সরগরম হয়ে উঠল। ভারতের দাবিতে শেখ মুজিবুর রহমান ফারাক্কা বাঁধের লিংক-ক্যানেল চালু করতে রাজি হলেন ছয় সপ্তাহের জন্য। কিন্তু সেই ক্যানেল অদ্যপি চালু আছে। বাংলাদেশের পদ্মা নদী পানিবঞ্চিত হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ভূ-প্রকৃতির অপরিমেয় ক্ষতি হচ্ছে। সেদিন শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশটা ছোট হলেও আমাদের হৃদয় অনেক বড়। আমরা উদারতা দেখাতে জানি।’ সেই উদারতার বিষময় ফলে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে মরূকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নোনাপানির আগ্রাসন বাড়ছে।

১৯৭৪-এ এ দেশে এক মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। ঢাকার রাজপথে অভুক্ত হাড্ডিসার মানুষগুলো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল। আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম বেওয়ারিশ লাশ দাফন করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছিল। সরকারি হিসাবে দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা সাড়ে ২৬ হাজার। অমর্ত্য সেনের গবেষণায় সংখ্যাটি ১৫ লাখ। দুর্ভিক্ষে মানুষের অসহায় মৃত্যু দেখে ক্ষুব্ধ কবি রফিক আজাদ লিখেছিলেন, ‘ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো।’ এই হারামজাদাটি কে, এই কবি তা স্পষ্ট করেননি।

দুর্ভিক্ষ, অনাহার, গণতন্ত্রহীনতা ও মানুষের অধিকারহীনতা নির্বাচনে জালিয়াতি প্রভৃতি মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে আওয়ামী লীগকে একটি গণবিচ্ছিন্ন দলে পরিণত করে। শেখ মুজিব নিজের গণবিচ্ছিন্নতা উপলব্ধি করে রাষ্ট্রের ওপর একক কর্তৃত্ব স্থাপনের লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় বাকশাল শাসন কায়েম করেন। এটি বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী হিসেবে পরিচিতি পায়। সংসদে কোনো আলোচনা ছাড়াই মাত্র ১২ মিনিটে এই প্রস্তাব পাস করা হয়। সেই থেকে দেশের সমুদয় সংবাদপত্র বাতিল করে মাত্র চারটি সংবাদপত্র সরকারি মালিকানায় চালু করা হয়। এভাবেই বাংলাদেশের মুমূর্ষু গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকা হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থা খুব বেশিদিন টিকে থাকেনি। একই বছর ১৫ আগস্ট সামরিক বাহিনীর একাংশের অভ্যুত্থানে দুই কন্যাসন্তান ব্যতিরেকে শেখ মুজিব তাঁর পরিবারের সমুদয় সদস্যসহ নিহন হন। শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের এই মৃত্যু নির্মম ছিল, কিন্তু নিরর্থক ছিল না। সেদিন এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাজধানী ঢাকায় কোনো প্রতিবাদ হয়নি। জনগণ আনন্দ-উৎসব করে মিষ্টি বিতরণ করেছে। সেদিন ছিল শুক্রবার। বায়তুল মোকাররম মসজিদে মুসল্লিদের ছিল উপচে পড়া ভিড়। অনেকে বলেন, এই মুসুল্লিরা সমবেত হয়েছিল আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করতে। বাংলাদেশের মাটি খুবই অদ্ভুত। এই মাটিতে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদীর জন্ম হলেও তারা খুব বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর তাঁরই ঘনিষ্ঠজন খন্দকার মোশতাক অভ্যুত্থানকারীদের সমর্থনে রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে আসীন হলেন। চতুর্থ সংশোধনী হিসেবে সেই সময় প্রেসিডেন্সিয়াল সিস্টেম চালু ছিল। প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভায় যারা শপথ গ্রহণ করেন তারা সবাই ছিলেন আওয়ামী লীগেরই সাবেক মন্ত্রী কিংবা সংসদ সদস্য। এমন ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই সম্ভব। অনেকেই বলেন, বন্দুকের নলের ভয় দেখিয়ে তাদের মন্ত্রী হিসেবে শপথ পড়ানো হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এঁদের মধ্যে একজনও কি ছিলেন না যিনি সৎসাহস দেখিয়ে মন্ত্রিসভায় যোগদানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করবেন? এ থেকেই বোঝা যায় মার্ক্সের উক্তিটি কত প্রাসঙ্গিক ছিল।

