সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
অন্তত তিনবার পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে জান্নাতি হোসেনের জীবনে। প্রথম ঘটনা এক্কেবারে শৈশবে, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়। শীতের ছুটিতে শরীয়তপুরে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন। সাঁতার না জেনেই নেমেছিলেন কীর্তিনাশা নদীতে।
পরে চাচা এসে তাঁকে উদ্ধার করেন। এমন ঘটনা আরো দুবার ঘটে।
সেই জান্নাতি এখন সাগরতলে নিয়মিত সাঁতার কাটেন। পেশাদার ডাইভমাস্টার হতে এরই মধ্যে সব কোর্স সম্পন্ন করেছেন।
হয়েছেন দেশের প্রথম পেশাদার নারী স্কুবা ডাইভার। স্বনামধন্য ডাইভমাস্টার ও আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার শরীফ সারোয়ার বললেন, ‘জান্নাতিই দেশে প্রথম এবং সম্ভবত একমাত্র নারী ডাইভমাস্টার। ইনস্ট্রাক্টর ডেভেলপমেন্ট কোর্স সম্পন্ন করলে ডাইভিং শিখতে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদানের সুযোগ পাবেন তিনি।’
এখন সাগরজলের সঙ্গে গভীর বন্ধন গড়ে উঠেছে জান্নাতির।
শৈশবেই শুনেছেন—কিছু কাজ মেয়েদের জন্য ‘কঠিন’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’। কিন্তু কিছুতেই দমে যাওয়ার পাত্রী নন তিনি। এই অদম্য মনোবলই জান্নাতিকে নিয়ে গেছে সাফল্যের শিখরে।
সব বাধা পেরিয়ে : তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় জান্নাতি। বড় হয়েছেন ঢাকায়।
ছোটবেলা থেকে নতুন কিছু করার মধ্যে আনন্দ পেতেন। কৈশোরে সাইকেলে এলাকা চষে বেড়াতেন।
একদিন শুনলেন এলাকার এক মেয়ে সাইকেল চালাতে বের হয়ে নিখোঁজ হয়েছে। এর পর থেকে জান্নাতির সাইকেল চালানো বারণ। এবার তাঁকে স্কুলে আনা-নেওয়ার দায়িত্বে থাকা চাচার কাছে ড্রাইভিং শিখতে লাগলেন।
সেই থেকে গাড়ি চালাতে খুব পছন্দ করেন। কিন্তু এখন শহরে এমন রাস্তা খুব কমই আছে, যেখানে নির্ভার হয়ে ড্রাইভ করা যায়। তাই বেছে নিলেন ‘জ্যামমুক্ত’ জলরাশিকে।
দেশের প্রথম পেশাদার নারী স্কুবা ডাইভার
জান্নাতি হোসেন
১৮ বছরেই সাত ভাষা : এ লেভেল শেষ করে চার বছর ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন জান্নাতি। ১৮ বছর বয়সের মধ্যে শিখে ফেলেছেন সাতটি ভাষা। ফটোগ্রাফি ও গাড়ি মডিফিকেশন ব্যবসা চালিয়েছেন। বছরখানেক একটি স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। পরে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজিতে স্নাতক হলেন।
নিজেকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দেখতে চেয়েছেন জান্নাতি। বেশ কয়েকটি উদ্যোগে লোকসান হলেও হাল ছাড়েননি। ফ্রিল্যান্সিংয়ে নিজের অন্যান্য দক্ষতা কাজে লাগিয়েছেন। কভিডের সময় ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান হয়। পরে স্কুবা ডাইভিংয়ে গুরুত্ব দেন। বললেন, ‘দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সময়ের সঙ্গে আমার ব্যবসা আবার ঘুরে দাঁড়াবে, আর স্কুবা ডাইভিংয়ের এই নতুন যাত্রা আমাকে আমার দেশের মানুষের কাছে এক অনন্য স্পোর্টস পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে।’
সেন্ট মার্টিন থেকে শুরু : জান্নাতির জলের নিচে অভিযানের শুরু সেন্ট মার্টিনে। গিয়েছিলেন একটি মেরিন কনজারভেশন সংগঠনের সঙ্গে। সেখানে বাংলাদেশের প্রথম আন্ডারওয়াটার ক্লিন-আপ আয়োজক দলে ছিলেন। দ্বীপের কচ্ছপ সংরক্ষণ কার্যক্রমেও অংশ নেন। বললেন, ‘এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আমাকে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি আরো গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।’
রাতের সমুদ্রে প্রথমবার : ২০১৮ সালে ঘুরতে গিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। নীল জলরাশি ও বিশুদ্ধ বাতাস উপভোগ করতে করতেই খোঁজ নিলেন স্কুবা ডাইভিংয়ের। সেরে ফেললেন দুটি কোর্স।
দ্বিতীয় পর্বের প্রশিক্ষণে রাতেও ডুব দিতে হয় সাগরে। চমকের তখনো বাকি। কারণ সাগরতলের দৃশ্যটা ওপরের তুলনায় একেবারে ভিন্ন। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। যদিও হাতে লাইট ছিল, কিন্তু চালানোর মতো শক্তি নেই মনে!
