সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:২৫ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের আরেক রক্তাক্ত অধ্যায়

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২২ বার পড়া হয়েছে

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সাল হচ্ছে সবচেয়ে ঝঞ্ঝাপূর্ণ বছরের একটি। এর মধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বাঁকবদলের মাস ছিল পঁচাত্তরের নভেম্বর। এই অস্থির সময়, বিশেষ করে ৩ থেকে ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি নিয়ে যত লেখালেখি হয়েছে, অন্য কোনো সময় নিয়ে তত হয়নি। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের বিপরীতে ৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়েছিল পাল্টা আরেকটি অভ্যুত্থান। এ সময়ের নানা স্মৃতি, দলিল ও মতামত নিয়ে থাকছে প্রথম আলোর এই বিশেষ আয়োজন।

অন্তর্বর্তী সরকারের বর্তমান উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকার সময় সংগঠিত অভ্যুত্থান ও পাল্টা-অভ্যুত্থানের অনেক ঘটনার সাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শী। আজ ৭ নভেম্বর। ৫০ বছর আগের সেই দিনটির বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে তাঁর লেখায়। আজ প্রকাশিত হলো তাঁর বই থেকে নেওয়া সেই অংশটুকু।

৭ নভেম্বর: বাংলাদেশের আরেক রক্তাক্ত অধ্যায়

৭ নভেম্বর ১৯৭৫। সময় তখন প্রায় মধ্য রাত। চারদিকে গোলাগুলির আওয়াজ আর ‘জিন্দাবাদ’ ধ্বনির মধ্যে ঘুম ভেঙে গেল। হকচকিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়লাম। বাসার সবাই আতঙ্কিত। আমি পেছনের বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সেখান থেকে সেনানিবাসের প্রধান সড়ক দেখা যায়। সৈনিক ভর্তি অনেক গাড়ি। তারাই এই আওয়াজ করছে। করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছে। কয়েকটি ট্যাংককে টপ স্পিডে দক্ষিণ দিকে যেতে দেখলাম। তেজগাঁও বিমানবন্দরের দিক থেকে বিমানবিধ্বংসী কামানের ছোড়া ট্রেসার রাউন্ড তখন দক্ষিণমুখী আকাশকে রক্তিম করে তুলছিল। বুঝতে পারছিলাম না হঠাৎ করে এমন কী হলো! সন্ধ্যায় বিতরণ করা লিফলেট আর শোনা গুজবের কথা মনে পড়ল। একবার মনে করলাম, হয়তো ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানে জড়িত ইউনিট আর খালেদ মোশাররফের সমর্থক ইউনিটের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে।

আমার নিচের তলাতেই থাকতেন অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট (বিমানবিধ্বংসী) ইউনিটের অধিনায়ক লে. কর্নেল মাশাহেদ চৌধুরী, যাঁর ইউনিটের একটি ব্যাটারি তেজগাঁও বিমানবন্দরে রাখা হয়েছিল বিমানবন্দরের পথ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য। তাঁরা আমাদের ডেকে নিচে তাঁদের বসার ঘরে নিয়ে গেলেন। তারপর তিনি আমাকে অনেক কথাই বললেন। বললেন কীভাবে তাঁর ইউনিটের একটি ব্যাটারিকে তাঁর নির্দেশ ছাড়াই বিমানবন্দরে নিয়ে গিয়ে মোতায়েন করা হয়েছে। আগের দিনের লিফলেট সম্বন্ধেও অনেক কিছু বললেন। তখনো আমরা অনুমান করতে পারিনি যে বাইরে আসলে কী ঘটে চলেছে।

