সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৭ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

স্বাস্থ্য খাতের রোগ সারান আগে

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: সোমবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১০ বার পড়া হয়েছে
  • ড. হারুন রশীদ
    ‘দেশে টাইফয়েডে এখনো শিশুর মৃত্যু হয়, এটি আমাদের জন্য অনেক লজ্জার।’ সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এ কথা বলেন। শুধু টাইফয়েডে মৃত্যু নয়, স্বাস্থ্য খাতে লজ্জার আরো অনেক বিষয় আছে। এখনো এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু হয়ে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।

    চিকুনগুনিয়া নামক জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ব্যথা-বেদনায় নীল হচ্ছে বহু মানুষ। জিকা ভাইরাস আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। এখনো সরকারি বড় বড় হাসপাতালে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম। আইসিও সংকট তীব্র।
    চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যাও অপ্রতুল। মানুষ ডায়াবেটিস, কিডনি, লিভার, উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের মতো অসংক্রামক রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছে। দিন দিন পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। ক্যান্সার রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে।
    রোগ-ব্যাধি হলে ওষুধ খেয়ে জীবন রক্ষা করে মানুষ, কিন্তু সেই ওষুধেও ভেজাল। মানহীন ও ভেজাল ওষুধ খেয়ে রোগ সারার বদলে আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, দেশে ওষুধের উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত কোনো স্তরেই সরকারি পরীক্ষাগারে মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয় না। বিপণনের পর অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠান। তখন ওষুধের মান জানা যায়।

    ঔষধ প্রশাসন পরিদপ্তরকে ২০১০ সালের ১৭ জানুয়ারি অধিদপ্তরে রূপান্তর করা হয়, কিন্তু এর তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। নেই ওষুধের মান যাচাই ও পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতিও। অধিদপ্তরের পরীক্ষাগারে আলসারের ওষুধ, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রক ওষুধ ও ভিটামিন পরীক্ষা করা যায়। ক্যান্সার, হরমোনজাতীয় ওষুধ এবং স্টেরয়েড পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। এই অবস্থার সুযোগ নিচ্ছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। ঔষধ প্রশাসন সংক্রান্ত উচ্চ পর্যায়ের একটি কমিটি সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ১৯৩টি প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখতে পায়, অন্তত ৬০টিরও বেশি কম্পানি উৎপাদন ও বিপণনের শর্ত মেনে চলছে না।

    ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরি এবং বাজারজাত দিন দিন বেড়েই চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) মতে, ওষুধ উদ্ভাবনকারী ছাড়া বর্গ নামে ওষুধ প্রস্তুত করাই হচ্ছে নকল ওষুধ। তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি দেশেই বর্গ নামে ওষুধ প্রস্তুত চলছে। ফলে ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। অনেক কম্পানি জেনেশুনে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। অথচ শুধু জনস্বার্থেই নয়, কম্পানিগুলোর নিজ স্বার্থেও ওষুধের মান ঠিক রাখা অত্যন্ত জরুরি।

    তিন.

    তৃণমূল পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার চিত্র খুবই করুণ। বেশির ভাগ হাসপাতালেই চিকিৎসা দেওয়ার অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতি নেই। সেবাদানকারীরা সময়মতো কর্মক্ষেত্রে হাজির হন না। ডাক্তাররা গ্রামে যেতে চান না। ওষুধপত্রের সংকট। দেশের সার্বিক চিকিৎসাব্যবস্থাও আসলে ভালো নয়। হাজার হাজার মানুষের জন্য ডাক্তার রয়েছেন মাত্র একজন। এটি কোনো অবস্থায়ই মেনে নেওয়া যায় না। এ ছাড়া চিকিৎসা এখন সেবা নয়, বাণিজ্য। যেখানে-সেখানে গজিয়ে উঠছে হাসপাতাল ও ক্লিনিক। অভিযোগ রয়েছে, ডাক্তাররা এখন সরকারি হাসপাতালে সময় দেওয়ার চেয়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিসে বেশি মনোযোগী। এই অবস্থার অবসান হওয়া প্রয়োজন।

    স্বাস্থ্য খাতের রোগ সারান আগে

    চার.

    অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কার আনছে। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কমিশনের প্রতিবেদনে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সংস্কার, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি পূরণ এবং লাইসেন্সিং ও তদারকি ব্যবস্থার উন্নতির সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া এটি স্বাস্থ্য খাতের জনবল ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার উন্নতিসহ সামগ্রিক মানোন্নয়নের জন্য একটি রূপরেখা প্রদান করে।

    প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অধিকার: প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ব্যবস্থার সংস্কার : স্বাস্থ্যসেবা, বিশেষ করে শহর এলাকায় উন্নত করার জন্য সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। প্রশিক্ষণ ও জনবল : সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীদের, বিশেষ করে প্রধান কর্মকর্তাদের ক্রয় ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। লাইসেন্স ও তদারকি : স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর লাইসেন্সিং এবং তারা শর্তাবলি মেনে চলছে কি না, তা তদারকি করার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। তথ্য ও যোগাযোগ : স্বাস্থ্যবিষয়ক সব তথ্যের একটি ডিজিটাল সংরক্ষণব্যবস্থা তৈরি করার কথা বলা হয়েছে। সামগ্রিক মানোন্নয়ন : স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক মানোন্নয়নের জন্য একটি রূপরেখা এবং এর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

    প্রস্তাবগুলো বাস্তবমুখী ও যুযোপযোগী হলেও এখনো বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

    পাঁচ.

    বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ও বেসরকারি উভয় প্রচেষ্টা দেখা যায়, কিন্তু কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এই খাতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং মাধ্যমিক ও তৃতীয় স্তরের জন্য জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতাল রয়েছে। টিকাদান কর্মসূচি; যেমন—সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি এবং কভিড-১৯ টিকাদান ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। তবে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, উচ্চ চিকিৎসা ব্যয় এবং বেসরকারি খাতে স্বচ্ছতার অভাব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

    ছয়.

    বিভিন্ন আলোচনায় স্বাস্থ্য খাতের ১০টি সমস্যার কথা উঠে এসেছে। এগুলো হচ্ছে—বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা মেধা, জ্ঞান ও যোগ্যতা বিচ্ছিন্ন, যা ভয়াবহ রকম অতিকেন্দ্রীভূত। এই ব্যবস্থায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা উপেক্ষিত, বিশেষায়িত সেবায় উৎসাহী; এখানে স্বচ্ছতার অভাব আছে ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি অত্যন্ত প্রবল; এখানে কাজ করে উৎসাহ ও মনোবলহীন জনবল; আছে মনন ও মানসিকতার সংকট; এই খাতে নৈতিকতার অবক্ষয় ও স্বাস্থ্যের দ্বন্দ্ব প্রবল; আছে পরনির্ভরশীলতা; এখানে নেতৃত্ব দুর্বল এবং চলছে বরাদ্দের ঘাটতির সঙ্গে পরিকল্পনাহীনভাবে। অথচ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া সবার অধিকার। উন্নত, সমৃদ্ধ দেশ গঠন করতে হলে সবার সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা আবশ্যক। অসুস্থ হলে মানুষ চিকিৎসা পাবে—এই নিশ্চয়তাটুকু দিতে পারলে স্বাস্থ্য খাতের সংকটের লজ্জা থেকে হয়তো মুক্তি মিলবে। এ জন্য সবার আগে স্বাস্থ্য খাতের রোগ সারাতে হবে।

    লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com