জান্নাতি বললেন, ‘প্রথমবার যখন রাতের সমুদ্রে ডুব দিয়েছিলাম, তখন মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়ছিলাম। চারপাশের গভীর অন্ধকারে মনে হচ্ছিল যেন কবরের ভেতরে আছি। ইনস্ট্রাক্টরের পিছু পিছু যাচ্ছিলাম, শুধু তাঁর টর্চের আলোয় যেগুলো দেখাচ্ছিলেন সেগুলোই দেখতাম। কিন্তু ডাইভ শেষ হওয়ার আগেই দেখি স্কুইড, কাঁকড়া, ইল আর অনেক নিশাচর প্রাণী।’ সেই অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছে জান্নাতিকে। এখন রাতের ডাইভ তাঁর বেশি পছন্দের।
ডাইভমাস্টার : এখন তিনি সনদধারী ডাইভিং শিক্ষক। ‘ডাইভমাস্টার’ কোর্সের আগে মুক্ত পানির ডুবুরি, অগ্রগামী মুক্ত পানির ডুবুরি এবং উদ্ধারকারী ডুবুরি নামে আরো তিনটি কোর্স সম্পন্ন করেছেন। উদ্ধারকারী ডুবুরি হওয়ার আগে অবশ্য আরেকটা সনদ নিতে হয়। নাম ইমার্জেন্সি ফার্স্ট রেসপন্স (ইএফআর)। আপৎকালীন তৎক্ষণাৎ সাড়া দেওয়া ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা অর্জনে শিখতে হয় এটি। এ ছাড়া ‘প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ডাইভিং ইনস্ট্রাক্টরস (পিএডিআই)’ নামক ডুবুরি প্রশিক্ষকদের বৈশ্বিক পেশাজীবী সংগঠনেরও সদস্যপদ পেয়েছেন।
প্রথম তিনটি কোর্সে গড়ে চার-পাঁচ দিন করে সময় লাগে। ‘ডাইভমাস্টার’ কোর্স সম্পন্ন করতে জান্নাতির লেগেছে প্রায় দুই মাস। লিখিত পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হয়েছে।
প্রশিক্ষক ও কোর্স পরিচালকের সনদ অর্জনের জন্য কয়েক মাসের মধ্যেই ভর্তি হবেন ‘ইনস্ট্রাক্টর ডেভেলপমেন্ট কোর্সে’। যাঁরা ডাইভিং শিখতে আগ্রহী, তাঁদের শেখানো ও সার্টিফাই করার সুযোগ পাবেন তিনি।
নিরাপত্তাই প্রথম : এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপ ও বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ডাইভ করেছেন জান্নাতি। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, রেড সি, আর ক্যারিবিয়ান সাগরের বোনায়ের দ্বীপে ডাইভ করতে চান ভবিষ্যতে। স্কুবা ডাইভিং যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি একটু এদিক-সেদিক হলেই ঘটে যেতে পারে বড় বিপত্তি।
তেমনি এক ঘটনার কথা জানালেন জান্নাতি। ডাইভমাস্টার ট্রেনিংয়ের সময় জান্নাতির সঙ্গে ছিলেন এক প্রবীণ মহিলা ডাইভার। খুবই ফিট। বয়স ষাটের কোঠায়। তিনি অসাধারণ একজন ডাইভার হলেও সেদিন নিরাপত্তাবিধি ঠিকঠাক মানেননি। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি ডাইভ করেছিলেন। ফলে পানির নিচেই স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরে তাঁকে দ্রুত হাইপারবারিক চেম্বারসহ চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। বললেন, ‘সেদিন বুঝলাম, স্কুবা ডাইভিং যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি দায়িত্বশীলতার জায়গাও বিশাল। একজন পেশাদার ডাইভার হিসেবে নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা আর অন্যদের সঠিকভাবে গাইড করাই আমার প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’
ডাইভ শপ খোলার স্বপ্ন : গাড়ির মডিফিকেশন শপ চালানোর সময় ‘টর্ক’ নামে গাড়ি সম্পর্কিত ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন জান্নাতি। মূলত দেশের গাড়ি সেক্টরের সর্বশেষ খবর প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করত এটি। এখন সেটার প্রকাশনা বন্ধ। ভবিষ্যতে স্কুবা ডাইভিংসংক্রান্ত ম্যাগাজিন শুরুর পরিকল্পনা আছে তাঁর। গ্রামীণ নারীদের শিল্প ও কর্মসংস্থান সহজ করার উদ্দেশ্যে ‘উর্বীরুহ’ নামে একটি কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের উদ্যোক্তা তিনি। স্বপ্ন দেখেন একটি ডাইভ শপ খোলার।
জান্নাতি বললেন, ‘দেশের প্রেক্ষাপটে পেশা হিসেবে স্কুবা ডাইভিংয়ে সম্ভাবনা অপরিসীম। সঠিকভাবে এগিয়ে গেলে এটি তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও পর্যটন সম্ভাবনার দিকও খুলে দিতে পারে।’
সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