এম সাখাওয়াত হোসেন
এম সাখাওয়াত হোসেন

তাঁর সঙ্গে কথা বলতে বলতে প্রায় সকাল হয়ে এল। সারা রাত ধরে চলল গোলাগুলির আওয়াজ। এর মধ্যেই আজানের ধ্বনি শোনা গেল। পুবের আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হতেই তাড়াতাড়ি ইউনিফর্ম পরে আমার প্রতিবেশী মেজর হারুনের সঙ্গে (পরে কর্নেল, অবসরপ্রাপ্ত) হাঁটতে হাঁটতে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। হারুন যেহেতু স্টেশন হেডকোয়ার্টারে স্টাফ অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন, কাজেই তিনিও আমার সঙ্গে হেঁটেই স্টেশন হেডকোয়ার্টারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আমরা দুজনই একসঙ্গে বের হলাম।

প্রধান সড়কে উঠতেই দুজন পরিচিত অফিসারের দেখা পেলাম। একজন মেজর মাশুক আহমেদ চৌধুরী (পরে ব্রিগেডিয়ার, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত), অপরজন লে. কর্নেল শরিফ, যিনি সেনাসদরের অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল ব্রাঞ্চের একজন পরিচালক, ছিলেন সফিউল্লাহ এবং জিয়ার ব্যাচমেট। দুজনই একই মোটরসাইকেলে, মাশুক ইউনিফর্ম পরা হলেও লে. কর্নেল শরিফের পরনে রাতেরই পোশাক। তাঁরা আমাদের দেখে বললেন, জেনারেল জিয়াউর রহমানকে এইমাত্র বন্দী অবস্থা থেকে বের করে ২ ফিল্ড রেজিমেন্টে নিয়ে আসা হয়েছে। তাঁরা আমাদের সেখানেই চলে যেতে বললেন। জানালেন ওখানে অন্য অফিসাররাও আছেন। এর বেশি আর কিছু বলার সময় তাঁরাও পেলেন না আর আমরাও কিছু শুনতে পারছিলাম না।

পথের উল্টো দিক থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে আর স্লোগান দিতে দিতে সৈনিক এবং কিছু বেসামরিক তরুণে ভর্তি একটি সামরিক ট্রাক আমাদের পাশ কাটিয়ে দ্রুতগতিতে চলে গেল। এ স্লোগান আমি প্রথম শুনলাম আর শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীরের রক্ত হিম হয়ে গেল। তারা স্লোগান দিচ্ছিল, ‘সিপাহি সিপাহি ভাই ভাই/অফিসারের রক্ত চাই’, ‘সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ/ জেনারেল জিয়া জিন্দাবাদ’। এই স্লোগান শোনার পর আমি আর হারুন আরও একটু দ্রুতগতিতে হাঁটতে লাগলাম। পথে আরও দুটি ট্রাক দ্রুতগতিতে চলে গেল। তার ওপরে বসা সামরিক সদস্যদের সঙ্গে জনাকয় অস্ত্রধারী বেসামরিক তরুণ। পরে জানলাম এসব বেসামরিক তরুণ কর্নেল তাহেরের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গণবাহিনীর সদস্য। তখনো বুঝতে পারিনি এটা কাদের বা কোন ধরনের বিপ্লব।

দু-একজন তরুণ অফিসারকেও এসব বিপ্লবী সৈনিকের সঙ্গে দেখলাম। তাদের কাঁধে কোনো ব্যাজেজ অব র‍্যাঙ্ক নেই। একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করাতে জানাল, ‘স্যার, আজ থেকে সিপাহি আর অফিসারদের মধ্যে ব‍্যাঙ্কের কোনো পার্থক্য থাকবে না। সশস্ত্র বাহিনীতে কোনো শ্রেণিবিন্যাস থাকবে না। এটাই এ বিপ্লবের মূল কথা।’

