দেশে নারীরাই খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি উন্নয়নের চালিকাশক্তি। কৃষিতে শ্রমশক্তির ৫৮ শতাংশ নারী হলেও সরকারি নীতিতে তারা কৃষক নন, কৃষি শ্রমিক হিসেবে চিহ্নিত। কৃষিশ্রমে তারা পুরুষের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কম মজুরি পান। ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশ নারী বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন। সম্পদে নারীর অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে নির্বাচনী ইশতেহারে রাজনৈতিক দলগুলোকে অঙ্গীকার করতে হবে।
আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস উপলক্ষে শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘ভূমি, কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদে নারীর অধিকার: সরকার ও নাগরিক সমাজের করণীয়’ শীর্ষক সভা যৌথভাবে আয়োজন করে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি) ও স্ট্যান্ড ফর হার ল্যান্ড ক্যাম্পেইন, বাংলাদেশ। এতে সভাপতিত্ব করেন নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী ও কান্ট্রি লিড, স্ট্যান্ড ফর হার ল্যান্ড ক্যাম্পেইন খুশী কবির।মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএলআরডি’র উপ-নির্বাহী পরিচালক ও স্ট্যান্ড ফর হার ল্যান্ড ক্যাম্পেইনের ফোকাল পারসন রওশন জাহান মনি। আলোচনায় অংশ নেন নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান শিরীন পারভীন হক, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কবি সোহরাব হাসান, নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের সদস্য ফেরদৌসী সুলতানা, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা, এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা প্রমুখ।
এতে দিনাজপুরের আদিবাসী নারী সাবিনা হেমব্রম বলেন, ‘আমরা কৃষির ওপর নির্ভরশীল হলেও নিজেদের কোনো জমি নেই। এলাকাজুড়ে খাসজমি থাকলেও দরিদ্র কৃষকেরা বরাদ্দ পান না।’ পটুয়াখালীর মিতা রানী প্রশ্ন রাখেন–হিন্দু নারীরা পারিবারিক সম্পত্তিতে সমান অধিকার পেতে আর কতদিন অপেক্ষা করবে? গলাচিপার চরবাংলা থেকে আসা সখিনা বেগম বলেন, ‘দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ খাসজমি প্রভাবশালীদের দখলে। জুলাই পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে এই বৈষম্যের অবসান হবে কি?’
শ্রীমঙ্গলের চা শ্রমিক তামান্না সিং বারাইক বলেন, ‘২০০ বছর ধরে চা শ্রমিকরা ভূমিহীন। প্রতিদিন ১৭৮ টাকায় কাজ করতে হয়, পাতার ওজন কম দেখিয়ে মজুরি কেটে রাখা হয়। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে আমাদের বিষয় যুক্ত করবে কিনা, সেটি এখন জরুরি।’
মধুপুরের অজয় মৃ বলেন, ‘বন মামলা প্রত্যাহারের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনও মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পেতে হচ্ছে। নতুন বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশে আমাদের কোনো অংশগ্রহণ নেই।’ সাতক্ষীরার জয়ন্তী রানী মণ্ডল বলেন, ‘দলিতরা সবচেয়ে পিছিয়ে। আসন্ন নির্বাচনে দলিত নারীর প্রতিনিধিত্ব চাই।’
পরে প্যানেল আলোচক হিসেবে শিরীন পারভীন হক বলেন, ‘আজকের আলোচনার অধিকাংশ সুপারিশই নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে রয়েছে। এখন আমাদের কাজ, এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্নভাবে কথা বলা ও উদ্যোগ নেওয়া।’
ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ‘গ্রামীণ নারীরা কৃষির মেরুদণ্ড হলেও তারা শিক্ষা, চিকিৎসা, মর্যাদা ও নিরাপত্তায় বঞ্চিত। রাষ্ট্র ইতিবাচক ব্যবস্থা নিতে পারত, কিন্তু দৃঢ়তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে।’
সভাপতির বক্তব্যে খুশী কবির বলেন, ‘প্রাকৃতিক সম্পদে নারী-পুরুষ উভয়ের ভূমিকা আছে, কিন্তু উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারীর বিষয়টি বারবার অনুপস্থিত থেকেছে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বর্তমান সরকার গ্রহণ না করলেও আমরা দাবিগুলো ভবিষ্যৎ সরকার পর্যন্ত পৌঁছে দেব।’