সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৩৭ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

উদ্ভাবিত জাত পৌঁছায় না চাষির হাতে

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৬ বার পড়া হয়েছে

বগুড়ার শিবগঞ্জে অবস্থিত মসলা গবেষণাকেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরুর তিন দশক হতে চলেছে। গবেষকরা এই কেন্দ্রে মসলার ২৭ প্রজাতির ৫৮টি জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর প্রতিফলন নেই মাঠপর্যায়ে। বেশির ভাগ জাতের নামই জানেন না মসলাচাষিরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছেও দু-তিনটি মসলা ছাড়া অন্য জাত চাষের বিস্তারিত তথ্যও মেলেনি। এই কেন্দ্র থেকে বীজ সংরক্ষণ ও বিতরণের কথা বিএডিসির। গত দুই বছরে এই কেন্দ্র থেকে সংস্থাটি কোনো বীজ কেনেনি।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার দুইজন আদাচাষির ভাষ্য, গবেষণার কোনো জাত তারা পান না। এমনকি নামও জানেন না। এই চাষিরা নিজেরাই বীজ রাখেন বা হাট থেকে কিনে চাষ করেন। তারা শুনেছেন, বস্তায় আদা চাষ করে অনেকে সাফল্য পাচ্ছেন। কৃষি বিভাগ থেকে তাদের এই চাষের পদ্ধতি দেখানো হয়নি।
বগুড়া শহরের প্রায় ১৮ কিলোমিটার উত্তরে মহাস্থানগড়ের অদূরে শিবগঞ্জ উপজেলার রায়নগরে ৭০ একর জমিতে গড়ে উঠেছে দেশের একমাত্র মসলা গবেষণাকেন্দ্রটি। ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অধীনে পরিচালিত হচ্ছে এ গবেষণাকেন্দ্র। এই কেন্দ্রের অধীনে তিনটি আঞ্চলিক গবেষণাকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে মাগুরা, কুমিল্লা ও গাজীপুরে। চারটি উপ-আঞ্চলিক গবেষণাকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে লালমনিরহাট, ফরিদপুর, সিলেট ও খাগড়াছড়িতে।

মসলা গবেষকদের দেওয়া তথ্যমতে, দেশের প্রায় ৪ দশমিক ২৯ হেক্টর জমিতে মসলা চাষ হয়। বার্ষিক উৎপাদনের পরিমাণ ৩৫ দশমিক ৯৩ লাখ  টন (২০২৪ সালের তথ্য); যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ৯ শতাংশ। এর বিপরীতে দেশে চাহিদা রয়েছে ৫৮ দশমিক ৫০ লাখ টন মসলার। ফলে ঘাটতি থেকে যায় প্রায় ১৩ দশমিক ৫৪ লাখ টনের। সব মিলিয়ে বছরে দেশে মসলা আমদানি করতে হয় ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার কোটি টাকার।

পৃথিবীর নানা দেশে ১১৩টি মসলার চাষাবাদ হয়। বাংলাদেশে এর মধ্যে চাষ হয় প্রায় ৩০ ধরনের। প্রায় তিন দশকে বগুড়ার এই কেন্দ্রে উদ্ভাবিত হয়েছে মরিচ, আদা, রসুন, হলুদ, পেঁয়াজ, ধনে, জিরা, মেথি, মৌরি, কালোজিরা, সরিষা, এলাচসহ মোট ২৭ ধরনের মসলার ৫৮টি জাত। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতি বছর গড়ে এখানে ২-৩টি জাত উদ্ভাবনের কাগজপত্র প্রস্তুত হয়। তবে মাঠে বাস্তবায়নে কোনো কর্মপরিকল্পনা বা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার তথ্য পাওয়া যায়নি।

জাত কাগজেই, মাঠে শূন্যতা
এই কেন্দ্রে উদ্ভাবিত জাত মাঠে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের। তবে বিএডিসি ২০২৪ সালে মসলা গবেষণাকেন্দ্র থেকে কোনো বীজ কেনেনি। অপরদিকে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী, মাঠ দিবস বা উদ্বুদ্ধকরণও এক দশকের বেশি সময় ধরে বন্ধ।
সম্প্রতি জেলার শিবগঞ্জ, শেরপুর ও কাহালু উপজেলার কয়েকটি এলাকার অন্তত ২০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। তারা দাবি করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে মসলা চাষে জড়িত থাকলেও গবেষণাকেন্দ্রের কারও কাছ থেকে সহায়তা পাননি।

শিবগঞ্জের কৃষক হাকিম মোল্লা, মোকামতলার আবু হানিফ, কিচকের আব্দুল কাদের, শেরপুর সদরের মোনাম মিয়া, মির্জাপুরের জহুরুল হক, কাহালুর সোবাহান মিয়ার ভাষ্য, মসলা চাষ তাদের জন্য লাভজনক। তবে সঠিক দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন না তারা।
এসব কৃষক এখনও দুই-তিন দশকের পুরোনো জাতই চাষ করছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা নিজেরা বীজ উৎপাদন করেন। অনেকে হাট থেকে কেনেন। শেরপুরের কৃষক সাইফুল ইসলামের ভাষ্য, গবেষণাকেন্দ্রে যেসব জাতের উদ্ভাবন হয়েছে, তা মাঠে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে উৎপাদন বাড়ত। পাশাপাশি বাজারে চাপ কমত, কৃষকও লাভবান হওয়ার সুযোগ পেতেন। নানা জটিলতায় অল্প কিছু কৃষক ছাড়া অন্যদের হাতে বীজ পৌঁছায় না।