কর্নেল আবু তাহের
কর্নেল আবু তাহের

আমার হতবাক হওয়ার পালা, তাহলে কি কর্নেল তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা বিপ্লব ঘটিয়েছে? আর এটাই বোধ হয় তাহেরের শ্রেণিসংগ্রামের সূত্রপাত এবং তার জন্য প্রথম ধাপে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা! আরও কয়েকটি জিপ আমাদের পাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে বের হয়ে গেল। এরপর কিছুই আর বোঝার বাকি থাকল না। সৈনিকদের সঙ্গে জেএসডির গণবাহিনীর সদস্যরা, যাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে শ্রেণিসংগ্রামের জন্য, তারাও এখন সেনানিবাসে। যতগুলো গাড়ি আমাদের পাশ দিয়ে চলে গেল, তার প্রতিটিতেই দেখলাম উল্লাসরত সৈনিকদের। তারা আকাশের দিকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে আর একই ধ্বনি দিতে দিতে যাচ্ছে। দেখে মনে হলো, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবশিষ্ট কমান্ড স্ট্রাকচারটাও পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। এ এক চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা, কোনো সভ্য দেশে কখনো এমন কিছু ঘটেছে বলে মনে পড়ে না। এখানে যেন কারও কিছু বলার বা করার নেই। যতটুকু দেখলাম, আগের রাতে বিতরণ করা লিফলেট ও তার বক্তব্য এবং এ কয় দিন সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলার যে অবনতি দেখেছি, আজকের এ দৃশ্যের সামনে তা কিছুই নয়।

দ্রুত হেঁটে দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টের প্রধান ফটকে এসে পৌঁছালাম। সেখানে প্রথমেই দেখা হলো ইউনিটের সুবেদার মেজর আনিসের (পরে অনারারি ক্যাপ্টেন) সঙ্গে। দেখা হতেই আনিস আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘স্যার, আল্লাহর রহমতে আপনাকে পাওয়া গেছে। ব্রিগেডে কেউ নেই, কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না। জিয়া সাহেব আপনাদের খোঁজ করছেন।’ সংক্ষেপে তিনি আরও জানালেন, রাত ১২টার দিকে ‘সিপাহি বিপ্লব’ শুরু হওয়ার পর প্রথম বেঙ্গলের গার্ডদের সরিয়ে সকালের দিকে মেজর মুহিউদ্দিন (পরে লে. কর্নেল) এবং এই রেজিমেন্টেরই অন্যান্য সিপাহি জিয়াকে তাদের ইউনিটে নিয়ে আসে। এই মুহূর্তে জিয়া অধিনায়কের অফিসে আছেন। তাঁর সঙ্গে আছেন আরও কয়েকজন অফিসার এবং ৫৫ ব্রিগেডের যশোরের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলীও।

দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্ট সেদিন শুধু সামরিক বাহিনীরই নয়, বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হলো। স্মরণযোগ্য যে এই দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টই রশীদের নেতৃত্বে ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী দুটি ইউনিটের একটি। আমরা দ্বিতীয় ফিল্ডে যখন পৌঁছাই, তখন সেখানে মাত্র ১০ থেকে ১৫ জন অফিসারকে দেখলাম। ইউনিট কোয়ার্টার গার্ড, যেখানে সামরিক কয়েদি রাখা হয়, সেই সেলগুলোতে দেখলাম লকআপে রয়েছেন বেশ কিছু চেনাজানা অফিসার।

এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন লে. কর্নেল বাহার। এমন একজন জ্যেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে এ রকমভাবে কোয়ার্টার গার্ড সেলে রাখার দৃশ্য দেখব বলে ভাবতেই পারিনি। সুবেদার মেজর আনিসকে এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত জিজ্ঞেস করাতে তিনি যে তথ্য দিলেন, তার সারমর্ম হলো, বিপ্লবী সৈনিকেরা কিছু অফিসারের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে তাদের লিস্ট তৈরি করে। তারপর তাঁদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে হামলা চালায়। এ খবর পেয়ে এসব আতঙ্কগ্রস্ত অফিসার পরিবার-পরিজন ছেড়ে পালাতে থাকেন। এঁদের মধ্যে যাঁদের পাওয়া গেছে, উন্মত্ত সৈনিকদের হামলা থেকে তাঁদের জীবন রক্ষায় তাঁদের নিরাপত্তামূলক হেফাজতে এনে রাখা হয়।