এরপর বাংলাদেশের ইতিহাস সেভাবে সংঘাত থেকে মুক্ত হতে পারেনি। ’৭৫-এর ৩ নভেম্বরে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যুত্থানের পর মোশতাক সরকারের পতন ঘটে। ওই সময় আরেকটি ট্র্যাজিক ঘটনা ঘটে।  কারা-অভ্যন্তরে আওয়ামী লীগের চারজন প্রসিদ্ধ নেতা নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। একটি সভ্য জাতির জন্য এটি বড় কলঙ্কের দাগ। ৪ নভেম্বর ১৯৭৫ সিপিবির নেতৃত্বে মোশতাকের ক্ষমতা গ্রহণের বিরুদ্ধে মিছিল বের হয়। এই মিছিলে খালেদ মোশাররফের মা ও ভাই রাশেদ মোশাররফ অংশগ্রহণ করলে জনগণ ধরে নেয় এটা আওয়ামী-ভারতীয় ষড়যন্ত্র। খালেদ মোশাররফ চিহ্নিত হন ভারতপন্থি রূপে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে সিপাহি অভ্যুত্থান ঘটে। অভ্যুত্থানে সিপাহিরা বন্দি সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে। ঢাকার রাজপথে সৈনিক-জনতার ঢল নামে। সিপাহিরা জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ স্লোগান দেয়। এইভাবে জিয়াউর রহমান ক্ষমতার পাদপ্রদীপের নিচে অবস্থান নেন। তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ ছিল তিনি তাঁর পাকিস্তানি উপরস্থ সেনাকর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জানজুয়াকে হত্যা করে বিদ্রোহের ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। হতবিহ্বল জাতি সেদিন একটা দিকনির্দেশনা পেয়ে বলীয়ান হয়ে উঠেছিল।

সেনাপ্রধান হলেও জিয়াউর রহমান গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে খুবই ব্যতিক্রমী ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন করেন, যার সুবাদে আওয়ামী লীগও একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে আবার প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তিনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন এবং দেশে একটি নির্বাচিত সংসদের জন্ম দেন। এই সংসদে বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক মতাদর্শের নেতৃবৃন্দ স্থান লাভ করেন। ফলে এই সংসদের মধ্য দিয়ে সকল মত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পায় এবং গণতন্ত্রের শত ফুল প্রস্ফুটিত হয়। রাজনৈতিক চিন্তাবিদরা এই সংসদকে একটি রেইনবো পার্লামেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

রংধনুতে সাতটি রং পাশাপাশি থেকে যে বিচিত্র ও চোখ জোড়ানো আবহের সৃষ্টি করে ঠিক সেভাবে এই সংসদ সকল মতের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চ হয়ে গণতন্ত্রের জন্য একটি বিরল ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

জিয়াউর রহমান খুব বেশিদিন বেঁচে থাকেননি। একটি সামরিক অভ্যুত্থানে তাঁর মৃত্যু হয়। সন্দেহ করা হয়, এই অভ্যুত্থান ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর কারসাজিতে সংঘটিত হয়েছিল। জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব এবং গণতন্ত্র অনেক বেশি সংহত হতে পারত। এরপর এলো ৯ বছরব্যাপী এরশাদের স্বৈরশাসন। অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসক এরশাদের পতন হয়। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া যে দৃঢ়তা ও আপসহীনতা প্রদর্শন করেন, তা তাঁকে গণতন্ত্রের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে। একই সময়ে শেখ হাসিনা গণতন্ত্রের কথা বললেও স্বৈরশাসকের সঙ্গে তাঁর যোগসাজশ তাঁকে একজন অনির্ভরযোগ্য নেতায় পরিণত করে। ১৯৮৬-এর নির্বাচনে যদি কেউ অংশগ্রহণ করে তাহলে তিনি হবেন জাতীয় বেইমান, চট্টগ্রামে এই ঘোষণা দিয়ে শেখ হাসিনা পরদিন ১৯৮৬-এর নির্বাচনে অংশ গ্রহণের ঘোষণা দেন। সেই সময়ে জামায়াতে ইসলামীও আওয়ামী লীগের পদাঙ্ক অনুসরণ করে।

