সংগীতের হাতেখড়ি
দুই বোনেরই সংগীতে হাতেখড়ি মায়ের পেট থেকেই। মা ও বাবা দুজনই গানের মানুষ। ঘরজুড়ে ছিল নানা বাদ্যযন্ত্র। সরোদ, তবলা, একতারা, দোতারা, গিটার, এসরাজ, হারমোনিয়াম—কী ছিল না সেই ঘরে! ইসরার বয়স যখন দেড় থেকে দুই বছর, তখনই তিনি ঘুম থেকে ওঠার পর আর বিছানায় থাকতেন না।হামাগুঁড়ি দিয়ে বিছানা থেকে নেমে খাটের পাশে রাখা ছোট হারমোনিয়ামটার সামনে দাঁড়াতেন। জলচৌকি ঠেলে নিয়ে সেটার ওপর বসে হারমোনিয়ামের কী চাপাচাপি করতেন। তিন বছর বয়স থেকেই বাবার কাছে তবলা শেখা শুরু করেন ইলহাম। তাঁর বয়স যখন সাত বছর, তখন চাচা ওস্তাদ ইউসুফ খানের কাছে সরোদের হাতেখড়ি হয়।
দেশে যাঁরা উচ্চাঙ্গসংগীত সাধনা করছেন, তাঁদের তুলে ধরতে হবে। বেশি বেশি পরিবেশনার ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে উচ্চাঙ্গসংগীত নিয়ে যেতে চাই
ইসরার ফুলঝুরি খান
পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণের কাছে শেখা
বেঙ্গল ফাউন্ডেশন ঢাকার শিল্পকলায় একটি কর্মশালা আয়োজন করেছিল ২০১৫ সালে। সেখানে ভারতের বিভিন্ন পণ্ডিত এসেছিলেন। ইলহাম আর ইসরার মা দুই বোনকে ভর্তি করে দেন সেই কর্মশালার সরোদ ক্লাসে। নিজের দুই মেয়ে যেন ভালোভাবে শিখতে পারে, তাই মা-বাবাও ভর্তি হয়ে যান সরোদ কর্মশালায়। সেই থেকে ফুলঝুরি পরিবারের যাত্রা শুরু বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের সঙ্গে। ইলহাম আর ইসরার গুরু ভারতের পদ্মশ্রী পদকপ্রাপ্ত পণ্ডিত তেজেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার। প্রতি মাসে কয়েক দিনের জন্য দেশে আসতেন তিনি। করোনার আগ পর্যন্ত নিয়মিত ক্লাস হয়েছে। এর পরে আর আসেননি। এখন অনলাইনে মাঝেমধ্যে ক্লাস করেন দুই বোন। ইসরা বলেন, ‘যতটুকু শিখেছি পুরোটাই পণ্ডিতের কাছে। তিনি যত্নের সঙ্গে আমাদের শিখিয়েছেন। কৃতজ্ঞতা থাকবে সব সময়।’
প্রথমবার মঞ্চের অভিজ্ঞতা
২০১৬ সালে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে ‘বেঙ্গল ক্লাসিক্যাল ফেস্টিভাল’-এ প্রথমবার দুই বোন মঞ্চে ওঠেন। ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক বিখ্যাত উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী সেই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। তখন ইলহামের বয়স আট বছর, আর ইসরার ছয়। দুই বোন সরোদ হাতে অংশ নেন বেঙ্গল ক্লাসিক্যাল ফেস্টিভালে। ইসরা বলেন, ‘দর্শকের চমৎকার প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলাম। সেদিন আমাদের প্রশংসা করেছিলেন সবাই। এই যে শুরু, এরপর থেকে আমি আর দিদি নিয়মিত মঞ্চে পারফর্ম করে আসছি।’
গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকের কাছে প্রশংসা
এবার লালন মেলায় এসেছিলেন সমালোচক, লেখক, গবেষক ও অধ্যাপক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। দুই বোন তাঁকেও শুনিয়েছেন সরোদ। সেদিনের গানের পাশাপাশি চলে অনেক গল্প ও স্মৃতিচারণা। গায়ত্রী দুই বোনের প্রশংসাও করেন। ইসরা বলেন, ‘দারুণ এক অভিজ্ঞতা হলো। উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী স্যার আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেদিন আমাদের দুই বোনের সঙ্গে বাবা ও তাঁর একজন ছাত্র ছিলেন। গায়ত্রী ম্যাম একেকটা পরিবেশনার পরে গল্পে মেতে উঠছিলেন। ছেলেবেলার কথাও বলেছিলেন সেদিন।’
চিরকুটের সঙ্গে কোলাবরেশন
বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ডগুলোর মধ্যে অন্যতম ‘চিরকুট’। কয়েক বছর ধরে ব্যান্ডটির সঙ্গে কোলাবরেশন করছেন ইলহাম ও ইসরা। শুরুটা হয়েছিল ‘চিরকুট’-এর ২০ বছর পূর্তি উদযাপনে। ইসরা বলেন, ‘ব্যান্ডটির প্রধান সুমি আপু একদিন বললেন তাঁদের সঙ্গে বাজাতে। আমরাও রাজি হয়ে গেলাম। উপস্থিত শ্রোতারা চিরকুটের সঙ্গে আমাদের কোলাবরেশন খুব পছন্দ করলেন। এরপর থেকে সুমি আপু বললেন একসঙ্গে থাকতে। অনেকগুলো কনসার্টই করেছি চিরকুটের সঙ্গে।’
‘ফুলঝুরি সিস্টারস’-এর লক্ষ্য
মাঝখানে তরুণ প্রজন্ম উচ্চাঙ্গসংগীত থেকে অনেকটা দূরে সরে গিয়েছিল। ইসরা মনে করেন এখন আবার সময় ফিরেছে। তরুণরা উচ্চাঙ্গসংগীতের মাধুর্য বুঝতে পেরেছে। তবে সরকারের আরো পৃষ্ঠপোষকতা দরকার। বেঙ্গল উচ্চাঙ্গসংগীতের আসর আবার শুরু হলে পুনরায় একটা জাগরণ ঘটবে। তা ছাড়া প্রতিটা পরিবারেরও উচিত ছেলে-মেয়েদের সংগীতের এই ধারায় উৎসাহিত করা। ইসরা বলেন, ‘দেশে যাঁরা উচ্চাঙ্গসংগীত সাধনা করছেন, তাঁদের তুলে ধরতে হবে। বেশি বেশি পরিবেশনার ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে উচ্চাঙ্গসংগীত নিয়ে যেতে চাই।’