অন্তত তিনবার পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে জান্নাতি হোসেনের জীবনে। প্রথম ঘটনা এক্কেবারে শৈশবে, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়। শীতের ছুটিতে শরীয়তপুরে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন। সাঁতার না জেনেই নেমেছিলেন কীর্তিনাশা নদীতে।
পরে চাচা এসে তাঁকে উদ্ধার করেন। এমন ঘটনা আরো দুবার ঘটে।
সেই জান্নাতি এখন সাগরতলে নিয়মিত সাঁতার কাটেন। পেশাদার ডাইভমাস্টার হতে এরই মধ্যে সব কোর্স সম্পন্ন করেছেন।
হয়েছেন দেশের প্রথম পেশাদার নারী স্কুবা ডাইভার। স্বনামধন্য ডাইভমাস্টার ও আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার শরীফ সারোয়ার বললেন, ‘জান্নাতিই দেশে প্রথম এবং সম্ভবত একমাত্র নারী ডাইভমাস্টার। ইনস্ট্রাক্টর ডেভেলপমেন্ট কোর্স সম্পন্ন করলে ডাইভিং শিখতে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদানের সুযোগ পাবেন তিনি।’
এখন সাগরজলের সঙ্গে গভীর বন্ধন গড়ে উঠেছে জান্নাতির।
শৈশবেই শুনেছেন—কিছু কাজ মেয়েদের জন্য ‘কঠিন’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’। কিন্তু কিছুতেই দমে যাওয়ার পাত্রী নন তিনি। এই অদম্য মনোবলই জান্নাতিকে নিয়ে গেছে সাফল্যের শিখরে।
সব বাধা পেরিয়ে : তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় জান্নাতি। বড় হয়েছেন ঢাকায়।
ছোটবেলা থেকে নতুন কিছু করার মধ্যে আনন্দ পেতেন। কৈশোরে সাইকেলে এলাকা চষে বেড়াতেন।
একদিন শুনলেন এলাকার এক মেয়ে সাইকেল চালাতে বের হয়ে নিখোঁজ হয়েছে। এর পর থেকে জান্নাতির সাইকেল চালানো বারণ। এবার তাঁকে স্কুলে আনা-নেওয়ার দায়িত্বে থাকা চাচার কাছে ড্রাইভিং শিখতে লাগলেন।
সেই থেকে গাড়ি চালাতে খুব পছন্দ করেন। কিন্তু এখন শহরে এমন রাস্তা খুব কমই আছে, যেখানে নির্ভার হয়ে ড্রাইভ করা যায়। তাই বেছে নিলেন ‘জ্যামমুক্ত’ জলরাশিকে।
দেশের প্রথম পেশাদার নারী স্কুবা ডাইভার
জান্নাতি হোসেন
১৮ বছরেই সাত ভাষা : এ লেভেল শেষ করে চার বছর ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন জান্নাতি। ১৮ বছর বয়সের মধ্যে শিখে ফেলেছেন সাতটি ভাষা। ফটোগ্রাফি ও গাড়ি মডিফিকেশন ব্যবসা চালিয়েছেন। বছরখানেক একটি স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। পরে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজিতে স্নাতক হলেন।
নিজেকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দেখতে চেয়েছেন জান্নাতি। বেশ কয়েকটি উদ্যোগে লোকসান হলেও হাল ছাড়েননি। ফ্রিল্যান্সিংয়ে নিজের অন্যান্য দক্ষতা কাজে লাগিয়েছেন। কভিডের সময় ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান হয়। পরে স্কুবা ডাইভিংয়ে গুরুত্ব দেন। বললেন, ‘দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সময়ের সঙ্গে আমার ব্যবসা আবার ঘুরে দাঁড়াবে, আর স্কুবা ডাইভিংয়ের এই নতুন যাত্রা আমাকে আমার দেশের মানুষের কাছে এক অনন্য স্পোর্টস পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে।’
সেন্ট মার্টিন থেকে শুরু : জান্নাতির জলের নিচে অভিযানের শুরু সেন্ট মার্টিনে। গিয়েছিলেন একটি মেরিন কনজারভেশন সংগঠনের সঙ্গে। সেখানে বাংলাদেশের প্রথম আন্ডারওয়াটার ক্লিন-আপ আয়োজক দলে ছিলেন। দ্বীপের কচ্ছপ সংরক্ষণ কার্যক্রমেও অংশ নেন। বললেন, ‘এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আমাকে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি আরো গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।’
রাতের সমুদ্রে প্রথমবার : ২০১৮ সালে ঘুরতে গিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। নীল জলরাশি ও বিশুদ্ধ বাতাস উপভোগ করতে করতেই খোঁজ নিলেন স্কুবা ডাইভিংয়ের। সেরে ফেললেন দুটি কোর্স।
দ্বিতীয় পর্বের প্রশিক্ষণে রাতেও ডুব দিতে হয় সাগরে। চমকের তখনো বাকি। কারণ সাগরতলের দৃশ্যটা ওপরের তুলনায় একেবারে ভিন্ন। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। যদিও হাতে লাইট ছিল, কিন্তু চালানোর মতো শক্তি নেই মনে!