জিয়াউর রহমান
জিয়াউর রহমানছবি: সংগৃহীত

ধীরেসুস্থে অধিনায়কের অফিসে ঢুকেই মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে অধিনায়কের চেয়ারে বসা অবস্থায় দেখলাম। তাঁর পাশে সাফারি পরা ব্রিগেডিয়ার মীর শওকত আলী। আমি ভেতরে গিয়ে জিয়াকে অভিবাদন করার পর তিনি আমাকে বললেন, ‘তুমি ব্রিগেডে চলে যাও। গিয়ে সৈনিকদের কন্ট্রোল করো। তোমার কমান্ডারের (শাফায়াত জামিল) সঙ্গে আমি কিছুক্ষণ আগে কথা বলেছি, সে ভালোই আছে। আমিনকে নতুন কমান্ডার করা হয়েছে।’ আমি তাঁর কথা শোনার পর অফিস থেকে বের হতেই এ জে এম আমিনুল হকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তিনি আমাকে কিছুটা সময় সেখানেই অবস্থান করে সব দেখেশুনে পরিস্থিতি অনুধাবন করার পর ব্রিগেডে যেতে বললেন। তিনি আরও বললেন, যেহেতু ব্রিগেডের আর কোনো স্টাফকে পাওয়া যায়নি আর তিনিও নতুন, তা ছাড়া এ পরিস্থিতিতে তিনি তাঁর ইউনিট চতুর্থ বেঙ্গল ছেড়ে যেতে পারবেন না, তাই আমি একাই যেন সব দায়িত্ব পালন করি।

আমাকে হাফিজের জায়গায় বিএমের দায়িত্ব নিতে বললে আমি তাঁকে আশ্বস্ত করে জানালাম, ও দিকটা আমি দেখে রাখব। আমাকে তিনি আরও জানালেন, ব্রিগেড মেজর হাফিজ বা স্টাফ ক্যাপ্টেন তাজ, কাউকেই সেনানিবাসে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
জিয়াউর রহমান দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে এসেই বঙ্গভবনে খালেদ মোশাররফের খোঁজ করেন; কিন্তু তাঁকে না পেয়ে শাফায়াত জামিলকে পেয়ে যান। সিপাহি বিপ্লব শুরু হওয়ার খবর পেয়েই খালেদ মোশাররফ, হুদা আর হায়দার একসঙ্গে বঙ্গভবন ছেড়ে চলে যান। ফলে জিয়া শেষ পর্যন্ত শাফায়াত জামিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। শাফায়াত জামিলকে পেয়ে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘Forget and forgive. You come back.’ তার উত্তরে শাফায়াত জামিল এ রকম একটা কিছু বলেছিলেন, ‘I am a rebel and will remain so.’ ওই সময় শাফায়াত জামিল যখন জিয়ার সঙ্গে বঙ্গভবনের ভেতর থেকে কথা বলছিলেন, তখন হয়তো তিনি বুঝতেও পারেননি যে এই অভ্যুত্থানের পেছনে জিয়া নয়, রয়েছেন তাহের, তাঁর ‘গণবাহিনী’ আর বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, অন্তত ওই পর্যায়ে।

মধ্যরাতে শাফায়াত জামিলকে যখন সেনানিবাসে ঘটে যাওয়া বিপ্লবের খবর দেওয়া হয়, তখনো তিনি প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারেননি। যখন জানতে পারলেন, তখন বেশ দেরি হয়ে গেছে। খালেদ মোশাররফের বঙ্গভবন ত্যাগ করার পর শাফায়াত জামিল জানতে পারেন যে তিনি একাই বঙ্গভবনে রয়ে গেছেন। প্রায় ভোররাতের দিকে জিয়াউর রহমানের ফোন পাওয়ার পর তিনি জানতে পারেন যে কিছু বিপ্লবী সৈনিক তাঁদের খোঁজে বঙ্গভবনের মেইন গেটে গিয়ে পৌঁছেছে। তখনই তিনি বেশ বিচলিত হয়ে ড্রাইভারের হাতে গাড়ির চাবি তুলে দিয়ে নিজে বঙ্গভবনের পেছনের দেয়াল টপকে পালানোর সময় তাঁর একটি পা ভেঙে যায়। তিনি এবং বঙ্গভবনে চতুর্থ বেঙ্গলের কোম্পানি কমান্ডার মেজর দীদার আতাউরের সঙ্গে একটি গাড়িতে চড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম রোড ধরে মেঘনা ফেরিঘাট পর্যন্ত পৌঁছান।