অনেকেই ধারণা করেছিল নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ১৯৯১-এ অনুষ্ঠিত বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে। কিন্তু নির্বাচনের ফল ভিন্ন এক বাস্তবতা সৃষ্টি করে। নির্বাচনে বিএনপি খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এর কারণ নির্বাচনের আগে তাঁর ঘোষণা ছিল, ‘ওদের হাতে গোলামির জিঞ্জির, আমাদের হাতে স্বাধীনতার পতাকা।’ তাঁর এই বক্তব্য বাংলাদেশের আধিপত্যবাদবিরোধী মানুষকে দারুণভবে উদ্বুদ্ধ করে। কার্যত অসংগঠিত বিএনপি নির্বাচনে ঈর্ষণীয় ফল অর্জন করে। আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল শেখ হাসিনার মুখনিঃসৃত কটুকাটব্য। তিনি জিয়াউর রহমানকে একজন অখ্যাত মেজর হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি এই বক্তব্য দিয়েছিলেন নির্বাচন উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে ভাষণের মধ্য দিয়ে। এতে জনগণ দুঃখ পায়। এবং তারা তাদের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় নির্বাচনী ফলে তাদের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।

১৯৯১ সালে বিএনপি যে সরকার গঠন করে, সেই সরকার শান্তিতে দেশ চালাতে পারেনি। যদিও নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চোখে বিএনপির সেই পাঁচ বছর ছিল সুশাসনের দিক থেকে অনেকটাই গ্রহণযোগ্য। বিএনপি সেই সময় শিক্ষার জন্য খাদ্য কর্মসূচি চালু করে গ্রামাঞ্চলে শত-সহস্র নারী ও শিশুকে শিক্ষাঙ্গনে নিয়ে আসে। কর হিসেবে ভ্যাটের প্রবর্তন অর্থনীতিকে জোরদার করে। উন্নয়ন প্রকল্পে দেশীয় অর্থায়ন ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। কিন্তু ওই সময় শুরু হয় আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে এক ধ্বংসাত্মক আন্দোলন। এই আন্দোলনে বিএনপি সরকার কোণঠাসা হয়ে পড়ে, এবং সবশেষে ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি বিতর্কিত নির্বাচন দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাস করে ওই সংসদ ভেঙে দেয়। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। বিএনপি ১১৬ আসন নিয়ে বড় বিরোধী দলে পরিণত হয়। তখন থেকেই আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের অঙ্কুরোদগম শুরু হতে থাকে। পরিণতিতে ২০০১-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে পরাজিত হয় এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট জয়লাভ করে। কিন্তু এ যাত্রা বিএনপি নিজের ভারেই নিচ থেকে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে অসংগতি পরিলক্ষিত হয়। শেষ পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ম্যানিপুলেট করার অভিযোগে বিএনপি অভিযুক্ত হয়। কারণ এই সময়ে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অবসরে যাওয়ার সময়সীমা দুই বছর বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তবে এই বৃদ্ধি করার জন্য উচ্চ আদালতের বিচারকদের দাবি ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগীরা এমন একটি অবস্থা সৃষ্টি করল, যাতে মনে হয়েছিল বিএনপি কারসাজি করে ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়। সবচাইতে ভুল সিদ্ধান্ত হয়েছিল প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ। ইয়াজউদ্দিন নানাভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দেন এবং এই সুযোগে সেনাবাহিনীর উচ্চাভিলাষী প্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ সুযোগ গ্রহণ করেন, দেশে এক-এগারোর সেনাসমর্থিত সংবিধানবহির্ভূত একটি সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এখান থেকেই সূচনা হয় ভারতীয় আধিপত্য জোরদার করার আরেকটি অধ্যায়। জেনারেল মইন নিছক তাঁর চাকরি রক্ষার্থে ভারতীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ প্রণব মুখার্জীর মুখাপেক্ষী হন। এইভাবে ভারত, মইন ইউ আহমেদ ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি সমঝোতার মাধ্যমে ২০০৯-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে বিজয় দেশে ফ্যাসিবাদী অধ্যায়ের প্রবর্তন ঘটায়। এই ফ্যাসিবাদী শাসনের রূপ আমরা দেখেছি মিথ্যা মামলা, গায়েবি মামলা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, হাজার হাজার বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীর কারারুদ্ধকরণ, গুম, খুন ও আয়নাঘরের তাণ্ডবের মধ্য দিয়ে। প্রাণবন্ত বাংলাদেশিরা পরিণত হলো প্রায় প্রাণহীন এক মৃতবৎ সত্তায়। প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের আন্দোলন চলতে থাকল, কিন্তু সহজে সাফল্যের মুখ দেখা গেল না।

