খেয়ালী নাট্যগোষ্ঠীর সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে বছরব্যাপী নানা আয়োজনে মুখর হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক অঙ্গন। প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপনের অংশ হিসেবে সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমী দুই দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক ও নাট্যানুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের প্রথম দিন ছিল সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা এ কে এ কবীরের জন্মজয়ন্তী স্মরণে তাঁর রচিত গান, কবিতা এবং নাটক নিয়ে সাজানো বিশেষ আয়োজন ‘কাঙালের যত কথা’। সমাপনী দিনে মঞ্চস্থ হয় খেয়ালীর ২৪তম প্রযোজনা নারী অধিকার ও মানবিকতার চেতনা নিয়ে নির্মিত গীতিনৃত্যনাট্য ‘মানুষ হবো’।
প্রযোজনাটির গ্রন্থনা ও পরিকল্পনা করেছেন শাহীন আহম্মেদ এবং নির্দেশনা দিয়েছেন আহসানুল হক খোকন। নাটকটি মূলত নারীকে পেছনে ফেলার সামাজিক মানসিকতা, বৈষম্য এবং অমানবিকতার বিরুদ্ধে এক শক্ত প্রতিবাদ। গল্পে উঠে এসেছে আজব নগরীর বীভৎস বাস্তবতা; যেখানে ঘোষণা করা হয়েছে, নারী হয়ে জন্ম নেওয়াই অভিশাপ। এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে মেয়েদের পড়ানো যাবে কেবল ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত, আর ১২ বা ১৩ বছরেই বিয়ে বাধ্যতামূলক।
এই অমানবিক প্রথার বলি হতে যাচ্ছিল আজব নগরীতে জন্ম নেওয়া সুনন্দা। বয়স বারো পেরোতেই বাবা-মায়ের দৌড়ঝাঁপ বিয়ের জন্য। কিন্তু পণ-দরকষাকষির জাঁতাকলে সে হয়ে ওঠে পরিবারের বোঝা, সমাজের চোখে ‘অভিশাপ’। অথচ নাটকটি বলছে–নারীই সৃষ্টির মূল, নারীই জাতির উন্নতির অগ্রদূত। মা হাওয়া থেকে শতরূপা সভ্যতার প্রতিটি সূচনায় নারীই প্রথম সঙ্গী, প্রথম সহযাত্রী। স্রষ্টার সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টি মানবজাতি, সেই মানবজাতিরই অর্ধেক অংশ নারী অথচ সমাজ সেই অর্ধেককে দমিয়ে রাখতে চায় নিরক্ষরতা, অবমূল্যায়ন ও শৃঙ্খলের নামে। নাটকটি তুলে ধরে আরও একটি ভয়াবহ সামাজিক সংকট–নারীকে অবদমনের পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক অসভ্যতার বিস্তার। সমাজে নারীকে শাসন করার অজস্র নিয়ম, কিন্তু ছেলেসন্তানকে মানুষ করার মতো লক্ষ্য নেই। পবিত্রতা রক্ষার নিয়ম শুধু নারীর জন্য, পুরুষের জন্য নয়। নাটকের সংলাপে তাই তীক্ষ্ণ উচ্চারণ ‘নারী তাঁর শরীর রক্ষায় যত কঠোর হয়, পুরুষ সেই সুরক্ষা ভাঙতে ততই উদগ্রীব’। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র নারীকে শৃঙ্খলিত করলেও পুরুষকে মানুষ করার দায়িত্ব নেয় না, ফলে ছেলেশিশুরা ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে মানবিক পুরুষ নয়; বরং ক্ষমতাবান স্বৈরাচারী সত্তা। ভালোবাসার জায়গায় আসে কামনা, মানবতার বদলে আসে ভোগবিলাসের মানসিকতা। এই ভয়াবহ বাস্তবতার পরিবর্তনের ঘোষণাই ‘মানুষ হবো’ নাটকের মর্মবাণী।
গীতি, আবৃত্তি, নৃত্য ও নাট্যের সমন্বয়ে নির্মিত এই প্রযোজনা দর্শকদের ভাবনায় আঘাত হানে। মানবাধিকার, নারীমুক্তি, পরিবার-সমাজের দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতার প্রতি নতুন করে বিবেচনার ডাক দেয়।
নাটকে সংলাপগুলো শক্তিশালী হলে প্রযোজনটি আরও ভালো হতো। মঞ্চে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন রানু আরা, রোজিনা আক্তার, ফাহিমা আফরিন ইভা, সহিফা আহম্মেদ, মমতাজ, ইয়াংফা, মঞ্জুর মামুন লিটু, জামান আহম্মেদ মিঠু, রুহুল্লাহ কিবরিয়া রবি, ইব্রাহিম খলিল, তাফসিন ও শাহীন আহম্মেদ।