শেরপুরের এক কৃষি কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটি বীজ দেওয়ার চেয়ে গবেষণায়ই বেশি মনোযোগী। তারা চেয়েও সহায়তা পান না। তাই কোনো প্রশিক্ষণ বা প্রদর্শনীও হয় না। কার্যক্রম না থাকলে কৃষকের কাছে যাওয়া যায় না।
বাজেটের টাকা যায় কোথায় এ প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক বাজেট নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. জুলফিকার হায়দার প্রধান তথ্য দিতে রাজি হননি। তবে সরকারি দলিল ও পুরোনো হিসাব ঘেঁটে দেখা গেছে, বারির অধীনে থাকা কেন্দ্রগুলোতে গবেষণা খাতে বার্ষিক ব্যয় গড়ে ২-৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে মসলা গবেষণাকেন্দ্রের বাজেট দেড় কোটি থেকে ২ কোটি টাকা। কেন্দ্রটির একাধিক সূত্রে এমনই জানা গেছে।

এই গবেষণাকেন্দ্রে এখনও এলাচ, মৌরি, কালো এলাচের মতো ফসল নিয়ে গবেষণা চলছে। অথচ বাংলাদেশের মাটিতে পরীক্ষায় এসব মসলায় সাফল্য আসেনি। একাধিক কর্মকর্তার ভাষ্য, মাটির গুণাগুণের কারণে সাদা ও কালো এলাচের জাত উদ্ভাবন সম্ভব নয়। তবে হবে না জানার পরও এসব মসলায় কেন বছরের পর বছর গবেষণায় খরচ হচ্ছে–এমন প্রশ্নের জবাব দেননি তারা।

কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এ পর্যন্ত তাদের উদ্ভাবিত জাত কৃষক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। তারা উদ্ভাবন করেছেন ৬৬টি উন্নত প্রযুক্তি। এর মধ্যে রয়েছে আন্তঃফসল চাষের কৌশল, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তি, রোগ-পোকা দমন পদ্ধতি ও মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনের কৌশল। ১৯৯৫-৯৬ সালে দেশে মসলা জাতীয় ফসলের উৎপাদন ছিল ৩ লাখ টন। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ৯৩ লাখ টনে। অর্থাৎ প্রায় ১২ গুণ উৎপাদন বেড়েছে।
সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযান (সুপ্র) বগুড়ার সম্পাদক কেজিএম ফারুক এ বিষয়ে বলেন, গবেষণাগারে জাত উদ্ভাবন হচ্ছে, কিন্তু মাঠে কোনো অস্তিত্ব নেই। বিস্তারের পরিকল্পনা নেই, বাজেট নেই, পর্যবেক্ষণ নেই। ফলে কোটি কোটি টাকায় উদ্ভাবিত প্রযুক্তি রয়েছে কেবল রিপোর্ট আর কাগজে। স্বাভাবিক কারণেই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, কার্যকারিতা ও কৃষকভিত্তিক বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ বলেন, ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে আমরা কৃষককে নিয়ে মাঠে কাজ করি। তবে এসব জাত ছড়িয়ে পড়ার সরকারি ট্র্যাকিং বা বাস্তব দৃষ্টান্ত নেই। আমরা ফান্ড পেলে মাঠ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধকরণে কাজ করে থাকি।’
বিএডিসির (বীজ) উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কমল কান্তি বর্মণ বলেন, যে কোনো গবেষণায় তাদের সম্পৃক্ততা থাকলেও মসলার বিষয়টি কিছুটা ধীরগতির। ২০২৪ সালে বগুড়ার কেন্দ্র থেকে কোনো মসলা বীজ কেনেননি। ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও যোগাযোগ করা হয়নি।
গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশিকুল ইসলাম এসব অভিযোগ স্বীকার করেন। তিনি বলেন, গবেষণার বাইরে বাজেট নেই, এ কারণে সম্প্রসারণে কাজ করা যায় না। এমনকি জাত বিস্তারের জন্য নিজস্ব প্লট বা আউটরিচ কার্যক্রমও নেই। নিজেকে বস্তায় আদাচাষের উদ্ভাবক উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি আধুনিক ও সময়োপযোগী পদ্ধতি। পতিত জমি ও অব্যবহৃত জায়গায় আদার ব্যাপক উৎপাদন সম্ভব। এখন এই পদ্ধতির কারণে কৃষক উপকার পাচ্ছেন। ড. আশিকুল ইসলামের ভাষ্য, তাদের উদ্ভাবিত জাতের মসলা পাবনা, ফরিদপুর, মেহেরপুর, কুমিল্লা–এমনকি পার্বত্য চট্টগ্রামেও চাষ হচ্ছে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com