জান্নাতি বললেন, ‘প্রথমবার যখন রাতের সমুদ্রে ডুব দিয়েছিলাম, তখন মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়ছিলাম। চারপাশের গভীর অন্ধকারে মনে হচ্ছিল যেন কবরের ভেতরে আছি। ইনস্ট্রাক্টরের পিছু পিছু যাচ্ছিলাম, শুধু তাঁর টর্চের আলোয় যেগুলো দেখাচ্ছিলেন সেগুলোই দেখতাম। কিন্তু ডাইভ শেষ হওয়ার আগেই দেখি স্কুইড, কাঁকড়া, ইল আর অনেক নিশাচর প্রাণী।’ সেই অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছে জান্নাতিকে। এখন রাতের ডাইভ তাঁর বেশি পছন্দের।
ডাইভমাস্টার : এখন তিনি সনদধারী ডাইভিং শিক্ষক। ‘ডাইভমাস্টার’ কোর্সের আগে মুক্ত পানির ডুবুরি, অগ্রগামী মুক্ত পানির ডুবুরি এবং উদ্ধারকারী ডুবুরি নামে আরো তিনটি কোর্স সম্পন্ন করেছেন। উদ্ধারকারী ডুবুরি হওয়ার আগে অবশ্য আরেকটা সনদ নিতে হয়। নাম ইমার্জেন্সি ফার্স্ট রেসপন্স (ইএফআর)। আপৎকালীন তৎক্ষণাৎ সাড়া দেওয়া ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা অর্জনে শিখতে হয় এটি। এ ছাড়া ‘প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ডাইভিং ইনস্ট্রাক্টরস (পিএডিআই)’ নামক ডুবুরি প্রশিক্ষকদের বৈশ্বিক পেশাজীবী সংগঠনেরও সদস্যপদ পেয়েছেন।
প্রথম তিনটি কোর্সে গড়ে চার-পাঁচ দিন করে সময় লাগে। ‘ডাইভমাস্টার’ কোর্স সম্পন্ন করতে জান্নাতির লেগেছে প্রায় দুই মাস। লিখিত পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হয়েছে।
প্রশিক্ষক ও কোর্স পরিচালকের সনদ অর্জনের জন্য কয়েক মাসের মধ্যেই ভর্তি হবেন ‘ইনস্ট্রাক্টর ডেভেলপমেন্ট কোর্সে’। যাঁরা ডাইভিং শিখতে আগ্রহী, তাঁদের শেখানো ও সার্টিফাই করার সুযোগ পাবেন তিনি।
নিরাপত্তাই প্রথম : এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপ ও বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ডাইভ করেছেন জান্নাতি। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, রেড সি, আর ক্যারিবিয়ান সাগরের বোনায়ের দ্বীপে ডাইভ করতে চান ভবিষ্যতে। স্কুবা ডাইভিং যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি একটু এদিক-সেদিক হলেই ঘটে যেতে পারে বড় বিপত্তি।
তেমনি এক ঘটনার কথা জানালেন জান্নাতি। ডাইভমাস্টার ট্রেনিংয়ের সময় জান্নাতির সঙ্গে ছিলেন এক প্রবীণ মহিলা ডাইভার। খুবই ফিট। বয়স ষাটের কোঠায়। তিনি অসাধারণ একজন ডাইভার হলেও সেদিন নিরাপত্তাবিধি ঠিকঠাক মানেননি। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি ডাইভ করেছিলেন। ফলে পানির নিচেই স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরে তাঁকে দ্রুত হাইপারবারিক চেম্বারসহ চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। বললেন, ‘সেদিন বুঝলাম, স্কুবা ডাইভিং যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি দায়িত্বশীলতার জায়গাও বিশাল। একজন পেশাদার ডাইভার হিসেবে নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা আর অন্যদের সঠিকভাবে গাইড করাই আমার প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’
ডাইভ শপ খোলার স্বপ্ন : গাড়ির মডিফিকেশন শপ চালানোর সময় ‘টর্ক’ নামে গাড়ি সম্পর্কিত ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন জান্নাতি। মূলত দেশের গাড়ি সেক্টরের সর্বশেষ খবর প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করত এটি। এখন সেটার প্রকাশনা বন্ধ। ভবিষ্যতে স্কুবা ডাইভিংসংক্রান্ত ম্যাগাজিন শুরুর পরিকল্পনা আছে তাঁর। গ্রামীণ নারীদের শিল্প ও কর্মসংস্থান সহজ করার উদ্দেশ্যে ‘উর্বীরুহ’ নামে একটি কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের উদ্যোক্তা তিনি। স্বপ্ন দেখেন একটি ডাইভ শপ খোলার।
জান্নাতি বললেন, ‘দেশের প্রেক্ষাপটে পেশা হিসেবে স্কুবা ডাইভিংয়ে সম্ভাবনা অপরিসীম। সঠিকভাবে এগিয়ে গেলে এটি তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও পর্যটন সম্ভাবনার দিকও খুলে দিতে পারে।’
সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