সকল দুঃখের পর, সকল অন্ধকার রাত্রির পর এলো ২০২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান। এই গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিল তরুণ ছাত্র-জনতা। দুই হাজারের অধিক ছাত্র-জনতা শহীদ হলো। রংপুর রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বুক চিতিয়ে নিজ বক্ষে পুষ্পমাল্যের মতো বুলেটকে বরণ করে নিয়ে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানের জন্ম দিল। এই অভ্যুত্থানে সহস্রজন শহীদ হয়েছে।  কয়েক সহস্র আহত হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেছে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে জীবন রক্ষার জন্য তাঁর নিজ প্রভুর দেশ ভারতে পালিয়ে যেতে হয়েছে। বিশাল এই অভ্যুত্থানের পর আমরা আবারও নতুন করে গণতন্ত্রের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। কিন্তু আমাদের এই স্বপ্ন দেখা কতটা সফল হবে সেটা কেবল ভবিতব্যই বলতে পারে। অভ্যুত্থানটি হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে। বৈষম্য বজায় রেখে গণতন্ত্র সফল হয় না। বৈষম্যমূলক সমাজে টাকার জয় হয়, ধনীদের জয় হয়, যারা বিত্তহীন, যারা বঞ্চিত, তারা অসম প্রতিযোগিতায় মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। শেখ হাসিনার শাসনামলে তৈরি হয়েছিল অলিগার্কদের একটি গোষ্ঠী। নানান সংস্কার ও হত্যাকাণ্ডের বিচারের কথা বলা হলেও অলিগার্করা ধরাছোঁয়ার বাইরেই যেন থেকে যাচ্ছে। এরা শেখ হাসিনার সহযোগিতায় রাষ্ট্রযন্ত্রটিকে দখল করে নিয়েছিল। দখল করে নিয়েছিল ব্যাংকের ভল্টগুলো। বিদেশে লক্ষ-কোটি ডলার পাচার করে জাতীয় অর্থনীতিকে এরা ফোকলা করে দিয়েছে। এই অলিগার্কদের চূর্ণ-বিচূর্ণ না করতে পারলে জনগণ সত্যিকার গণতন্ত্রের স্বাদ পাবে না। অলিগার্কদের চূণ-বিচূর্ণ করে দেশে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির শাসনতান্ত্রিক বিতর্কেরও অনেক বাইরে। সেদিকে যদি যাত্রা করা না যায়, তাহলে এবারের গণঅভ্যুত্থান থেকেও বড় কোনো সুফল আসবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা যায় না। ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে সমাজে, প্রফেসর গলব্রেইথ যাকে বলেছেন ‘কাউন্টারভেইলিং পাওয়ার’, সেই পাওয়ারটা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকজন অধ্যাপক ব্যারিংটন মুর বলেছেন, বুর্জোয়া না থাকলে গণতন্ত্র হয় না।

বাংলাদেশে যে বুর্জোয়া আছে সেই বুর্জোয়া হলো লুটেরা বুর্জোয়া। এই বুর্জোয়া উৎপাদনমুখী নয়, এই বুর্জোয়া উদ্ভাবনমুখী নয়, এই বুর্জোয়া ঝুঁকিগ্রহণকারী নয়, এবং এই বুর্জোয়া পরগাছা শ্রেণির। একটি স্বাধীন দেশে গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে প্রয়োজন দেশপ্রেমিক জাতীয় বুর্জোয়ার, এবং তার সঙ্গে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের বৃহত্তর ঐক্য। কোথায় সেই বুর্জোয়া? কোথায় শ্রমিক-কৃষকদের চেতনার দিক থেকে সত্যিকারের শ্রমিক-কৃষক হয়ে ওঠা। কবে কখন এ দেশের মেহনতি সর্বহারা মানুষ ‘ক্লাস ফর ইটসেল্ফ’ হয়ে উঠবে। কেবল সেদিন আমরা গণতন্ত্রের স্বাদ গ্রহণ করতে পারব। এ দেশের মুক্ত আকাশের সূর্যের নিচে সব মানুষ প্রাণভরে বলবে, আমরা সবাই সমান, আমরা সবাই একে অপরের ভাইবোন। আমাদের লড়াই চলবে অংশীদারিত্বমূলক সমৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে, দারিদ্র্য ও ক্ষুধার চির-অবসান ঘটিয়ে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com