বাংলাদেশের কৃষি এখন এক বড় রূপান্তরের সন্ধিক্ষণে। বহু দশক ধরে আমরা খাদ্য নিরাপত্তা বলতে শুধু ধান ও গমের প্রাচুর্যকেই বুঝে এসেছি। কিন্তু এখন স্পষ্ট হচ্ছে পেট ভরানোই যথেষ্ট নয়, শরীর ও মনের সুস্থতার জন্য দরকার সুষম পুষ্টি। দেশের মোট আবাদি জমির প্রায় তিন-চতুর্থাংশজুড়ে ধানের একচ্ছত্র আধিপত্য খাদ্যশস্যের স্থিতিশীলতা দিলেও বর্তমানে তা পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এবিষয়ক প্রতিবেদনটি সেই গুরুতর সমস্যাটিকে সামনে এনেছে। কৃষিবিজ্ঞানী ও অর্থনীতিবিদরা সম্মিলিতভাবে ধাননির্ভর কৃষি থেকে বেরিয়ে এসে ফসলের বৈচিত্র্য আনার জোর তাগিদ দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একচেটিয়া ধান চাষের ফলস্বরূপ মানুষ পর্যাপ্ত কার্বোহাইড্রেট পেলেও প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের মারাত্মক ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এই ঘাটতি পূরণের সহজ কিন্তু কার্যকর সমাধান হলো ধানের আবাদি জমির অন্তত ১০ শতাংশ বিকল্প ফসলের আওতায় আনা।কৃষিবিজ্ঞানীরা হিসাব কষে দেখিয়েছেন, উচ্চ ফলনশীল জাত এবং উন্নত কৃষিতাত্ত্বিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মোট ধান উৎপাদনের ওপর কোনো প্রভাব না ফেলেই এই পরিমাণ জমি ডাল, তেলবীজ, শাক-সবজি ও ভুট্টার মতো অধিক পুষ্টিসমৃদ্ধ ফসলের জন্য ছেড়ে দেওয়া সম্ভব।
এই পরিবর্তন শুধু পুষ্টির ঘাটতিই পূরণ করবে না, কৃষকের অর্থনীতি এবং মাটির স্বাস্থ্যকেও সুরক্ষা দেবে। ডালজাতীয় ফসলের চাষ মাটিতে নাইট্রোজেন সরবরাহ করে উর্বরতা বাড়ায় এবং ফসলের বৈচিত্র্য রোগ-পোকামাকড়ের আক্রমণ কমিয়ে আনে। অন্যদিকে ধান চাষের তুলনায় বিকল্প ফসলে কম পানি ও সারের প্রয়োজন হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপও কমে আসবে।বাংলাদেশে দৈনিক খাদ্যগ্রহণের প্রায় ৭০ শতাংশই ভাতের দখলে। পুষ্টিবিদরা বলছেন, এ দেশের মানুষের দৈনিক মাথাপিছু ৩০০ গ্রাম সবজি খাওয়া দরকার হলেও বাস্তবে তা মাত্র ২০০ গ্রামের আশপাশে। পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ফসল বৈচিত্র্যের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা এবং শাক-সবজি, মাছ-মাংস গ্রহণে উৎসাহ দেওয়া অপরিহার্য।কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষকদের রাতারাতি ধান থেকে অন্য ফসলে সরিয়ে আনা কঠিন। কারণ তাঁরা খাদ্য নিরাপত্তার (পেট ভরানোর) জন্য ধান উৎপাদনকেই সবচেয়ে নিরাপদ মনে করেন।তাই এই রূপান্তরপ্রক্রিয়ায় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন এবং অনাবাদি জমিকে দ্রুত আবাদের আওতায় আনার মাধ্যমে প্রথমে ধানের উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে সামান্য পরিমাণ জমি অন্য ফসলের জন্য ছাড় দেওয়া গেলেও মোট উৎপাদনে টান না পড়ে। পাশাপাশি সবজি ও অন্যান্য ফসলের ন্যায্যমূল্য এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে কৃষিনীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। বৈচিত্র্যময় কৃষিতে উত্তরণই হতে পারে টেকসই কৃষি ও পুষ্টিসম্পন্ন জাতি গঠনের মূল চাবিকাঠি।