অন্তত তিনবার পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে জান্নাতি হোসেনের জীবনে। প্রথম ঘটনা এক্কেবারে শৈশবে, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়। শীতের ছুটিতে শরীয়তপুরে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন। সাঁতার না জেনেই নেমেছিলেন কীর্তিনাশা নদীতে।
পরে চাচা এসে তাঁকে উদ্ধার করেন। এমন ঘটনা আরো দুবার ঘটে।
সেই জান্নাতি এখন সাগরতলে নিয়মিত সাঁতার কাটেন। পেশাদার ডাইভমাস্টার হতে এরই মধ্যে সব কোর্স সম্পন্ন করেছেন।
হয়েছেন দেশের প্রথম পেশাদার নারী স্কুবা ডাইভার। স্বনামধন্য ডাইভমাস্টার ও আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার শরীফ সারোয়ার বললেন, ‘জান্নাতিই দেশে প্রথম এবং সম্ভবত একমাত্র নারী ডাইভমাস্টার। ইনস্ট্রাক্টর ডেভেলপমেন্ট কোর্স সম্পন্ন করলে ডাইভিং শিখতে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদানের সুযোগ পাবেন তিনি।’
এখন সাগরজলের সঙ্গে গভীর বন্ধন গড়ে উঠেছে জান্নাতির।
শৈশবেই শুনেছেন—কিছু কাজ মেয়েদের জন্য ‘কঠিন’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’। কিন্তু কিছুতেই দমে যাওয়ার পাত্রী নন তিনি। এই অদম্য মনোবলই জান্নাতিকে নিয়ে গেছে সাফল্যের শিখরে।
সব বাধা পেরিয়ে : তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় জান্নাতি। বড় হয়েছেন ঢাকায়।
ছোটবেলা থেকে নতুন কিছু করার মধ্যে আনন্দ পেতেন। কৈশোরে সাইকেলে এলাকা চষে বেড়াতেন।
একদিন শুনলেন এলাকার এক মেয়ে সাইকেল চালাতে বের হয়ে নিখোঁজ হয়েছে। এর পর থেকে জান্নাতির সাইকেল চালানো বারণ। এবার তাঁকে স্কুলে আনা-নেওয়ার দায়িত্বে থাকা চাচার কাছে ড্রাইভিং শিখতে লাগলেন।
সেই থেকে গাড়ি চালাতে খুব পছন্দ করেন। কিন্তু এখন শহরে এমন রাস্তা খুব কমই আছে, যেখানে নির্ভার হয়ে ড্রাইভ করা যায়। তাই বেছে নিলেন ‘জ্যামমুক্ত’ জলরাশিকে।
দেশের প্রথম পেশাদার নারী স্কুবা ডাইভার
জান্নাতি হোসেন
১৮ বছরেই সাত ভাষা : এ লেভেল শেষ করে চার বছর ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন জান্নাতি। ১৮ বছর বয়সের মধ্যে শিখে ফেলেছেন সাতটি ভাষা। ফটোগ্রাফি ও গাড়ি মডিফিকেশন ব্যবসা চালিয়েছেন। বছরখানেক একটি স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। পরে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজিতে স্নাতক হলেন।
নিজেকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দেখতে চেয়েছেন জান্নাতি। বেশ কয়েকটি উদ্যোগে লোকসান হলেও হাল ছাড়েননি। ফ্রিল্যান্সিংয়ে নিজের অন্যান্য দক্ষতা কাজে লাগিয়েছেন। কভিডের সময় ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান হয়। পরে স্কুবা ডাইভিংয়ে গুরুত্ব দেন। বললেন, ‘দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সময়ের সঙ্গে আমার ব্যবসা আবার ঘুরে দাঁড়াবে, আর স্কুবা ডাইভিংয়ের এই নতুন যাত্রা আমাকে আমার দেশের মানুষের কাছে এক অনন্য স্পোর্টস পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে।’
সেন্ট মার্টিন থেকে শুরু : জান্নাতির জলের নিচে অভিযানের শুরু সেন্ট মার্টিনে। গিয়েছিলেন একটি মেরিন কনজারভেশন সংগঠনের সঙ্গে। সেখানে বাংলাদেশের প্রথম আন্ডারওয়াটার ক্লিন-আপ আয়োজক দলে ছিলেন। দ্বীপের কচ্ছপ সংরক্ষণ কার্যক্রমেও অংশ নেন। বললেন, ‘এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আমাকে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি আরো গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।’
রাতের সমুদ্রে প্রথমবার : ২০১৮ সালে ঘুরতে গিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। নীল জলরাশি ও বিশুদ্ধ বাতাস উপভোগ করতে করতেই খোঁজ নিলেন স্কুবা ডাইভিংয়ের। সেরে ফেললেন দুটি কোর্স।
দ্বিতীয় পর্বের প্রশিক্ষণে রাতেও ডুব দিতে হয় সাগরে। চমকের তখনো বাকি। কারণ সাগরতলের দৃশ্যটা ওপরের তুলনায় একেবারে ভিন্ন। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। যদিও হাতে লাইট ছিল, কিন্তু চালানোর মতো শক্তি নেই মনে!