শাফায়াত জামিল
শাফায়াত জামিল

শাফায়াত জামিল তাঁর ভাঙা পা নিয়ে তখন আর এগোতে পারছিলেন না। এই সময় দৈবক্রমে সেখানে নারায়ণগঞ্জের মহকুমা হাকিমের (নারায়ণগঞ্জ তখন মহকুমা ছিল) সঙ্গে তাঁদের দেখা হয়। তিনি একটি লঞ্চযোগে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় দীদার আতাউর ও শাফায়াত জামিল নিজেদের পরিচয় দেন এবং তাঁকে জামিলের তাৎক্ষণিক চিকিৎসার প্রয়োজনের কথা জানালে এসডিও সাহেব তাঁদের লঞ্চে তুলে নেন। শাফায়াত জামিলের প্রাথমিক চিকিৎসার পর এসডিও সাহেব দুজনকে বন্দর থানায় সোপর্দ করেন। সেখান থেকেই ৭ নভেম্বর সকালে শাফায়াত জামিল জেনারেল জিয়াউর রহমানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। কয়েক দিন পর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ভাঙা পায়ের কারণে কিছুটা খুঁড়িয়ে চলতেন।

দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টের বারান্দায় দাঁড়িয়েই দেখতে পেলাম কর্নেল তাহের কিছু সৈনিক আর গণবাহিনীর সদস্য পরিবেষ্টিত অবস্থায় জিয়াউর রহমানের রুমে এসে ঢুকলেন। তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে দ্বিতীয় ফিল্ডের কয়েকজন সদস্যও ছিল। প্রথমে তাহের ও জিয়া কোলাকুলি করলেন। কোলাকুলি পর্ব শেষ হতেই তাহের জিয়াউর রহমানকে রেডিও স্টেশনে গিয়ে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে বললেন। কিন্তু তাহেরের আসার আগেই জিয়াউর রহমান দ্বিতীয় ফিল্ডে বসেই অন্যান্য অফিসারের পরামর্শে তাঁর ভাষণ টেপ করে রেডিওতে পাঠিয়ে দেন। পরে তাহের সৈনিকদের পক্ষ থেকে জিয়াকে কিছু দাবিদাওয়ার লিস্ট দিলে তিনি পরে এ ব্যাপারটি বিবেচনা করে দেখবেন বলে রেখে দেন। জিয়ার এমন আচরণে তাহের খুব একটা খুশি হতে পারলেন না। তিনি একান্তে জিয়ার সঙ্গে কিছু কথা বলে উত্তেজিত হয়ে অফিসকক্ষ ত্যাগ করেন।

জিয়ার সঙ্গে সেদিন তাহেরের কী কথা হয়েছিল, বিস্তারিতভাবে তা জানা না গেলেও অসমর্থিত সূত্রে কিছু তথ্য পাওয়া গিয়েছিল। তবে সিপাহি বিপ্লবের শুরু থেকেই রেডিও বাংলাদেশ (‘বাংলাদেশ বেতার’-এর পরিবর্তিত নাম) দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ও জাসদ গণবাহিনীর এখতিয়ারে ছিল এবং জিয়াকে সেখানে সশরীর গিয়ে ভাষণ দেওয়া থেকে বিরত করা হয়েছিল। এমনটা করা হয়েছিল এ কারণে যে তাহের প্রথম থেকেই জিয়াকে সম্পূর্ণভাবে তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তাহের জিয়াকে রেডিওতে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন সৈনিকদের দাবিদাওয়া এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো বা রূপরেখা কেমন হবে, সে সম্পর্কে ঘোষণা দেওয়ার জন্য।

বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্র থেকে আরও জানা গেছে যে তাহেরের পরিকল্পনা ছিল জিয়াকে রেডিও স্টেশন থেকে শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া এবং সেখানে গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিকদের উদ্দেশে তাঁকে ভাষণ দিতে বলা। বিপ্লবী সৈনিকদের পরিকল্পনা ছিল জিয়াকে ফেরার সময় পথিমধ্যে গুলি করে হত্যা করা। মীর শওকত আলী যখন অল্প সময়ের জন্য সিজিএস ছিলেন, তখন তাঁর কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য পাওয়া গিয়েছিল। এ ধরনের একটা গুজবও শোনা গিয়েছিল যে এই ষড়যন্ত্রের কথা গণচীনের গোয়েন্দা সংস্থা ঢাকার কোনো এক দূতাবাসের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানকে জানিয়েছিল। তবে এ-সংক্রান্ত কোনো দালিলিক প্রমাণ না পাওয়া গেলেও লক্ষণীয় যে জিয়াউর রহমান সিএমএলএ হওয়ার পরপরই প্রথম যে দেশটি সফর করেন, সেটি ছিল গণচীন। আর তখন গণচীনের রাষ্ট্রীয় নেতারা প্রটোকল ভঙ্গ করে জিয়াউর রহমানকে পিকিং (বর্তমান বেইজিং) বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। সেই থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে গণচীনের সম্পর্ক বেশ গভীর।

দ্বিতীয় ফিল্ডে তখন চলছিল একধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। এরই মধ্যে সংবাদ এল খালেদ মোশাররফ, যিনি মুক্তিযুদ্ধে কে ফোর্সের কমান্ডার হিসেবে ১০ ইস্ট বেঙ্গলকে পুনর্গঠিত করেন, কর্নেল কে এন হুদা, যিনি ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে কয়েক দিন আগে এই ইউনিটকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং লে. কর্নেল হায়দার-এ তিনজনকেই শেরেবাংলা নগরে এমপি হোস্টেলের সামনে ১০ ইস্ট বেঙ্গলের অস্থায়ী লাইনেই উচ্ছৃঙ্খল সিপাহিরা নির্মমভাবে হত্যা করেছে। জিয়াউর রহমান এ খবর শুনে তাঁদের মৃতদেহ সেনানিবাসে পাঠাতে বললেন। মৃতদেহগুলো তিনি দেখবেন বলেই দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে আনার ব্যবস্থা করা হলো।

মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, লে. কর্নেল আবু তাহের
মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, লে. কর্নেল আবু তাহের

এ খবর শুনে আমার হাত-পা হিম হয়ে আসছিল। এ ধরনের পরিস্থিতি এবং চলমান এই বিপ্লবের ভয়াবহতা সম্বন্ধে এতক্ষণ আমি এতটা অনুমান করতেই পারিনি। সমস্ত হৃদয়-মন কেমন এক বিষাদে ঢেকে গেল। দেখলাম দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টের অধিনায়ক আনোয়ার হোসেনকে তাঁরই ইউনিটের সৈনিকেরা খুঁজে বের করে এনেছে। তবে তাঁর কপাল ভালো যে তিনি কোনোরকম লাঞ্ছিত হননি বরং সৈনিকেরা তাঁকে ওই পরিস্থিতির মধ্যেও সম্মানের সঙ্গেই সেদিন নিয়ে এসেছিল।