জান্নাতি বললেন, ‘প্রথমবার যখন রাতের সমুদ্রে ডুব দিয়েছিলাম, তখন মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়ছিলাম। চারপাশের গভীর অন্ধকারে মনে হচ্ছিল যেন কবরের ভেতরে আছি। ইনস্ট্রাক্টরের পিছু পিছু যাচ্ছিলাম, শুধু তাঁর টর্চের আলোয় যেগুলো দেখাচ্ছিলেন সেগুলোই দেখতাম। কিন্তু ডাইভ শেষ হওয়ার আগেই দেখি স্কুইড, কাঁকড়া, ইল আর অনেক নিশাচর প্রাণী।’ সেই অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছে জান্নাতিকে। এখন রাতের ডাইভ তাঁর বেশি পছন্দের।
ডাইভমাস্টার : এখন তিনি সনদধারী ডাইভিং শিক্ষক। ‘ডাইভমাস্টার’ কোর্সের আগে মুক্ত পানির ডুবুরি, অগ্রগামী মুক্ত পানির ডুবুরি এবং উদ্ধারকারী ডুবুরি নামে আরো তিনটি কোর্স সম্পন্ন করেছেন। উদ্ধারকারী ডুবুরি হওয়ার আগে অবশ্য আরেকটা সনদ নিতে হয়। নাম ইমার্জেন্সি ফার্স্ট রেসপন্স (ইএফআর)। আপৎকালীন তৎক্ষণাৎ সাড়া দেওয়া ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা অর্জনে শিখতে হয় এটি। এ ছাড়া ‘প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ডাইভিং ইনস্ট্রাক্টরস (পিএডিআই)’ নামক ডুবুরি প্রশিক্ষকদের বৈশ্বিক পেশাজীবী সংগঠনেরও সদস্যপদ পেয়েছেন।
প্রথম তিনটি কোর্সে গড়ে চার-পাঁচ দিন করে সময় লাগে। ‘ডাইভমাস্টার’ কোর্স সম্পন্ন করতে জান্নাতির লেগেছে প্রায় দুই মাস। লিখিত পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হয়েছে।
প্রশিক্ষক ও কোর্স পরিচালকের সনদ অর্জনের জন্য কয়েক মাসের মধ্যেই ভর্তি হবেন ‘ইনস্ট্রাক্টর ডেভেলপমেন্ট কোর্সে’। যাঁরা ডাইভিং শিখতে আগ্রহী, তাঁদের শেখানো ও সার্টিফাই করার সুযোগ পাবেন তিনি।
নিরাপত্তাই প্রথম : এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপ ও বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ডাইভ করেছেন জান্নাতি। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, রেড সি, আর ক্যারিবিয়ান সাগরের বোনায়ের দ্বীপে ডাইভ করতে চান ভবিষ্যতে। স্কুবা ডাইভিং যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি একটু এদিক-সেদিক হলেই ঘটে যেতে পারে বড় বিপত্তি।
তেমনি এক ঘটনার কথা জানালেন জান্নাতি। ডাইভমাস্টার ট্রেনিংয়ের সময় জান্নাতির সঙ্গে ছিলেন এক প্রবীণ মহিলা ডাইভার। খুবই ফিট। বয়স ষাটের কোঠায়। তিনি অসাধারণ একজন ডাইভার হলেও সেদিন নিরাপত্তাবিধি ঠিকঠাক মানেননি। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি ডাইভ করেছিলেন। ফলে পানির নিচেই স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরে তাঁকে দ্রুত হাইপারবারিক চেম্বারসহ চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। বললেন, ‘সেদিন বুঝলাম, স্কুবা ডাইভিং যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি দায়িত্বশীলতার জায়গাও বিশাল। একজন পেশাদার ডাইভার হিসেবে নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা আর অন্যদের সঠিকভাবে গাইড করাই আমার প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’
ডাইভ শপ খোলার স্বপ্ন : গাড়ির মডিফিকেশন শপ চালানোর সময় ‘টর্ক’ নামে গাড়ি সম্পর্কিত ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন জান্নাতি। মূলত দেশের গাড়ি সেক্টরের সর্বশেষ খবর প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করত এটি। এখন সেটার প্রকাশনা বন্ধ। ভবিষ্যতে স্কুবা ডাইভিংসংক্রান্ত ম্যাগাজিন শুরুর পরিকল্পনা আছে তাঁর। গ্রামীণ নারীদের শিল্প ও কর্মসংস্থান সহজ করার উদ্দেশ্যে ‘উর্বীরুহ’ নামে একটি কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের উদ্যোক্তা তিনি। স্বপ্ন দেখেন একটি ডাইভ শপ খোলার।
জান্নাতি বললেন, ‘দেশের প্রেক্ষাপটে পেশা হিসেবে স্কুবা ডাইভিংয়ে সম্ভাবনা অপরিসীম। সঠিকভাবে এগিয়ে গেলে এটি তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও পর্যটন সম্ভাবনার দিকও খুলে দিতে পারে।’
সিল্কসিটিনিউজ ডেস্ক :
অন্তত তিনবার পানিতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে জান্নাতি হোসেনের জীবনে। প্রথম ঘটনা এক্কেবারে শৈশবে, চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময়। শীতের ছুটিতে শরীয়তপুরে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন। সাঁতার না জেনেই নেমেছিলেন কীর্তিনাশা নদীতে।
পরে চাচা এসে তাঁকে উদ্ধার করেন। এমন ঘটনা আরো দুবার ঘটে।
সেই জান্নাতি এখন সাগরতলে নিয়মিত সাঁতার কাটেন। পেশাদার ডাইভমাস্টার হতে এরই মধ্যে সব কোর্স সম্পন্ন করেছেন।
হয়েছেন দেশের প্রথম পেশাদার নারী স্কুবা ডাইভার। স্বনামধন্য ডাইভমাস্টার ও আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার শরীফ সারোয়ার বললেন, ‘জান্নাতিই দেশে প্রথম এবং সম্ভবত একমাত্র নারী ডাইভমাস্টার। ইনস্ট্রাক্টর ডেভেলপমেন্ট কোর্স সম্পন্ন করলে ডাইভিং শিখতে আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ ও সনদ প্রদানের সুযোগ পাবেন তিনি।’
এখন সাগরজলের সঙ্গে গভীর বন্ধন গড়ে উঠেছে জান্নাতির।
শৈশবেই শুনেছেন—কিছু কাজ মেয়েদের জন্য ‘কঠিন’ বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’। কিন্তু কিছুতেই দমে যাওয়ার পাত্রী নন তিনি। এই অদম্য মনোবলই জান্নাতিকে নিয়ে গেছে সাফল্যের শিখরে।
সব বাধা পেরিয়ে : তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় জান্নাতি। বড় হয়েছেন ঢাকায়।
ছোটবেলা থেকে নতুন কিছু করার মধ্যে আনন্দ পেতেন। কৈশোরে সাইকেলে এলাকা চষে বেড়াতেন।
একদিন শুনলেন এলাকার এক মেয়ে সাইকেল চালাতে বের হয়ে নিখোঁজ হয়েছে। এর পর থেকে জান্নাতির সাইকেল চালানো বারণ। এবার তাঁকে স্কুলে আনা-নেওয়ার দায়িত্বে থাকা চাচার কাছে ড্রাইভিং শিখতে লাগলেন।
সেই থেকে গাড়ি চালাতে খুব পছন্দ করেন। কিন্তু এখন শহরে এমন রাস্তা খুব কমই আছে, যেখানে নির্ভার হয়ে ড্রাইভ করা যায়। তাই বেছে নিলেন ‘জ্যামমুক্ত’ জলরাশিকে।
দেশের প্রথম পেশাদার নারী স্কুবা ডাইভার
জান্নাতি হোসেন
১৮ বছরেই সাত ভাষা : এ লেভেল শেষ করে চার বছর ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন জান্নাতি। ১৮ বছর বয়সের মধ্যে শিখে ফেলেছেন সাতটি ভাষা। ফটোগ্রাফি ও গাড়ি মডিফিকেশন ব্যবসা চালিয়েছেন। বছরখানেক একটি স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। পরে নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজিতে স্নাতক হলেন।
নিজেকে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে দেখতে চেয়েছেন জান্নাতি। বেশ কয়েকটি উদ্যোগে লোকসান হলেও হাল ছাড়েননি। ফ্রিল্যান্সিংয়ে নিজের অন্যান্য দক্ষতা কাজে লাগিয়েছেন। কভিডের সময় ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান হয়। পরে স্কুবা ডাইভিংয়ে গুরুত্ব দেন। বললেন, ‘দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সময়ের সঙ্গে আমার ব্যবসা আবার ঘুরে দাঁড়াবে, আর স্কুবা ডাইভিংয়ের এই নতুন যাত্রা আমাকে আমার দেশের মানুষের কাছে এক অনন্য স্পোর্টস পৌঁছে দিতে সাহায্য করবে।’
সেন্ট মার্টিন থেকে শুরু : জান্নাতির জলের নিচে অভিযানের শুরু সেন্ট মার্টিনে। গিয়েছিলেন একটি মেরিন কনজারভেশন সংগঠনের সঙ্গে। সেখানে বাংলাদেশের প্রথম আন্ডারওয়াটার ক্লিন-আপ আয়োজক দলে ছিলেন। দ্বীপের কচ্ছপ সংরক্ষণ কার্যক্রমেও অংশ নেন। বললেন, ‘এই অভিজ্ঞতা আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, যা আমাকে প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি আরো গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।’
রাতের সমুদ্রে প্রথমবার : ২০১৮ সালে ঘুরতে গিয়েছিলেন মালয়েশিয়ায়। নীল জলরাশি ও বিশুদ্ধ বাতাস উপভোগ করতে করতেই খোঁজ নিলেন স্কুবা ডাইভিংয়ের। সেরে ফেললেন দুটি কোর্স।
দ্বিতীয় পর্বের প্রশিক্ষণে রাতেও ডুব দিতে হয় সাগরে। চমকের তখনো বাকি। কারণ সাগরতলের দৃশ্যটা ওপরের তুলনায় একেবারে ভিন্ন। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। যদিও হাতে লাইট ছিল, কিন্তু চালানোর মতো শক্তি নেই মনে!