লে. কর্নেল আনোয়ার হোসেন আগের রাতে, অর্থাৎ ৬ নভেম্বর সন্ধ্যায়, ব্রিগেড কমান্ডার শাফায়াত জামিলের সঙ্গে বঙ্গভবনেই ছিলেন। কনফারেন্স শেষ হওয়ার পর শাফায়াত জামিল যখন বঙ্গভবনের উদ্দেশে রওনা হন, তখন তিনি আনোয়ার হোসেনকে তাঁর সঙ্গে নিয়ে যান। যখন বঙ্গভবনে খবর এল যে সিপাহি বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে, তখন শাফায়াত জামিল তাঁকে বঙ্গভবন ছেড়ে যেতে বললে আনোয়ার খানিকটা ইতস্তত করেন এবং পরে একাই বের হয়ে পথিমধ্যে কোথাও রাত যাপন করে বাসায় ফেরেন।

আমি অত্যন্ত বিষণ্ণ মনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় ফিল্ডের সিপাহিদের আনাগোনা দেখছিলাম। মনে হলো এই রেজিমেন্টের সঙ্গে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার যোগাযোগ হয়েছিল ১৯৭৫-এর ৩ নভেম্বরেই। দ্বিতীয় ফিল্ডের অধিনায়ক লে. কর্নেল আনোয়ার হোসেন তখনো অনুপস্থিত। কোথায় আছেন কেউ বলতে পারছে না। সুবেদার মেজর আনিস একবার জিজ্ঞেস করলেন আমি কিছু জানি কি না? বললাম যে গত রাতে ব্রিগেড কমান্ডারের সঙ্গে তিনি বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন, তার পরের কথা আর বলতে পারব না। উল্লেখ্য, লে. কর্নেল আনোয়ার ৩ নভেম্বর তাঁদের পাশের ইউনিট চতুর্থ বেঙ্গলে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে পরে খালেদ মোশাররফের পীড়াপীড়িতে কর্নেল রউফের সঙ্গে জিয়াকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করাতে গিয়েছিলেন। তাঁর রেজিমেন্ট এ ঘটনা জানা সত্ত্বেও তাঁরা ওই মুহূর্তে আনোয়ারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলেন।

আমি পরিস্থিতি তখনো হৃদয়ঙ্গম করতে পারিনি বলে এ বিষয়ে বেশি কথাবার্তায় যাইনি। আমি আর্টিলারি অফিসার হলেও ছিলাম ৪৬ ব্রিগেডে। ব্রিগেডের কয়েকটি ইউনিট প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তিনটি অভ্যুত্থানেই জড়িত ছিল। তারপরও আমার একাত্মতা ও নিরপেক্ষতার কারণে এবং সাধারণ সৈনিকদের সঙ্গে আমার কম দূরত্ব থাকায় আমার প্রতি তাদের কোনো ক্ষোভ দেখিনি। প্রায় অফিসারই যখন বিপ্লবী সিপাহিদের কথায় বা দাবির মুখে র‍্যাঙ্ক খুলে ফেলছিলেন, তখন আমার র‍্যাঙ্ক পরে থাকা নিয়ে কেউ প্রশ্নও তোলেনি। তবে সে মুহূর্তে রেজিমেন্টের সুবেদার মেজর আনিসই আমার মনে হলো, সম্পূর্ণ পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন।

আমি দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, চলমান পরিস্থিতিতে এত ভোরে ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারে আমার একা যাওয়া ঠিক হবে কি না। এমন সময় মেজর মুহিউদ্দিন (পরে যাঁর ফাঁসি হয়েছে) আমার সামনে এসে কুশলাদি বিনিময় করার পর জিজেস করলেন জিয়ার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে কি না। মাথা নেড়ে বললাম, ‘হ্যাঁ’। ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই নায়েব সুবেদার দবীরের সঙ্গে দেখা হলো। পরে বিপ্লবী সৈনিকদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কথা জেনেছি। পরবর্তীকালে দবীর সৈয়দপুরে আমার ইউনিটে যোগ দেন। যা-ই হোক, মেজর মুহিউদ্দিনের মুখে আগের রাতের কাহিনি শুনলাম।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com