জান্নাতি বললেন, ‘প্রথমবার যখন রাতের সমুদ্রে ডুব দিয়েছিলাম, তখন মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়ছিলাম। চারপাশের গভীর অন্ধকারে মনে হচ্ছিল যেন কবরের ভেতরে আছি। ইনস্ট্রাক্টরের পিছু পিছু যাচ্ছিলাম, শুধু তাঁর টর্চের আলোয় যেগুলো দেখাচ্ছিলেন সেগুলোই দেখতাম। কিন্তু ডাইভ শেষ হওয়ার আগেই দেখি স্কুইড, কাঁকড়া, ইল আর অনেক নিশাচর প্রাণী।’ সেই অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছে জান্নাতিকে। এখন রাতের ডাইভ তাঁর বেশি পছন্দের।
ডাইভমাস্টার : এখন তিনি সনদধারী ডাইভিং শিক্ষক। ‘ডাইভমাস্টার’ কোর্সের আগে মুক্ত পানির ডুবুরি, অগ্রগামী মুক্ত পানির ডুবুরি এবং উদ্ধারকারী ডুবুরি নামে আরো তিনটি কোর্স সম্পন্ন করেছেন। উদ্ধারকারী ডুবুরি হওয়ার আগে অবশ্য আরেকটা সনদ নিতে হয়। নাম ইমার্জেন্সি ফার্স্ট রেসপন্স (ইএফআর)। আপৎকালীন তৎক্ষণাৎ সাড়া দেওয়া ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা অর্জনে শিখতে হয় এটি। এ ছাড়া ‘প্রফেশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ডাইভিং ইনস্ট্রাক্টরস (পিএডিআই)’ নামক ডুবুরি প্রশিক্ষকদের বৈশ্বিক পেশাজীবী সংগঠনেরও সদস্যপদ পেয়েছেন।
প্রথম তিনটি কোর্সে গড়ে চার-পাঁচ দিন করে সময় লাগে। ‘ডাইভমাস্টার’ কোর্স সম্পন্ন করতে জান্নাতির লেগেছে প্রায় দুই মাস। লিখিত পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে হয়েছে।
প্রশিক্ষক ও কোর্স পরিচালকের সনদ অর্জনের জন্য কয়েক মাসের মধ্যেই ভর্তি হবেন ‘ইনস্ট্রাক্টর ডেভেলপমেন্ট কোর্সে’। যাঁরা ডাইভিং শিখতে আগ্রহী, তাঁদের শেখানো ও সার্টিফাই করার সুযোগ পাবেন তিনি।
নিরাপত্তাই প্রথম : এখন পর্যন্ত মালয়েশিয়ার বিভিন্ন দ্বীপ ও বাংলাদেশের সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ডাইভ করেছেন জান্নাতি। অস্ট্রেলিয়ার গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ, রেড সি, আর ক্যারিবিয়ান সাগরের বোনায়ের দ্বীপে ডাইভ করতে চান ভবিষ্যতে। স্কুবা ডাইভিং যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি একটু এদিক-সেদিক হলেই ঘটে যেতে পারে বড় বিপত্তি।
তেমনি এক ঘটনার কথা জানালেন জান্নাতি। ডাইভমাস্টার ট্রেনিংয়ের সময় জান্নাতির সঙ্গে ছিলেন এক প্রবীণ মহিলা ডাইভার। খুবই ফিট। বয়স ষাটের কোঠায়। তিনি অসাধারণ একজন ডাইভার হলেও সেদিন নিরাপত্তাবিধি ঠিকঠাক মানেননি। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি ডাইভ করেছিলেন। ফলে পানির নিচেই স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। পরে তাঁকে দ্রুত হাইপারবারিক চেম্বারসহ চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। বললেন, ‘সেদিন বুঝলাম, স্কুবা ডাইভিং যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি দায়িত্বশীলতার জায়গাও বিশাল। একজন পেশাদার ডাইভার হিসেবে নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা আর অন্যদের সঠিকভাবে গাইড করাই আমার প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’
ডাইভ শপ খোলার স্বপ্ন : গাড়ির মডিফিকেশন শপ চালানোর সময় ‘টর্ক’ নামে গাড়ি সম্পর্কিত ম্যাগাজিন প্রকাশ করতেন জান্নাতি। মূলত দেশের গাড়ি সেক্টরের সর্বশেষ খবর প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করত এটি। এখন সেটার প্রকাশনা বন্ধ। ভবিষ্যতে স্কুবা ডাইভিংসংক্রান্ত ম্যাগাজিন শুরুর পরিকল্পনা আছে তাঁর। গ্রামীণ নারীদের শিল্প ও কর্মসংস্থান সহজ করার উদ্দেশ্যে ‘উর্বীরুহ’ নামে একটি কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের উদ্যোক্তা তিনি। স্বপ্ন দেখেন একটি ডাইভ শপ খোলার।
জান্নাতি বললেন, ‘দেশের প্রেক্ষাপটে পেশা হিসেবে স্কুবা ডাইভিংয়ে সম্ভাবনা অপরিসীম। সঠিকভাবে এগিয়ে গেলে এটি তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থান ও পর্যটন সম্ভাবনার দিকও খুলে দিতে পারে।’